Home LATEST NEWS BANGLA মাকড়সা ও সাপের প্রতি ভয়কে কখন ‘ফোবিয়া’ বলা হয় ও কীভাবে তা...

মাকড়সা ও সাপের প্রতি ভয়কে কখন ‘ফোবিয়া’ বলা হয় ও কীভাবে তা দূর করা যায়?

4
0

Source : BBC NEWS

ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকা লোমশ দেহ ও পা-যুক্ত বড়, গাঢ় বাদামি রঙের একটি মাকড়সার ক্লোজ-আপ ছবি

ছবির উৎস, Art Images via Getty Images

হঠাৎ যদি আপনার বসার ঘরের মেঝে দিয়ে একটি মাকড়সা দৌড়ে যায়, তাহলে আপনার কেমন লাগবে?

বেশিরভাগ মাকড়সাই বিষধর, তবে এদের খুবই সামান্য একটি অংশ মানুষের জন্য বিপজ্জনক।

যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ১০ জনেরও কম মানুষ মাকড়সার কামড়ে মারা যায় বলে ধারণা করা হয়, যদিও সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন।

তা সত্ত্বেও, অনেক মানুষই বলবেন যে তাদের মাকড়সা-ভীতি বা ফোবিয়া আছে।

আমার (লেখক) ঘরে একটি মাকড়সা আছে জানলে আমি ঘুমাতে পারি না, আর মাকড়সার জালের কথাও আমাকে শিউরে তোলার জন্য যথেষ্ট।

অনেক ক্ষেত্রে, ফোবিয়া এমন কিছুর প্রতি তীব্র ভয়কে নির্দেশ করে, যা অন্তত নিজে থেকে আমাদের গুরুতরভাবে ক্ষতি করতে পারে না।

তাহলে এগুলো এত সাধারণ কেন এবং এগুলোর উৎস কোথায়?

ভয় থেকে ফোবিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অবস্থিত রাটগার্স ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ভ্যানেসা লোবুর মতে, ভয় মানুষের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি।

“ভয় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের সম্ভাব্য বিপজ্জনক বিষয় থেকে সুরক্ষা দেয়,” তিনি বলেন।

উজ্জ্বল আলোর বিপরীতে ছায়ামূর্তির মতো দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ পাতলা পা-ওয়ালা একটি বড় মাকড়সা।

ছবির উৎস, Elva Etienne via Getty Images

তবে যদি কোনো ভয় অত্যন্ত তীব্র হয় এবং অক্ষমতা তৈরির পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে সেটিকে ফোবিয়া হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে বলে মনে করেন হাঙ্গেরির ইউনিভার্সিটি অব পেচের ভিজ্যুয়াল কগনিশন অ্যান্ড ইমোশন ল্যাবের পরিচালক আন্দ্রাশ জিদো।

তিনি বলেন, “আমরা এটিকে একটি অবিচ্ছিন্ন চলক হিসেবে কল্পনা করতে পারি, যা সাধারণ ভয় দিয়ে শুরু হয় এবং প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো কিছুকে ভয় পায়।”

“কিন্তু যখন এটি আপনার দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে শুরু করে, তখন আমরা এটিকে ফোবিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।”

লোবুও বলেন, ফোবিয়া সাধারণত বাস্তব হুমকির তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

উদাহরণ হিসেবে, বিশ্বের কিছু অঞ্চলে, যেমন আমি যেখানে থাকি সেই যুক্তরাজ্যে, অধিকাংশ সাপের প্রজাতি মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়। ফলে সাপের প্রতি চরম ভয় অযৌক্তিক হতে পারে এবং সেটিকে ফোবিয়া হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

জন্মগত নাকি অর্জিত?

কিছু ফোবিয়া যতই সাধারণ হোক না কেন, অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন না যে আমরা এগুলো নিয়ে জন্মাই।

লোবুর বিশ্বাস, ভয় এমন একটি অনুভূতি যা খুব ছোট শিশুরা অনুভব করতে পারে না।

তিনি বলেন, “আপনি পরে গিয়ে ভয় দেখতে পান, কারণ ভয় পেতে হলে আপনাকে বুঝতে হবে যে কোনো কিছু হুমকিস্বরূপ, আর সেটা বুঝতে বিশ্বের বিষয়ে কিছুটা জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।”

তাহলে যদি আমরা মাকড়সা বা সাপকে ভয় নিয়ে জন্ম না নিই, তবে বিশেষভাবে এগুলোর প্রতি মানুষের ফোবিয়া তৈরি হয় কেন?

