Home LATEST NEWS BANGLA পরপর দু’টি বোমা উদ্ধারের মধ্যেই পুলিশের সতর্কতা জারি, পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক?

পরপর দু’টি বোমা উদ্ধারের মধ্যেই পুলিশের সতর্কতা জারি, পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক?

4
0

Source : BBC NEWS

আশুলিয়া উদ্ধার হওয়া বোমাটি পরবর্তীতে ফাঁকা জায়গায় নিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়

ছবির উৎস, Bangladesh Police

বাংলাদেশে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকা ও এর পাশ্ববর্তী এলাকা সাভারের আশুলিয়া থেকে দু’টি বোমা উদ্ধার হওয়ার পর নিরাপত্তা ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঘটনাগুলোর নেপথ্যে কারা, সেটি নিয়ে তদন্ত শুরু করলেও এখনও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

এর মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহনে হামলা আশঙ্কা থেকে সারা দেশে সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গত শনিবার ঢাকার ফার্মগেট ও মিরপুর এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনে মালভর্তি দু’টি পরিত্যক্ত ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনটির কার্যক্রম সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধও রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যাগের মুখ খুলে একটি মধ্যে পান-সুপারি, জর্দার কৌটা এবং আরেকটির মধ্যে ময়লা-আবর্জনা দেখতে পায়।

তবে পরপর দু’টি বোমা পেতে রাখার ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘অশনিসংকেতে’র ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

“আইনশৃঙ্খলার জন্য এটা অশনিসংকেত, কারণ ঘটনাগুলো যেভাবে ঘটছে তাতে মনে যাচ্ছে যে, ছিনতাইকারী বা চাঁদাবাজদের মতো সাধারণ অপরাধীরা এর সঙ্গে জড়িত নয়। বরং যারা বোমাগুলো পেতে রাখছে, তাদের উদ্দেশ্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ফেলা,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. এমদাদুল ইসলাম।

যদিও সরকার বলছে, বোমা উদ্ধারের ঘটনায় আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

“আমরা একটা পরিসংখ্যান নিয়েছি বিগত পাঁচ-ছয় মাসের এবং তার আগের পিরিয়ডের। এখানে যে অপরাধ প্রবণতা বা কোথাও এরকম বোম রেখে যাওয়ার ঘটনা- এগুলো তদন্ত করে আমরা দেখেছি যে, আনুপাতিক হারে তুলনামূলক বিচারে এটা খুবই কম,” রোববার সাংবাদিকদের বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

এছাড়া অগাস্ট মাস ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যাতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, সেজন্য পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে বলে জানান মি.আহমদ।

কেরাণীগঞ্জে বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন

‘প্রেসার কুকার’ আকৃতির বোমা

গত বৃহস্পতিবার রাতে আশুলিয়ার খেজুরবাগান এলাকা থেকে একটি বোমা উদ্ধার হয়েছে, যেটির আকৃতি প্রেসার কুকারের মতো বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কর্মকর্তারা বলছেন, এমন আকৃতির বোমা ওই এলাকায় এর আগে আর দেখার যায়নি।

“মূলত রান্নার কাজে ব্যবহৃত একটি প্রেসার কুকারের মধ্যে বোমাটি রেখে সেটার ঢাকনা কালো রঙের টেপ দিয়ে মোড়ানো ছিল,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম।

পুলিশ বলছে, বৃহস্পতিবার রাতে ক্রেতা সেজে এসে এক ব্যক্তি খেজুরবাগান এলাকার একটি দোকানের বেঞ্চের ওপর ব্যাগ রেখে যায়। পরে দীর্ঘক্ষণ ব্যাগটি পড়ে থাকতে দেখে দোকানিসহ স্থানীয় বাসিন্দা ব্যাগটির মুখ খুলে প্রেসার কুকার আকৃতির বোমাটি দেখতে পান।

“এরপর তারা ৯৯৯ নাম্বার ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘিরে ফেলে এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেয়,” বলেন মি. ইসলাম।

খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ঢাকা থেকে পুলিশের বোমা বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের সদস্যরা সেখানে হাজির হন। এরপর বোমাটি উদ্ধার করে পাশের একটি ফাঁকা এলাকায় নেওয়া হয়।

“সেখানে শুক্রবার ভোরে সতর্কতার সঙ্গে বোমাটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়,” বলেন আশুলিয়া থানার ওসি।

এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করলেও এখনও কেউ গ্রেফতার হয়নি। বোমাভর্তি ব্যাগটি যে ব্যক্তি দোকানের বেঞ্চে রেখে গিয়েছিলেন, তাকে শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।

“এক্ষেত্রে দোকানদারসহ যারা তাকে দেখেছিলেন, তাদের কাছ থেকে ওই ব্যক্তির চেহারার বর্ণনা নেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে, আশপাশের ভবনগুলোর সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে,” বলেন পুলিশ কর্মকর্তা মি. ইসলাম।

পুলিশ বলছে, যে এলাকায় বোমাটি পাওয়া গেছে, সেটা বেশ ঘন বসতিপূর্ণ এবং আশপাশে বেশকিছু গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। ফলে বোমাটি বিস্ফোরণ হলে ‘ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে’- এমন ভাবনা থেকে দোকানটিতে বোমা রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা।

সারা দেশে পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

আগের তদন্ত কতদূর?

