Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Photothek via Getty Images
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, মুদিদোকানের মতো কিছু ব্যবসায়িক খাতকে আগামী অর্থবছর থেকেই করের আনার পরিকল্পনা করছেন তারা।
যদিও দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ মুদিদোকানকে কিভাবে করের আওতায় আনা হবে-তার ব্যাখ্যা কিংবা পরিকল্পনা এখনো রাজস্ব বিভাগ কিংবা অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেনি।
অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায় যা বলেছেন তার ভিত্তিতে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা ধারণা দিচ্ছেন যে, মুদিদোকান বা এমন ধরনের খাতগুলোকে প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা চলছে।
যদিও এ ধারণাটি বর্তমান ভ্যাট আইনের সাথে সাংঘর্ষিক কারণ সবশেষ প্রণীত ভ্যাট আইনে সর্বোচ্চ ত্রিশ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক বিক্রয় হয় এমন প্রতিষ্ঠানকে টার্নওভার কর ও ভ্যাট থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ডঃ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম অবশ্য বলছেন, তার ধারণা সরকার প্যাকেজ ভ্যাট প্রচলনের দিকেই যাচ্ছে এবং তার মতে, উদ্যোগটি যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়।
“অর্থনীতির স্বার্থেই মুদিদোকান বা এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোকে করের আওতায় আনার চিন্তা যৌক্তিক। শুরুতে গুচ্ছ বা প্যাকেজ সিস্টেম হলেও পর্যায়ক্রমে সারাদেশেই এ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় এনে একটি সিস্টেম দাঁড় করাতে পারলে অর্থনীতি উপকৃত হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
ছবির উৎস, Corbis via Getty Images
কী বলেছেন অর্থমন্ত্রী
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে মুদি দোকান, বিউটি পার্লার, রেস্তোরাঁসহ ১৬ ধরনের ব্যবসায়িক খাতকে নতুন অর্থবছরে ভ্যাটের সুনির্দিষ্ট করের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যেসব ব্যবসায়িক খাতকে ভ্যাটের সুনির্দিষ্ট করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলো হল- মুদি দোকান, তৈরি পোশাক বা কাপড় বিক্রেতা, কনফেকশনারি, কসমেটিক্সের দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্য এবং জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার পণ্যের বিক্রেতা, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বিক্রেতা।
এছাড়া পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার এবং স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলসের দোকান, ঢেউটিনের দোকান, রড ও সিমেন্ট, ফার্নিচার, বিউটি পার্লার, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং রেস্তোরাঁকেও এ পরিকল্পনার আওতায় রাখা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এর আগে অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের যে বাজেট সংসদে উত্থাপন করেছেন, তাতে খুচরা দোকানিদের কাছ থেকে ভ্যাট নিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর নেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। যদিও এর পরিমাণ সম্পর্কে এখনও রাজস্ব বিভাগ বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ই জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন।
ওই প্রস্তাবনাতেই করের আওতা বাড়াতে সারাদেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন প্রস্তাব এনে বলা হয়েছিল যে এ ধরনের ব্যবসায়ীদের কর দিতে হবে।
প্রস্তাবিত কর কাঠামো অনুযায়ী, খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার টাকায় দুই টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। এটি নির্ধারিত থাকবে, যাতে কোনো অনিয়ম করার সুযোগ না থাকে।
কিন্তু বুধবার অর্থমন্ত্রী যে মুদিদোকানিদের কথা বলেছেন তার সংজ্ঞা কী কিংবা দেশজুড়ে পাড়া মহল্লা পর্যন্ত ব্যবসা করা মুদিদোকানগুলো তার কর পরিকল্পনার আওতায় আসবে কি-না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