কালো পটভূমির সামনে গাছের ডালে বিশ্রামরত কমলা চোখের একটি সবুজ সাপ।

ছবির উৎস, dlewis33 via Getty Images

অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টেফানি হোল একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। সেখানে দেখা যায়, শিশুদের সামনে ফুল ও মাছের ছবি দেখানোর তুলনায় সাপ বা মাকড়সার ছবি দেখালে তাদের চোখের মণি বেশি প্রসারিত হয়।

চোখের মণি প্রসারিত হওয়া ইঙ্গিত দিতে পারে যে তারা সম্ভাব্য বিপদ উপলব্ধি করছে।

এটি নরঅ্যাড্রেনার্জিক সিস্টেমের সক্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা শরীরের “লড়াই অথবা পালিয়ে যাওয়া” প্রতিক্রিয়ার অংশ। এতে হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ ও শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়, কারণ শরীর তখন সম্ভাব্য বিপদের মুখোমুখি হতে বা সেখান থেকে পালাতে প্রস্তুতি নেয়।

হোল মনে করেন না যে ভয় জন্মগত, তবে তিনি বলেন পরিবেশের কিছু বিষয় আমরা অন্য কিছুর তুলনায় দ্রুত শনাক্ত করতে পারি, যা আংশিকভাবে সেগুলোর চলাচলের ধরনের কারণে হতে পারে।

তিনি বলেন, “পৃথিবীতে এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলোকে ভয় করতে শেখার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকি।”

সাদা কার্পেটের ওপর শুয়ে থাকা একটি শিশু, যে তার চেয়ে ছোট একটি শিশুকে জড়িয়ে ধরে আছে; ওপর থেকে তোলা ছবি।

ছবির উৎস, Maskot via Getty Images

লোবুর মতে, মাকড়সা ও সাপকে অন্য প্রাণীর তুলনায় ভয় করতে শেখার সম্ভাবনা বেশি, কারণ এগুলো “অদ্ভুত”।

এমন ধারণার সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত।

তিনি বলেন, “একটি সাপের কথা ভাবুন, পৃথিবীতে সাপের মতো আর কিছু নেই।”

“শিশুরা প্রাণী দেখতে দেখতে যেভাবে অভ্যস্ত হয়, সেগুলো সাধারণত চার পায়ের এবং হাঁটে, তাই না? সাপ তা করে না। মাকড়সাও অস্বাভাবিকভাবে চলাচল করে। আমরা সেটা পছন্দ করি না।”

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে ভয় করার এই প্রবণতা বিবর্তনের ফল।

জিদো বলেন, “প্রাচীন মানুষের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অনিশ্চিত।”

“মানবজাতির বিকাশের কোনো এক পর্যায়ে প্রতিটি ভয় ও ফোবিয়াই যুক্তিসঙ্গত ছিল। কিন্তু মূলত এগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আর উপকারী বা যুক্তিসঙ্গত থাকেনি।”

জালে ঝুলে থাকা একটি বড় বাদামি মাকড়সা, যা জালে আটকে পড়া একটি কালো মাছির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Catherine Falls Commercial via Getty Images

তবে নির্দিষ্ট কিছুকে ভয় পাওয়ার বিষয়টি শেখার প্রতি বিবর্তনজনিত ঝোঁক, যা ‘প্রিপেয়ার্ডনেস থিওরি’ নামে পরিচিত, এটা একাই কোনো ফোবিয়া তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়।

লোবুর মতে, কোনো প্রাণী বা বস্তুর সঙ্গে সরাসরি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হলে সেটিকে ভয় পাওয়ার দ্রুততম উপায়গুলোর একটি এটি, বিশেষ করে যদি আগে থেকেই সেটিকে ভয় করার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে।

তবে অন্য মানুষকে ভয় পেতে দেখেও আমরা কোনো কিছুকে ভয় করতে শিখতে পারি।

লোবু বলেন, “আপনার শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া হয়, আপনি কামড় খেয়েছেন, আপনি চমকে গেছেন।”

“এরপর… মা প্রতিক্রিয়া দেখালেন বা বললেন, ‘হ্যাঁ, এটা খুব খারাপ’… তখন বিষয়টি সেটিকে ভয় করতে শেখার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।”

এই কারণেই, হোলের মতে, ফোবিয়া প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হতে পারে।

‘সিনেমাগুলোর দিকে তাকান’

যেহেতু অভিজ্ঞতার বিষয়টি নির্ধারণ করে যে আমরা কোনো কিছুকে ভয় পাব কি না, তাই লোবুর ধারণা, সাপ ও মাকড়সার ফোবিয়া এত সাধারণ হওয়ার পেছনে জনপ্রিয় সংস্কৃতিও আংশিকভাবে দায়ী।

