Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুতিতে হাঁসুয়া দিয়ে চার শিশুকে কুপিয়েছে এক যুবক। এ ঘটনায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, অন্যজন গুরুতর আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
ওই শিশুদের মধ্যে দুই জন ওই যুবকের ভাগ্নি বলে জানা যাচ্ছে এবং একজন অভিযুক্তের ভাইঝি।
অভিযুক্ত যুবক থানায় আত্মসমর্পণ করেছে, পুলিশ গ্রেফতারও করেছে তাকে।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নাবালিকাকে যৌন হেনস্তার অভিযোগও উঠেছে, যদিও প্রাথমিকভাবে পুলিশ এখনও সে বিষয় কিছু জানায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, বৃহস্পতিবার বিকালে চারটি শিশু যাদের মধ্যে একজনের বয়স ১১ বছর, বাকিরা পাঁচ, ছয় ও সাত বছর বয়সী, তারা বাড়ির উঠোনে নিজেদের মধ্যে খেলা করছিল। আচমকাই ওই যুবক ১১ বছর বয়সী শিশুটিকে ঘরের ভেতর নিয়ে গিয়ে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। তখন অন্য তিন শিশু তা দেখে ফেলায় চারজনকেই হাঁসুয়া দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপ মারে অভিযুক্ত।
পুলিশ জানিয়েছে মৃত শিশুদের নাম মণিফা খাতুন (৫), ইসরাত পারভিন (১১) এবং আনিসা খাতুন (৭) অন্যদিকে চতুর্থ শিশু নুসরত জাহান (৬)-এর অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, প্রতিবেশীরাই রক্তাক্ত অবস্থায় আহত শিশুদের প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান।
হামলার পর এক শিশু ঘটনাস্থলেই মারা যায় বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। বাকি তিনজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে পথে দুজনের মৃত্যু হয়, অপর একজন এখনও গুরুতর আহতঅবস্থায় মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি।
ছবির উৎস, Ram Prasad Pramanik
অভিযুক্ত কি মানসিক ভারসাম্যহীন?
অভিযুক্তের নাম গোলাম সারওয়ার। চার শিশুর মধ্যে তিনজন অভিযুক্তের পরিবারের সদস্য হলেও, এক শিশু ছিল প্রতিবেশী। তার দাদু সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, শিশুগুলি খেলছিল। হঠাৎই ওই অভিযুক্ত তাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ওবায়দুল্লা শেখ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “গোলাম মানসিক সমস্যায় ভুগছিল। হঠাৎই ওর মাথায় কোনো গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছে, তা না হলে চার শিশুকন্যাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর কোনো কারণই নেই।”
যদিও মৃত মনিফা খাতুনের মা ইসমোতারা খাতুনের অভিযোগ, অভিযুক্তের পরিবার মিথ্যা বলছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “হাতে মেহেন্দি পরতে গিয়েছিল আমার মেয়ে। তার ঠিক দুই মিনিটের মধ্যেই ওর ওপর হামলা করে।”
তিনি অভিযুক্তের ফাঁসির সাজা দাবি করেছেন।
ছবির উৎস, Ram Prasad Pramanik
পুলিশের দাবি
জেলার পুলিশ সুপার শচীন মক্কার জানাচ্ছেন, অভিযুক্ত ঘটনার পর নিজেই থানায় গিয়ে আত্মসর্মপণ করে। পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার হওয়া হাঁসুয়াটিও উদ্ধার করেছে। কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড তা নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগতেন অভিযুক্ত। ওষুধও খেতেন। তবে কোনও পুরোনো শত্রুতার যোগ রয়েছে কি না সে ব্যাপারেও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সাহায্যও নেওয়া হতে পারে বলে সুতি থানা সূত্রে খবর।
তদন্তে নেমে পুলিশ অভিযুক্ত ২১ বছরের যুবক গোলাম সারওয়ারের ঘর থেকে একাধিক মানসিক অবসাদ প্রতিরোধের ওষুধ (অ্যান্টি-ডিপ্রেশেন্ট ড্রাগ) ও বেশ কিছু প্রেসক্রিপশন উদ্ধার করেছে। অভিযুক্তের বাবার দাবি, তার ছেলে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিল এবং বহরমপুরে তার চিকিৎসাও চলছিল।
তবে পুলিশ এখনই বিষয়টিকে কেবল মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণ হিসাবে দেখতে নারাজ। আকস্মিক কোনো সিদ্ধান্ত নাকি দীর্ঘদিনের পুরানো পারিবারিক শত্রুতা— সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন তদন্তকারীরা।
তবে ঘটনার সময় অভিযুক্ত নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিল না, এমনটা বলছে পুলিশ। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সেরকম কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ছবির উৎস, Ram Prasad Pramanik
চিকিৎসকরা কী জানাচ্ছেন?
মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অনাদি রায়চৌধুরী জানিয়েছেন, হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে একটি শিশু গুরুতর জখম অবস্থায় ভর্তি রয়েছে। শিশুটির মাথায়, পিঠে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। ফলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে।
বাকি দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসকরা তাদের মৃত বলে ঘোষণা করেন। তাদেরও শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এখনই প্রমাণিত নয় বলেই হাসপাতাল সূত্রে খবর।
ছবির উৎস, Getty Images
হাসপাতালের ‘রেফার’ নিয়ে যত অভিযোগ
রেফারের সময় দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিবেশীরা।
স্থানীয় হাসপাতাল থেকে বড় শহরের হাসপাতালে বা অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের সমস্যা।
পশ্চিমবঙ্গের বিগত তৃণমূল সরকারের আমলেও এই অভিযোগ একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছে।
ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন সমস্ত সরকারি হাসপাতালে নজরদারি চালানো হবে। সম্প্রতি তিনি এও জানান যে দালালচক্র রুখতে ও রেফার সমস্যার সমাধানে মনিটরিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট লোক নিয়োগ করছে রাজ্য সরকার।
রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলোতে লাইভ মনিটরিং চালানোর কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
তারপরেও রেফার করার ঘটনার অভিযোগ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।




