Home LATEST NEWS BANGLA ফ্রান্সজুড়ে সহিংস সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চলছে, গ্রেপ্তার ১ হাজারের বেশি

ফ্রান্সজুড়ে সহিংস সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চলছে, গ্রেপ্তার ১ হাজারের বেশি

4
0

Source : BBC NEWS

ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে শনিবার

Published

পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ফ্রান্সে স্কুলের দুরবস্থা ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভের সময় শনিবার ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

দেশটির সরকার জানিয়েছে, তারা অন্তত এক হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এদিন আনুমানিক সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।

প্যারিসে শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ চলে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে লিমোজ শহরের সিটি হলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যার ফলে ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়ে।

এছাড়া বেশ কয়েকটি শহরে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সিটি হল ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ভাঙচুরের খবরও পাওয়া গেছে।

এসব ঘটনায় প্রায় দেড়শ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু।

প্যারিসে শনিবার বিকেলে মূল মিছিলটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। কয়েকজন তরুণ বিবিসিকে বলেন, তারা ‘শান্তিবাদী’ এবং তারা ‘শুধু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন কিন্তু কিছুই এগুচ্ছে না’।

তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় আগুন জ্বালানো এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলের বিখ্যাত স্থান প্লাস দ্য লা রিপাবলিকও রয়েছে।

দোকানপাট ভাঙচুর করে লুট করা হয়। অন্তত একটি রেস্তোরাঁ আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। বিভিন্ন গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষও হতে দেখেছে বিবিসি।

প্যারিসে গাড়িতে আগুন দেওয়ার দৃশ্য

প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে একদল বিক্ষোভকারীর দিকে দাঙ্গা পুলিশকে ধেয়ে যেতে এবং লাঠি দিয়ে কয়েকজনকে আঘাত করতে দেখা গেছে।

লিয়ঁ শহরের মেয়র গ্রেগরি দুসেত শহরের পর্যটন দপ্তরের ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে ‘একটি ট্র্যাজেডি’ বলে অভিহিত করেছেন।

একটি টেলিভিশনকে তিনি বলেছেন, ‘এটি আমাদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে, কারণ এটি অত্যন্ত পরিচিত ও ঐতিহাসিক একটি ভবন।’

স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, ‘বৈরী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরা’ অগ্নিনির্বাপকদের নিরাপদে আগুন নেভানোর কাজে বাধা দিয়েছেন।

লিমোজ শহরের সিটি হলের আগুন নেভাতেও কাজ করেন দমকলকর্মীরা। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আগুনে ভবনটির একাংশ ধসে পড়েছে।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সাঁ-এতিয়েনের মেয়র রেজিস হুয়ানিকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, সেখানে ‘গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত উড়ে গেছে’। তিনি আরও বলেন, “এমন ট্র্যাজেডি কখনোই ঘটার কথা নয়”।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জে শহরে মুখোশ পরা ব্যক্তিরা ‘পরিকল্পিত সহিংস কর্মকাণ্ডে’ জড়িত ছিলেন।

গ্রেনোবল, আভিনিয়ঁ, পো, মন্টপেলিয়ের ও ভ্যালঁসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

প্যারিসে পোশাক ও খাবারের দোকানে লুটপাট চালানো হয়। লিল শহরে অ্যাপলের একটি দোকানে ভেঙে ঢুকে সেটি পুরোপুরি খালি করে দেওয়া হয়।

সংঘর্ষ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে

বিবিসি ভেরিফাইয়ের সত্যতা যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রেনোবল শহরের কেন্দ্রে মুখোশধারী ব্যক্তিরা একটি পর্যটকবাহী ট্রেন সরু রাস্তা দিয়ে চালিয়ে অন্তত তিনজন দাঙ্গা পুলিশের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

গত কয়েক সপ্তাহে ফ্রান্সের হাজার হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও কর্মীর সংকট এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন।

দেশটিতে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের পড়াশোনার জন্য এসব বিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো ‘লিসে’ নামে পরিচিত।

শনিবারের বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য এবং অন্যান্য প্রতিবাদী গোষ্ঠীর মানুষ।

এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে কথিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনের সদস্যরা।

২০১৮ সাল থেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন করে তারা ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদী আন্দোলনগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল।

ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা নতুন কিছু নয়। তবে এবারের পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন দেশটি গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আগামী বছর দায়িত্ব ছাড়বেন। জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উগ্র ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি দলের নেতা মারিন লে পেন এবং উগ্র বামপন্থী দল লা ফ্রঁস আঁসুমিজের নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে পারে।

বিভিন্ন জায়গায় লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে

মেলঁশোঁ ফ্রান্সের বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘ঝাঁপিয়ে পড়ার’ অভিযোগ তোলেন। তবে একই সঙ্গে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগেরও নিন্দা জানান।

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু তাঁর মন্তব্যকে ‘বিপজ্জনক ও কপট’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

এর আগে লেকর্নু বলেছিলেন, পুলিশ ‘অত্যন্ত তীব্র মাত্রার সহিংসতার’ মুখোমুখি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কিছু গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই বিক্ষোভকে ব্যবহার করছে।

তিনি বলেন, “কেউই সহিংসতার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে পারবে না”।

লে পেন বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের উত্থাপিত ‘যৌক্তিক দাবিগুলোকে’ উগ্র বামপন্থীরা জিম্মি করেছে। সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য তিনি মেলঁশোঁকে দায়ী করেন।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, “যারা ভাঙচুর করেছে, প্রিফেকচার কার্যালয়ের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে, এমনকি আমাদের সিটি হলগুলোতেও লুটপাট করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে”।

সরকার বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নেওয়ার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

গত আটই অক্টোবর টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রে অতিরিক্ত তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে এরপরও বিক্ষোভ থামেনি; বরং তা আরও তীব্র হয়েছে।