Home LATEST NEWS BANGLA সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল দিতে বাড়তি টাকা কোথা থেকে আনছে সরকার?

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল দিতে বাড়তি টাকা কোথা থেকে আনছে সরকার?

5
0

Source : BBC NEWS

বিভিন্ন অঙ্কের টাকা

নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী পহেলা নভেম্বর থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি বেতন দেওয়া শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। আর এর জন্য সরকারকে বিপুল পরিমাণ টাকা ঋণ করতে হচ্ছে।

যদিও এই পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর মাধ্যমেই বাড়তি অর্থ সংকুলানের কথা বলে আসছিল সরকার।

কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আয় বাড়েনি, বরং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সংকুলান, বিদেশি ঋণের তুলনায় সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপসহ নানা খাতে সরকারের ব্যয় বেড়ে গেছে।

ফলে সরকারকে এখন অভ্যন্তরীণ উৎসের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক খাত, সঞ্চয়পত্র, ট্রেজারি বিল-বন্ডসহ নানা খাত থেকে ঋণ নিয়ে এই অর্থের সংস্থান করছে সরকার।

বাড়তি এই অর্থের সংকুলান করতে অন্যান্য ঋণের উৎসের পাশাপাশি ১৪ দিন মেয়াদী বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছে সরকার। এই বিলের মাধ্যমে বুধবার সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজস্ব আদায় না বাড়ায় ক্রমাগতভাবে ঋণ নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করা ছাড়া সরকারের বিকল্প কোনো পথ নেই।

আর এই ঋণ গ্রহণের প্রতিক্রিয়ায় প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, বেসরকারি খাত এবং মূল্যস্ফীতিসহ নানাভাবে সাধারণ মানুষ প্রভাবিত হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “এখন পর্যন্ত সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রাগুলো ছিল, ত্রৈমাসিক লক্ষ্যমাত্রা বা অন্যান্য – কোনটাই কিন্তু অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকার অনেকটাই ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। আর বকেয়া বেতন দিতে হলে তো অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন।”

“আর সরকার যখন ঋণ নেয়, তখন এর প্রভাবটা বিভিন্নভাবে জনগণের ওপরেই পড়ে,” বলেন তিনি।

টাকা গুনছেন এক নারী

বাড়তি ব্যয় কীভাবে সামাল দেবে সরকার?

বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় নয় লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন।

চলতি অর্থ বছরের বাজেটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ ব্যয় এক লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

গত জুনে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পহেলা জুলাই থেকেই ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

একইসঙ্গে, মূল্যস্ফীতি, বাজেটের ওপর চাপ কমানো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনেতিক চাপ সামলানোর মধ্যে গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য আনতে দুই বছরে ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার।

ঘোষণা অনুযায়ী, অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসের বকেয়া বাড়তি বেতনও পরিশোধ করতে হবে সরকারকে।

বেতন কমিশনের সুপারিশ ও সরকারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। আর এর মধ্যে ৪৪ হাজার কোটি টাকা চলতি অর্থ বছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ উৎসের বড় অংশ রাজস্ব আয় বাড়িয়ে নবম বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের অর্থের সংস্থান করার কথা জানিয়েছিল সরকার।

এছাড়া, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, যারা ঋণ দেয়, সেগুলোকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনাও করেছিল সরকার।

কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পাওয়া গেছে তার দ্বিগুণেরও বেশি আগের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে।

এই তিন মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে।

অন্যদিকে, একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার ঋণের অর্থ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নতুন বৈদেশিক সহায়তার তুলনায় ঋণ পরিশোধে প্রায় ৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার বেশি ব্যয় করেছে সরকার।

সোমবার প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

ফলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণের উৎসের দিকে নির্ভর করতে হচ্ছে বলে জানান অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ট্রেজারি বিল বন্ডের মাধ্যমে চলতি মাসে সরকার ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আর এই অর্থবছরের প্রথম মাস, জুলাই মাসে বিল-বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে সরকার ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।

এদিকে, এই অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেওয়া নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকারও বেশি।

এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব খাত ছাড়াও সরকারকে নানা খাতে ঋণ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, আজ বুধবার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ১৪ দিনের জন্য আরো পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার, এটার নিলামের জন্য পূর্বনির্ধারিত ছিল আজ।

ফলে চলতি অক্টোবর মাসে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ঢাকার একটি বাজার

প্রভাব কী হবে?

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়া ছাড়া আপাতত আর কোনো উপায় নেই। তবে জনগণের ওপর এর প্রভাব পড়বে।

অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, “এখন সরকার যে নির্বিচারে ঋণ নিচ্ছে, স্বাভাবিকভাবেই এর একটা বিরূপ প্রভাব কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়ার একটা আশঙ্কা থাকে।”

তিনি বলছেন, সরকারের লক্ষ্য ছিল ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে আনা। সেক্ষেত্রে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণের মাধ্যমে পরিস্থিতি আপাতত সামলানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সরকারের দায় হয়েই থাকবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ ট্রেজারি বিল বা ব্যাংক থেকে, অথবা বৈদেশিক উৎস থেকে, যেভাবেই ঋণ যেভাবেই নেওয়া হোক না কেন, নির্ধারিত সময় শেষে সুদসহই সেটি পরিশোধ করতে হবে।

একইসঙ্গে, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়লে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন অর্থনীতিবিদরা।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “এমনি ভোক্তা চাহিদা কম, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা কম সাধারণ মানুষের। এই বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির প্রভাবটা আরো বাড়াবে, সেটা আশঙ্কা করা যায়।”

এদিকে, শুধু বেতন-ভাতাই নয়, বাড়বে পেনশনের ব্যয়ও। ফলে সরকারকে ব্যয় কমানোর মতো দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগও নিতে হবে।

মি. মোয়াজ্জেম বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পদ খালি রয়েছে। সে পদগুলোয় নতুন করে নিয়োগ না দেওয়া, যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে ডিস্ট্রিবিউশন ঠিকমতো করা।”

আর্থিক দায় বাড়লে সরকারকে বিনিয়োগের উদ্যোগও নিতে হবে পরামর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “এত ব্যয় বৃদ্ধি যাতে মাথা ব্যথার কারণ না হয়”।