Home LATEST NEWS BANGLA বাংলাদেশ থেকে ভারতে কেন পাট পাচার করার অভিযোগ উঠছে

বাংলাদেশ থেকে ভারতে কেন পাট পাচার করার অভিযোগ উঠছে

4
0

Source : BBC NEWS

বাংলাদেশে এ বছর পাটের ফলন ভালো হয়েছে

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামের চর রলাকাটার পাট চাষি গাটু শেখ বিবিসি বাংলাকে বলছেন তাদের এলাকায় এবার পাটের বেশ ফলন হয়েছে এবং তার আশা তিনিসহ যারা পাট চাষ করেছেন তারা বেশ ভালো টাকা আয় করবেন।

কিন্তু এর মধ্যেই জেলার কিছু এলাকায় বাজারে পাটের সরবরাহ হুট করেই কম দেখা যাচ্ছে। ফলে জেলার বড় একটি পাটের বাজারে বিক্রি বেশ কমে গেছে বলে স্থানীয়রা বলছেন।

কুড়িগ্রামের পাটের সবচেয়ে বড় বাজার যাত্রাপুর হাটে সম্প্রতি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, নদীপথে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে পাট এবং সে কারণে ওই বাজারে এবার পাটের আমদানি খুবই কম।

আবার সীমান্ত এলাকায় মধ্যসত্ত্বভোগীরা হাটের চেয়ে তুলনামূলক বেশি দামে পাট কিনে ভারতে পাচার করছেন এমন অভিযোগও উঠছে।

ঢাকায় পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মোঃ নূরুল বাসির বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অভিযোগটি কয়েক মাস আগেই তারা পেয়েছেন এবং মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যেই বর্ডার গার্ডকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে এবং সরকারি হিসেবে দেশে প্রায় ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়।

বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির বলছেন, কাঁচাপাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পাচারের খবর তারা পাচ্ছেন, যা কিছুটা উদ্বেগজনক বলে মনে করেন তিনি।

“উদ্বৃত্ত কাঁচা পাট রপ্তানির সুযোগ থাকলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো, পাশাপাশি পাচার অভিযোগ আসতো না,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

মুন্সিগঞ্জে নৌকায় পাট তোলার দৃশ্য। ছবিটি গত ৭ই অগাস্ট তোলা।

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

কিন্তু পাট পাচারের অভিযোগ কেন উঠছে?

গাটু শেখসহ আরও কয়েকজন স্থানীয় কৃষক বলছেন যে তারা শুনেছেন ভারতে পাটের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি এবং সে কারণেই স্থানীয় কৃষকদের একটি অংশ ভারতের পাচারের জন্য মধ্যসত্ত্বভোগীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

“এখানে যাত্রাপুর বাজারে বিক্রি করলে এখন ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু ভারতের বাজারে সেটি ৫/৬ হাজার। এজন্যই কৃষকদের কাছ থেকে বাজারের চেয়ে বেশি দাম নিয়ে ফড়িয়ারা সেই পাট ভারতে নিয়ে যাচ্ছে,” বলছিলেন একজন কৃষক।

কুড়িগ্রামের মুখ্য পাট পরিদর্শকের কার্যালয়ের মুখ্য পরিদর্শক এটিএম খায়রুল হক মোট তিনটি জেলার দায়িত্বে আছেন। তিনি বলছেন, যেভাবে ব্যাপক পাচারের কথা বলা হচ্ছে বাস্তবতা তেমন নয়।

“উত্তরবঙ্গের পাটের আঁশ একটু শক্ত হওয়ায় এর বাজার ভালো। বাইরেও এর চাহিদা আছে। স্থানীয় বাজারে এখন ৪৪শ টাকা রেট পাচ্ছে কৃষক। কৃষকরা পাট পাচার করে না। তাদের কাছ থেকে পাট নিয়ে কেউ পাচার করে কি-না সেটা আমাদের জানা নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

পাট ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে আলাপ করে যে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে তা হলো, বাংলাদেশ থেকে ভারতে কাঁচা পাট রপ্তানি নিষিদ্ধ আছে, ফলে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি ভারতে পাট রপ্তানি করতে পারছে না। তবে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের এই পাটের চাহিদা ভালো।

যদিও দেশের সবচেয়ে বেশি পাট উৎপাদন হয় ফরিদপুর জেলায়, যা দেশের মোট উৎপাদিত পাটের প্রায় ৩০ শতাংশ।