তবে রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এই ধারণাই পাওয়া গেছে যে, মুদিদোকানগুলোকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা চলছে যার বিস্তারিত জানা যাবে বাজেট পাসের পর।
ছবির উৎস, Corbis via Getty Images
কীভাবে করের আওতায় আসবে মুদিদোকান
এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে তা হলো, প্যাকেজ ভ্যাট চালু হলেও ক্ষুদ্র এই দোকানিদের ভ্যাটসংক্রান্ত কোনো দলিল বা হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে না এবং তাদেরকে আয়কর রিটার্নও দিতে হবে না।
তাদের জন্য, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহজে ভ্যাট পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, বাজেট পাশের আগমুহূর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রজ্ঞাপন জারি ভ্যাটের হার জানিয়ে দিবে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় ৭০ লাখ খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন। এর বাইরেও সারাদেশে রয়েছে অসংখ্য ছোটো বড় মুদিদোকান, যার বিস্তৃতি পাড়া মহল্লা পর্যন্ত।
রাজস্ব কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে একটি প্যাকেজ সিস্টেম চালু হতে পারে দোকানের আকার, বিক্রির পরিমাণ ও মজুতের আকারের ভিত্তিতে । কিংবা সাদামাটা ভাবে উপজেলা, জেলা থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে থাকা মুদিদোকানের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট নির্ধারণ হতে পারে।
এর আগে ১৯৯১ সালে ভ্যাট আইনে এ ধরনের প্যাকেজ ভ্যাটের বিধান থাকলেও পরে আইনে সেটি আর রাখা হয়নি।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ২০০৬ সাল থেকে প্রবর্তিত সহজ পদ্ধতিভিত্তিক থোক ভ্যাট ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্যাকেজ ভ্যাট হিসেবে প্রচলিত ছিল।
কিন্তু সবশেষ ভ্যাট আইনে সর্বোচ্চ ত্রিশ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানকে কর ও ভ্যাট থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এখন আবার দেশজুড়ে মুদিদোকানি বা যত্রতত্র গড়ে ওঠা পার্লারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাটের আওতায় আনতে প্যাকেজ ভ্যাটের চিন্তা করা হচ্ছে।
ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
মুদিদোকানকে করের আওতায় আনা সম্ভব?
ঢাকার রমনা এলাকায় একটি ছোটো মুদি দোকান চালান লিটন মিয়া, যার দিনে ৫-৭ হাজার টাকা পণ্য বিক্রি হয়। “আমাদের আবার ট্যাক্স কী? একটা ছোটো দোকান দিছি, কয় টাকা আর ইনকাম হয়,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
তার মতো বাংলাদেশের বহু মুদিদোকানেরই ট্রেড লাইসেন্স নেই। ব্যক্তিগতভাবে যত্রতত্র গড়ে ওঠা এমন মুদিদোকানকে কিভাবে করের আওতায় আনা যাবে, তা নিয়ে এখনো পর্যালোচনা চলছে রাজস্ব বিভাগে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, এসব দোকানগুলোতে যথাযথ রেজিস্টার নেই, তারা কোনো ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার মেইনটেইন করে না- যে কারণে তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ে জটিলতা আছে।
“তবে ধাপে ধাপে তাদের রেজিস্টারের আওতায় আনার চেষ্টা করা যেতে পারে এবং অর্থনীতির স্বার্থেই এটা দরকার। এখন হয়তো সরকার দোকানের আকার, বিক্রির পরিমাণ, পণ্যের মজুত দেখে একটা পরিমাণ ঠিক করবে। সে পরিমাণের ভিত্তিতে ভ্যাট নির্ধারণ হবে। এটা দিয়ে শুরু হতে পরে। এর মাধ্যমে এসব ব্যবসায়ীদের ক্রমাগত করের আওতায় নিয়ে আসা যাবে। পর্যায়ক্রমে ডিজিটালি করা গেলে ভবিষ্যতে একটি সিস্টেম দাঁড়িয়ে যাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
তার মতে, দেশের অর্থনীতি বাড়ছে ও মানুষের আয় বাড়ছে এবং সে কারণে সরকারের এই চিন্তাকে স্বাগত জানানো দরকার বলে তিনি মনে করেন।
যদিও এর আগে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার ও প্যাকেজ ভ্যাট বাধ্যতামূলক করতে গিয়ে বিরোধিতার মুখে পড়েছিল রাজস্ব বিভাগ।




