Source : BBC NEWS

ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তি চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন আলোচনার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তিনি জানিয়েছেন, ১৯শে জুন শুক্রবার জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে চুক্তিতে পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত করেছেন ট্রুথ সোশ্যালে। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি টোল ফ্রি হবে, আর সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজের ঘারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টিভিতে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার খবর নিশ্চিত করেছেন।

দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা একে ইরানের বিজয় হিসেবে চিত্রিত করছেন।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইতালি এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। পরে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়।

এক পর্যায়ে বিশ্বের তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ তৈরি করে।

ওদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, জেনেভায় চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপস্থিত থাকবেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্বাক্ষর করতে পারেন।

হরমুজ প্রণালি

ছবির উৎস, Reuters

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিলেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন: “নিবিড় আলোচনার পর আমরা আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।”

“উভয় পক্ষ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রম অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।”

তিনি আরও জানান যে, সুইজারল্যান্ডে আগামী ১৯শে জুন আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হবে।

শেহবাজ শরিফ তার বিবৃতিতে কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “চুক্তি এখন সম্পন্ন হওয়ায়, মধ্যস্থতাকারীরা এই সপ্তাহে একাধিক বৈঠকের আয়োজন করবেন। বাস্তবায়নের পূর্ববর্তী এসব আলোচনা কারিগরি পর্যায়ের আলোচনার ভিত্তি স্থাপন করবে এবং আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি এগিয়ে নেবে”।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি

ছবির উৎস, EPA/Shutterstock

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা রুট

ট্রাম্প যা বলেছেন

পাকিস্তানের দিক থেকে দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চুক্তিতে পৌঁছেছে।

“ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে,” ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, “আমি এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো টোল বা বাধা ছাড়াই জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর পূর্ণ অনুমোদন দিচ্ছি এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি।”

“বিশ্বের সব জাহাজ, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ চলতে দাও!” বলেছেন তিনি।

চুক্তিতে পৌঁছাতে ১৫ ঘণ্টার আলোচনা

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত করতে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা দীর্ঘ আলোচনা চালিয়েছেন।

তিনি সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন: “এই আলোচনার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময় নিয়েছে।”

“গতকাল একটি কাতারি প্রতিনিধিদল তেহরানে ছিল, যাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ এর বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা যায়।”

চুক্তির খবর নিশ্চিত করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images

তিনি বলেন, “প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনায় আমরা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সংশোধনী প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করি।

স্বাভাবিকভাবেই সেসব সংশোধনী গ্রহণ করা হয় এবং সমঝোতা স্মারকের পাঠ্য চূড়ান্ত করা হয়।”

উপমন্ত্রী আরও বলেন, “চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ৬০ দিনের একটি সময়সীমার মধ্যে চলবে। এই সময়ে ইরানের সামনে ‘বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ রয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় হলো ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা”।

ইরানি সংবাদমাধ্যমে ১৪ দফা সমঝোতা

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক -এর খসড়া বিবরণ পেয়েছে।

তবে এগুলো এখনো কোনো পক্ষ, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান, আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি

ছবির উৎস, Getty Images

আধা-সরকারি ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সির এক রিপোর্টে খসড়ার যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো:

* লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি

* ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার

* ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার

* ইরান থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহার

* ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি চালু করা

* যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা প্রদান

* ইরানের তেল ও জ্বালানি পণ্যের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

* ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন না করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত

*এই অঞ্চলে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বৃদ্ধি না করা এবং নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার মার্কিন প্রতিশ্রুতি।

মেহের নিউজ এজেন্সি আরও জানিয়েছে: “ইরানের জব্দকৃত বা স্থগিত তহবিলের অন্তত অর্ধেক মুক্ত করা, ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে না।”

সংবাদমাধ্যমটির দাবি, চূড়ান্ত চুক্তিটি পরবর্তীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।

ইরানি সংবাদমাধ্যমে চুক্তিতে তেহরানের বিজয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ স্বাগত জানিয়েছে

চুক্তি সম্পর্কে এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইটালির নেতারা বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন, যাতে ‘এই সুযোগকে কাজে লাগানো যায়।

ই-ফোর নামে পরিচিত এ গ্রুপটি বলেছে: “আমরা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান সরকার এবং এই কূটনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে, বিশেষ করে পাকিস্তান, কাতার এবং অন্যান্য সব মধ্যস্থতাকারীকে অভিনন্দন জানাই।”

“এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের মুহূর্ত।”

তারা চুক্তিটি দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের আহবান জানিয়ে বলেন, “হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং কোনো শর্ত বা বাধা ছাড়া নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

গোষ্ঠীটি বলেছে: “ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।”

এসব দেশের নেতারা লেবাননের স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।