আশুলিয়ার ঘটনার সপ্তাখানেক আগে গত ২৪শে জুলাই ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের রাস্তা থেকে আরেকটি বোমা উদ্ধার করেছিল পুলিশ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উল্টোরথ যাত্রা উপলক্ষ্যে ওই রাস্তা দিয়ে একটি শোভাযাত্রা যাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু সেটার আগেই বোমাটি পুলিশের নজরে আসে। বোমাটি রাখা হয়েছিল একটি ছাতার ভেতরে। সেটার সঙ্গে একটি ‘টাইমার’ যুক্ত ছিল, যাতে ‘মিটমিট’ করে আলো জ্বলছিল বলে জানান কর্মকর্তারা।

ওই আলো দেখে সন্দেহ হওয়ায় পুলিশকে খবর দেন পথচারীরা। পরে পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটি নিষ্ক্রিয় করে।

মতিঝিল ও আশুলিয়ায় ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। কর্মকর্তারা বলছেন, দু’টো ঘটনাতেই পাওয়া বোমা স্থানীয়ভাবে তৈরি।

“এগুলোকে আমরা ‘ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস’ বা সংক্ষেপে ‘আইইডি’ বলে থাকি। স্থানীয়ভাবে উপাদান সংগ্রহ করেই এগুলো তৈরি করা হয়,” বলছিলেন সিটিটিসি’র একজন কর্মকর্তা।

মতিঝিল ও আশুলিয়ার ঘটনার প্রায় সাত মাস আগে ঢাকার কেরাণীগঞ্জে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি মাদ্রাসায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কেউ হতাহত না হলেও মাদ্রাসা ভবনের দু’টি কক্ষের একাংশের দেয়াল ধ্বসে পড়ে।

গত বছরের ২৬শে ডিসেম্বরের ওই ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মাদ্রাসাটির পরিচালক শেখ আল আমিনসহ এখন পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

কেরাণীগঞ্জে বোমা বিস্ফোরণে মাদ্রাসা ভবনটির দুটি কক্ষের দেয়াল এবং ছাদের একটি অংশ ধ্বসে পড়ে

তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, মি. আমিনের বিরুদ্ধে আগেও উগ্রপন্থায় জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্ঠতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে পাঁচটি মামলাও রয়েছে।

মতিঝিল ও আশুলিয়ার ঘটনার সঙ্গেও উগ্রপন্থিরা জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

“অতীতে উগ্রপন্থী হামলার সঙ্গে সাম্প্রতিক এসব ঘটনার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যেসব জঙ্গিরা কারাগার ভেঙে পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই এখনো গ্রেফতার হয়নি। ফলে পুলিশের উচিৎ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা,” বলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. এমদাদুল ইসলাম।

মতিঝিল ও আশুলিয়ায় বোমা উদ্ধারের ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তবে সিটিটিসিসহ পুলিশের একাধিক টিম তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

“আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাগুলো তদন্ত করছি। এক্ষেত্রে উগ্রপন্থীদের জড়িত থাকার বিষয়টিসহ অন্যান্য সবদিক বিবেচনায় রেখেই তদন্ত চলছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারাগার ভেঙে পালানো জঙ্গিদের সবাইকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ

হঠাৎ সতর্কতা জারি কেন?

একের পর এক বোমা উদ্ধারের মধ্যেই গত শনিবার সারা দেশের পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

মূলত: দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের বিভিন্ন যানবাহনের ওপর হামলা হতে পারে- এমন শঙ্কা থেকেই সতর্কতাটি জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এজন্য মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময় যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সেইসঙ্গে, রাস্তায় নিয়মিত টহল, প্রয়োজনীয় নজরদারি এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু তল্লাশির সময় পুলিশ সদস্যদের বিশেষভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

এছাড়া থানা, পুলিশ লাইন্সসহ অন্যান্য নির্ধারিত স্থানে রাখা সব সরকারি যানবাহনের ক্ষেত্রেও একইভাবে নিরাপত্তা জোরদার করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এমন একটি সময় এই নির্দেশনা দেওয়া হলো, যার আগে এক সপ্তাহের মধ্যে দু’টি বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

তবে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, নিয়মিত দায়িত্বের অংশ হিসেবেই নতুন সতর্কতাবার্তাটি জারি করা হয়েছে।

“পুলিশ নিয়মিতই কিছু নিরাপত্তা নির্দেশিকা ও কিছু নির্দেশনা সব সময়ই দেয় আর কি। এটা সেরকমই একটা নিয়মিত বার্তা, যার মূল লক্ষ্য হলো পুলিশের কাজ সক্রিয় রাখা এবং সতর্ক করা। কাজেই এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন পুলিশ সদর দফতরের মুখপাত্র এএইচএম শাহাদাত হোসাইন।

এদিকে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তারপরও নাশকতার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে বলেন জানান।

“তবে আমরা এখন পর্যন্ত যেটা দেখেছি, সেটা আমাদের এখনও বিপজ্জনক কোনো পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয় না,” সোমবার সাংবাদিকদের বলেন মি. আহমদ।

পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য সতর্কবার্তা জারির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা এই যে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী, যেটা নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী, তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম আগস্ট মাসে পরিলক্ষিত হচ্ছে। তো সেজন্য আমরা সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছি।”