কিন্তু পাট কর্মকর্তাদের মতে, ফরিদপুর অঞ্চলের পাটের আঁশ উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত পাটের আঁশের চেয়ে তুলনামূলক নরম। এ কারণে ভারতের পাটকলগুলোয় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পাটের চাহিদা বেশি।

ভারতে রপ্তানি বন্ধ থাকায় গত অর্থবছরে কাঁচাপাট রপ্তানির পরিমাণ আগের অর্থ বছরের তুলনায় বেশ কমে গেছে এবং সে কারণে কাঁচা পাট রপ্তানি থেকে আয়ও বেশ কমেছে।

বাংলাদেশে ফরিদপুরে সবচেয়ে বেশি পাট উৎপাদন হয়

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images)

গত মাসের শেষ সপ্তাহে বিজিবি আদিতমারীর সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় ৪৬০ কেজি পাট জব্দ করেছিল বিজিবি। এর আগে ২৩শে অগাস্ট পাটগ্রামে আরও চারশো কেজি পাট জব্দ করা হয়েছিল।

পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মোঃ নূরুল বাসির বলছেন, তাদের কাছেও এমন অভিযোগ এসেছে আরও কয়েক মাস আগেই।

“আমরা মন্ত্রণালয় থেকে বিজিবিকে চিঠি দিয়েছি। তারা সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালন করছে। ফলে এখন আর এই অভিযোগ খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমাদের কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

ভারতে আসলেই চাহিদা কতটা

ভারতের ন্যাশনাল জুট বোর্ডের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ভারতে পাটের প্রচুর চাহিদা। ভারত নিজে বছরে সাধারণত ৮০-৯০ লক্ষ বেলের কাছাকাছি উৎপাদন করতে পারে। তবে সময় বিশেষে চাহিদা বাড়ে। তখন ক্রাইসিস তৈরি হয়। সেই সময় আমদানি না হলে চাপ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ থেকে আগে ভারতে ৫-৬ লক্ষ বেলের কাছাকাছি পাট ভারতে রপ্তানি হত। কিন্তু এখন তা সম্পূর্ণ বন্ধ আছে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের অগাস্টে ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে চার ধরনের পাটপণ্য স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

এরপর ওই বছরের ৮ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকার কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

পাট গাছ এভাবে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে দেখা যায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এটি নাটোরের ছবি।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

এর আগে ওই বছরেরই জুনে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর স্থলবন্দর ব্যবহার করে বেশ কিছু পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করায় এমনিতেই বাংলাদেশি পাট রপ্তানি সংকুচিত হয়ে এসেছিল।

ওদিকে পাটের বিশ্ববাজার মূলত ভারতের দখলে এবং দীর্ঘকাল বাংলাদেশের উৎপাদিত পাট নিয়ে ভারত তা প্রক্রিয়াজাত কিংবা পাটজাত পণ্য তৈরি করে বিশ্ববাজারে রপ্তানি করছিল। অর্থাৎ বিদেশি ক্রেতারা এই পণ্যগুলো সরাসরি বাংলাদেশ থেকে নয় বরং ভারতের কাছ থেকে ক্রয় করছিল।

এখন বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে কাঁচাপাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় সেখানকার পাটকলগুলোতে প্রভাব পড়ছে বলেও মনে করেন এদেশের ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স এসোসিয়েশন বলছে, এসব কারণেই পাচারের প্রবণতা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে।

“এটি সত্যি বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পাট যাচ্ছে বা পাচার হচ্ছে। মাঝে ব্যাপকভাবে হচ্ছিল। এখন সংবাদ মাধ্যমে আসা ও বিজিবির তৎপরতার কারণে পাচার কমেছে। কিন্তু বন্ধ হয়নি। আমরা মন্ত্রণালয়কে বলেছি যে রপ্তানি বন্ধ থাকা ক্ষতিকর। রপ্তানির সুযোগ থাকলে সরকার ও কৃষক-উভয়েই লাভবান হতো,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির।

তিনি জানান, কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, বৃহত্তর ফরিদপুর, উত্তরবঙ্গসহ দেশের প্রায় ৪০টি জুট প্রেস হাউস বন্ধ হয়ে বহু শ্রমিক কাজ হারিয়েছে।

এই সংগঠনটির হিসেবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে আট লাখ বেলের বেশি পাট রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৮৩ হাজার বেলের সামান্য বেশি।