তিনি বলেন, “সিনেমাগুলোর দিকে তাকান, বইগুলোর দিকে তাকান।”

“কখন সাপ বা মাকড়সা ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখানো হয়? কখনোই না।”

দর্শকহীন একটি সিনেমা হলে পর্দার দিকে মুখ করে বসে থাকা একজন ব্যক্তি, যিনি নিজের চোখ দুটো ঢেকে রেখেছেন।

ছবির উৎস, Flashpop via Getty Images

প্রাকৃতিক জগতের বিষয়গুলোকে ঘিরে যে ফোবিয়া তৈরি হয়, যেগুলোকে বায়োফোবিয়া বলা হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে আরও একটি কারণ কাজ করতে পারে।

জিদো গবেষণা করেছেন, কোনো ব্যক্তির বসবাসের পরিবেশ কতটা নগরায়িত তার সঙ্গে প্রাণীভীতির কোনো সম্পর্ক আছে কি না।

তিনি দেখেছেন, কোনো এলাকা যত বেশি নগরায়িত, বায়োফোবিয়া তত বেশি সাধারণ।

তিনি বলেন, “যারা প্রকৃতির মধ্যে বেশি সময় কাটান, প্রকৃতির সঙ্গে যাদের অভিজ্ঞতা বেশি, তারা এসব প্রাণীকে তুলনামূলক কম ভয় পান, যেগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তাদের থাকে।”

বর্তমানে বিশ্বে ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ শহরাঞ্চলে বাস করে। সেই বিবেচনায় প্রাণী-সম্পর্কিত ফোবিয়া এত সাধারণ হওয়া বিস্ময়কর নয়।

ভয় ভুলতে শেখা

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ দুটি বিষয়ে একমত। প্রথমত, ফোবিয়া ভুলতে শেখা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, এটি করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ধীরে ধীরে তার মুখোমুখি হওয়া।

হোল বলেন, “কোনো পরিস্থিতিতে যদি আপনি সামান্য অস্বস্তি বোধ করেন, তাহলে নিজেকে একটু এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা ভালো হতে পারে।”

লোবু পরামর্শ দেন ছোট থেকে শুরু করতে। যেমন, যে বিষয়টিকে আপনি ভয় পান তার ছবি দেখা, সে সম্পর্কে ইতিবাচক তথ্য জানা, তারপর ধীরে ধীরে বাস্তবে তার সংস্পর্শে যাওয়া।

তবে ফোবিয়া যদি অত্যন্ত তীব্র হয় এবং আপনার জীবনে বড় প্রভাব ফেলে, তাহলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া ভালো হতে পারে।

হলুদ কোট ও নীল টুপি পরা একজন ব্যক্তি একটি ক্যাম্পার ভ্যানের ওপর বসে পাহাড়ি দৃশ্য দেখছেন; দিগন্তের ঠিক ওপরে সূর্য অবস্থান করছে।

ছবির উৎস, Justin Paget via Getty Images

জিদোর গবেষণাও এই ধারণাকে সমর্থন করে যে, কোনো কিছুর মুখোমুখি হওয়া শুধু ভয় কাটাতেই সাহায্য করে না, বরং শুরুতেই তা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও কমায়।

তিনি বলেন, “ভয় বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”

“যদি সেটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হয়, যেমন শৈশবে বা শিক্ষার মাধ্যমে পাওয়া, তাহলে সেটি ভয় তৈরি হওয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের সুরক্ষামূলক উপাদান হিসেবে কাজ করে।”

লোবু জোর দিয়ে বলেন, ভয় আমাদের সুরক্ষা দেয় এবং এটি ভালো একটি বিষয়, আর আমাদের ফোবিয়ার ওপর আমাদেরই নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

তিনি বলেন, “বিশেষ কোনো কিছুকে ভয় পাওয়ার জন্য আপনার নিয়তি নির্ধারিত নয়।”

“আপনি যদি কোনো কিছুকে ভয় পান এবং ভীত হতে না চান, তাহলে তার সমাধান রয়েছে।”

ব্যক্তিগতভাবে, আমি জানি না আমার মাকড়সা-ফোবিয়া কোনো অভিভাবকের কাছ থেকে শেখা, কোনো চলচ্চিত্র দেখে পাওয়া, নাকি যথেষ্ট পরিমাণে মাকড়সার মুখোমুখি না হওয়ার ফল।

হয়তো সবকিছুরই কিছুটা প্রভাব রয়েছে।

তবে হয়তো এই প্রতিবেদনটি লেখা সেটি কাটিয়ে ওঠার প্রথম ধাপ হতে পারে।