Home LATEST NEWS BANGLA মালয়েশিয়া ও চীন সফর থেকে কী অর্জন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান?

মালয়েশিয়া ও চীন সফর থেকে কী অর্জন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান?

4
0

Source : BBC NEWS

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান হেঁটে আসছেন

ছবির উৎস, PMO

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করে আনা একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব শনিবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে।

“সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে,” প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময়ে বলেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

জবাবে সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার জন্য। আমি যে কাজটি করার চেষ্টা করেছি আমার অবস্থান থেকে আমার দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলা ও সেই স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। যদি ভালো কিছু অর্জন হয় এটি বাংলাদেশের অর্জন। এ সফরে দেশের মানুষের কোনো অর্জন হলে সেটি দেশের মানুষের অর্জন”।

গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর গত ২১ থেকে ২৬শে জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর ছিল মি. রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। সফরকালে তিনি প্রথমে মালয়েশিয়া যান এবং পরে সেখান থেকে চীনে যান।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের আগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা এবং চীনের সাথে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ কিছু বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেশ দুটির শীর্ষ নেতাদের বৈঠকগুলোই বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির।

তাদের মতে, এই সফরে হওয়া সমঝোতাগুলোর ভিত্তিতে দুটি দেশের সাথেই সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সচল হলো।

বিশেষ করে তারা মনে করেন, মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার আবার চালু হওয়া, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর এবং চীনের সাথে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষায় ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই সফরের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

ছবির উৎস, PMO Bangladesh

মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যা হলো

মালয়েশিয়া সফরের শেষ পর্যায়ে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই জানিয়েছিলেন যে তিনি আরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ, অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ, আটক বাংলাদেশিদের দেশে পাঠানো এবং একই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ করেছেন।

এছাড়াও, দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে নয়টি বিষয় উঠে এসেছিল।

এতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানো, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি ‘বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতি’র সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে ‘হালাল শিল্পে’ সহযোগিতা বাড়াতে দুই প্রধানমন্ত্রী সম্মত হয়েছেন উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে চীন সফরের বিষয়ে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস বলেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং।

এছাড়া, চীন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন এবং মোংলা বন্দরকে আপগ্রেড, আরও বেশি প্রোগ্রেসিভ ও সার্ভিস ওরিয়েন্টেড করার জন্য চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে বৈঠকের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

এই সফর ও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে ১৩টি সমঝোতা স্মারক ও ৪টি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলেও জানান মি. আমিন।

 প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম

ছবির উৎস, PMO

এছাড়া, দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহায়তা এবং দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর মতো বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

তবে এই সফরের আগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং যুদ্ধবিমান কিংবা সামরিক সরঞ্জাম কেনার বিষয়টি জনপরিসরে আলোচনায় এলেও এসব বিষয়ে সরাসরি কোনো সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।

যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী, চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা করবে। পাশাপাশি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত শেষ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে।

মাহদী আমিন অবশ্য বলেছেন, “ফরেন এবং ডিফেন্স- এই দুটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ‘ফর দ্য ফার্স্ট টাইম’ বাংলাদেশের সাথে চায়নার ‘টু প্লাস টু’ একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে”।

তবে এ বিষয়ে এখনো কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

মি. আমিন জানান, “দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনার ভিত্তিতে ১৬ দফার একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও বড় সিদ্ধান্তগুলো জায়গা পেয়েছে।”

বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চীনের শিল্প স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান মি. আমিন।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে

ছবির উৎস, PMO

বাংলাদেশের অর্জন কী

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরের ‘অস্থির সময়’ পাড়ি দিয়ে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর মালয়েশিয়া ও চীনের সর্বোচ্চ নেতাদের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকই একটি ইতিবাচক বিষয়।

“শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকটাই একটা বড় অর্জন। এতে করে দেশ দুটির সাথে সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হলো। উভয় দেশই বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ।

তিনি বলেন চীন ও বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ‘টু প্লাস টু সংলাপ’ চালুর বিষয়ে আলোচনার কথা বলেছে, যা এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।

মি. আহমদ বলছেন, “সফরে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় সবগুলো বিষয়ই আলোচনায় এসেছে। হয়তো খুঁটিনাটি পরে আসবে। তখন বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা বিষয়টিকে আরও এগিয়ে নেবেন। তবে এ সফরের বিশেষত্ব হলো- টাইমিং। দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এ সফর এটি নিশ্চিত করেছে যে চীন ও বাংলাদেশ একযোগে কাজ করবে”।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ফরিদ হোসেন বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যেসব অঙ্গীকার প্রকাশ পেয়েছে সেগুলো ইতিবাচক।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে আছেন

ছবির উৎস, SCREENGRAB

তবে তার মতে, চীনের সাথে যেসব বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছে সেগুলোর কিছু বিষয়ে ভারতের যে উদ্বেগ সেটিকে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কীভাবে ডিল করে সেটাও দেখার বিষয়ে হবে।

“মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলে এবং অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণে অগ্রগতি হলে সফরটির অর্জন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে মালয়েশিয়া সফল মডেলে। তাদের বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসার পরিবেশ নিশ্চিত করাটা এখন সরকারের দায়িত্ব,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

মি. হোসেন বলছেন, চীনের সাথে অর্থনৈতিক করিডরের আলোচনা একটি ভালো অর্জন, তবে চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনাই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

“বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে এ সফরের পর চীনের বিনিয়োগ আরও গতি পাবে আশা করছি। তিস্তা প্রকল্পে তাদের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে যা অঙ্গীকার ও উদ্যোগ আছে তা ইতিবাচক। দেখার বিষয় হবে এগুলো সরকার কতটা এগিয়ে নিতে পারেন” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।