Source : BBC NEWS

উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তবর্তী এলাকায় বিএসএফ চেকপোস্টের পাশে মালপত্রসহ প্রায় ২৫০ জন মানুষ অপেক্ষা করছেন

ছবির উৎস, Asian News International

এক মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জন সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীকে ‘ওপারে’ পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

আরও ৮৬৩ জন এখন রাজ্যের বিভিন্ন ‘হোল্ডিং সেন্টার’এ আটক আছেন, যাদের নথি যাচাই করা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পরে কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলছে। তবে ঠিক কতোজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, বা কতজন নানা হোল্ডিং সেন্টারে আটক আছেন, তা নিয়ে এই প্রথম আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি বক্তব্য পাওয়া গেল।

মি. অধিকারী আরও জানান, যে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে, তাদেরও দ্রুত ডিপোর্ট করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

একটি দলীয় কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য সরকারের সীমান্ত সুরক্ষা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ-সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলির কথা তুলে ধরেন। তার দাবি, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে রাজ্য সরকার।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সব চেয়ে বড়ো ইস্যু ছিল সীমান্ত সুরক্ষা, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। … সিএএ-এর আওতায় যারা পড়েননি, সেই ধরনের অনুপ্রবেশকারীদের ডিপোর্ট করার কাজ নিয়ম মেনে শুরু করেছি। একটি আইন ছিল ভারত সরকারের, সেই আইনে তাদের জেলে না পাঠিয়ে সরাসরি বিএসএফের হাতে হ্যান্ডওভারের আইন ছিল।”

তিনি জানান, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বিশেষ ‘হোল্ডিং স্টেশন’ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের অস্থায়ীভাবে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে ধাপে ধাপে তাদের ডিপোর্ট করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

“এবারে সরাসরি হোল্ডিং স্টেশন বানানো হয়েছে বর্ডারের জেলাগুলিতে। সেখান থেকে এখনো অবধি ৪ হাজার ৮০০ কে ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এখন হোল্ডিং সেন্টারে আছেন ৮৩৬ জন। তাদেরকেও আমরা তাড়াতাড়ি খাইয়ে পরিয়ে ওদিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। এই প্রক্রিয়া চলবে।”

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য জমি হস্তান্তর করার সময়ে বিএসএফের মহাপরিচালক প্রভীন কুমারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

ছবির উৎস, Asian News International

‘সীমান্ত রক্ষা অগ্রাধিকার’

রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত সুরক্ষা এবং রাজ্য থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বিজেপি সরকার। প্রশাসনের দাবি, সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে রাজ্যে প্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

চলতি বছরের মে মাসে মুখ্যমন্ত্রী মি. অধিকারী এ বিষয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, যারা ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে এসেছেন কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর আওতায় পড়েন না, তারা ‘পুরোপুরি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’।

এই আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত যেসব মানুষ ২০২৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসেছেন, তারা ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ এই আইনের আওতায় পড়েন না।

মি. অধিকারী জানিয়েছিলেন, যেসব কথিত অনুপ্রবেশকারী এই আইনের আওতায় পড়েন না এবং অবৈধভাবে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছেন, তাদের দ্রুত গ্রেফতার ও আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

“বিএসএফ বিজিবির সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে ডিপোর্ট করার ব্যবস্থা করবে। অর্থাৎ ডিটেক্ট, ডিলিট, এবং ডিপোর্ট।”

উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটারের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে।

এই আবহেই দিল্লিতে সোমবার থেকে শুরু হয়েছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক। বৈঠকে ‘পুশ-ইন’-এর বিষয়টি উঠতে পারে। চার দিন ধরে চলবে এই বৈঠক।

পশ্চিমবঙ্গের ফুলবাড়ি অঞ্চলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট

ছবির উৎস, Asian News International

বিবিসিকে যা বললেন মন্ত্রী

পশ্চিমবঙ্গের ক্যাবিনেট মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া বিবিসিকে বলেন, “এই ৪ হাজার ৮০০ জন অনুপ্রবেশকারী ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ পৌঁছে গিয়েছেন। অনেকে স্বেচ্ছায় গিয়েছেন।”

“বিভিন্ন দফতরের কাছে খবর থাকে কোথায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা লুকিয়ে আছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পুলিশ প্রশাসন বা রাজ্য প্রশাসনকে এতদিন কাজ করতে দেওয়া হয়নি। এখন পুলিশ যাদের গ্রেফতার করছে তারা অনেকেই নিজে থেকেই বলছেন তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন এবং বাংলাদেশেই ফিরে যেতে চান।”

তিনি আরও বলেন, যে, তার কথায়, অসংখ্য অনুপ্রবেশকারী এখনো পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভিড়ে লুকিয়ে আছেন এবং “রাজ্যের আর্থিক ফেসিলিটি ব্যবহার করে জীবন যাপন করছেন।”

মি. কীর্তনিয়া বলেন, “অনুপ্রবেশকারী এবং শরণার্থী আলাদা। অনুপ্রবেশকারী হলেন তারা যারা ১৯৪৭ সালের পর হিন্দুদের সঙ্গে থাকতে না চেয়ে ভারতবর্ষে আসেননি বা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আজ তারা দেশের সীমান্ত পেরিয়ে তাদের জীবন জীবিকার জন্য আবার ভারতের জল, জমি, খাদ্যে ভাগ বসাচ্ছেন। তাদের পশ্চিমবঙ্গে কোনো স্থান নেই।”

মি. কীর্তনিয়ার দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায়, তার কথায়, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য নির্ধারিত সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছিলেন।

“গত ১৫ বছরে রাজ্যে প্রচুর অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এসে ঠাঁই করেছেন। বাম জমানাতেও অনেক অনুপ্রবেশকারী অবৈধ ভাবে রাজ্যে এসেছেন। আমরা এখন তিলে তিলে এই সমস্যার সমাধান করছি। দেশের আইন অনুযায়ী, অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেফতার করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।”

উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তবর্তী এলাকায় বিএসএফ চেকপোস্টের পাশে মানুষ অপেক্ষা করছেন

ছবির উৎস, Asian News International

উদ্বিগ্ন মানবাধিকার কর্মীরা

এই ব্যাপক ‘পুশব্যাক’-এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, যেভাবে লোকজনকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তা মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারে।

‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস’ বা এপিডিআর- এর সহ-সভাপতি রঞ্জিত শূর প্রশ্ন তুলছেন, “আমরা জানতে চাই পুশব্যাক হওয়া এই ৪৮০০ জন কারা? পাইপলাইনে থাকা ৮০০ জনই বা কারা? কী তাদের নাম ধাম পরিচয়? শ্বেতপত্র প্রকাশ করে সত্য জানাক সরকার। সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে ভারতের মানুষের এদের নাম-পরিচয় জানার অধিকার আছে।”

তার কথায়, “ভারতের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হল, আদালতে পেশ না করে কাউকে ২৪ ঘন্টার বেশি আটক রাখা যাবে না। তাহলে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে দিনের পর দিন হোল্ডিং সেন্টারে আটক রাখা হচ্ছে কী করে? … আদালতের নির্দেশ ছাড়া সরকার কাউকে বিদেশি নাগরিক বলতেই পারে না।”