Home LATEST NEWS BANGLA সিকিমে ভূমিধসের ফলে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ তিস্তা নদী – এখন পরিস্থিতি কেমন?

সিকিমে ভূমিধসের ফলে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ তিস্তা নদী – এখন পরিস্থিতি কেমন?

4
0

Source : BBC NEWS

যেখানে ভূমিধস ধটেছে

ছবির উৎস, Mangan District Administration/X

পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্য সিকিমের মাঙ্গান জেলায় ভূমিধসের ফলে তিস্তা নদীর একটি অংশ অবরুদ্ধ হয়ে বাধের সৃষ্টি হয়েছে। যা সেখানে আকস্মিক বন্যার উদ্বেগ তৈরি করেছে। নদীর অববাহিকা সংলগ্ন অঞ্চলে ইতিমধ্যে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শনিবার গভীর রাতে উত্তর সিকিমের নাগা বনাঞ্চল থেং টানেল সংলগ্ন এলাকায় ভূমিধস দেখা দেয়।

চিয়াকুং নদীর উপর পাহাড়ের একটা বড় অংশ ধসে নদীতে পড়ে। এর ফলে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে চিয়াকুং এবং তিস্তা নদীর জলপ্রবাহ।

পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর চিয়াকুং নদীতে জমা হয়ে ওই অংশে একটা বাঁধের মতো তৈরি হয়, যার পিছনের অংশে জল জমতে শুরু করে।

দুর্যোগের কারণে তৈরি হওয়া এই বাঁধ ভেঙে গেলে জলরাশি আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এখনো পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর মেলেনি। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, এখন তিস্তার প্রবাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

এই ঘটনা এমন সময় ঘটল যার কিছুদিন আগেই সিকিমের প্রতিবেশী নেপালে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় বহু হতাহত আর নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে মৃতের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে, এখনো কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ।

গত বছর উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টির কারণে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। কোথাও জাতীয় সড়কে ভয়াবহ ধস দেখা দেয়, কোথাও আবার সেতু নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছিল। ২০২৩ সালে সিকিমে আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

নদীর অববাহিকা সংলগ্ন অঞ্চলে ইতিমধ্যে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

মাঙ্গানের জেলা শাসকের তরফে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “অপসারণ অভিযান সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে, নদীর তীরের কাছাকাছি না যেতে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্বেচ্ছায় নিরাপদ ও উঁচু স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

সিকিমের স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথোরিটি (এসএসডিএমএ) এবং স্টেট ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার (এসইওসি)-এর পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি এবং কুচবিহারে কিছু অংশে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।

উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। প্রশাসন সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করেছে। সিকিমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।”

ধসের পর নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা কাদা মিশ্রিত জল

ছবির উৎস, Mangan District Administration/X

এখন কী পরিস্থিতি?

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিস্তার জলপ্রবাহ ধীরে হলেও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তিস্তার উপনদী চিয়াকুংয়ের জলও ক্ষীণ স্রোতে বইছে।

তবে ধসের ফলে কাদা, মাটি বড় পাথর এসে জমে দুই নদীর উপর একটা প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করেছে। দুর্যোগের ফলে তৈরি হওয়া এই বাঁধের পিছনে প্রচুর পরিমাণে জল জমে রয়েছে।

ওই অঞ্চলে আবার ভূমিধস হলে বা ভারী বৃষ্টির কারণে তৈরি হওয়া এই বাঁধ ভেঙে গেলে প্রবল জলচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া দুর্যোগের কারণে তৈরি হওয়া ওই বাঁধের পিছনে জমে থাকা জলের পরিমাণ এবং ধসের ফলে নদীর কতটা অংশ অবরুদ্ধ হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে মাঙ্গান ও চুংথাং প্রশাসন যৌথভাবে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে।

চুংথাং থানা এবং থেং চেক পোস্ট থেকে পুলিশকর্মীদের ওই ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সঙ্কলং ও ফিদাং এলাকায় তিস্তার জলস্তর আপাতত স্বাভাবিক রয়েছে।

সিকিমে ধসের কারণে একদিকে যেমন নদীর গতিপথ আংশিকভাবে অবরুদ্ধ হয়েছে তেমনই ধসের প্রভাব পড়েছে থেং টানেলের বিপরীতে নাগা বনাঞ্চল এলাকার নাগা–তোসা সড়কেও। নতুন কাটা পাহাড়ি রাস্তার একটা বড় অংশ ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে হতাহতের খবর নেই।

এদিকে, উত্তরবঙ্গের কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার জেলায় তিস্তার বিস্তীর্ণ অববাহিকাজুড়ে জলস্তর ইতিমধ্যে বেড়েছে।

স্থানীয়দের নিরাপ্ততার কথা মাথায় রেখে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বাসুসুবা, গজলডোবা, বাগরাকোট-সহ তিস্তাসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। নদীর তীর এড়িয়ে চলতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঝুলন্ত সেতু ও নদী সংলগ্ন রাস্তা ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছে।

উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা গৌতম সাহা পেশায় গাড়ি চালক। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “মালবাজার অঞ্চলে হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। সকাল থেকে প্রশাসনের তরফ থেকে নদী সংলগ্ন অঞ্চলে মাইকিং করা হচ্ছে।”

“সিকিমে আগেও ভুমিধস হয়েছে তাই পর্যটকদের সাবধান করা হয়েছে। সিকিমের যেখানে ভুমিধস হয়েছে সেখানে আমি বহুবার গিয়েছি। এখনকার পরিস্থিতি ভয়াবহ না হলেও গতবছর বন্যায় উত্তরবঙ্গের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। ২০২৩ সালে সিকিমে ফ্ল্যাশফ্লাড দেখা দিয়েছিল।”

গতবছর তোলা সেবক- করোনেশন ব্রিজের ছবি

ছবির উৎস, Soumya Ganguly

পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের সে বিষয়ে উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা এবং প্রবীণ সাংবাদিক গৌতম সরকার বলেছেন, “ভূমিধসের কারণে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে আছে নদীর জলপ্রবাহ। অল্প অল্প করে জল আসছে এবং সেই জল যাতে বেরিয়ে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে, কারণ ধসের যে অংশটা আটকে আছে সেখানে যদি প্রচুর পরিমাণে জল জমে যায় তাহলে সেগুলো নেপালের মতো নেমে (আকস্মিক বন্যার আকারে কাদা, বোল্ডার ইত্যাদি নেমে আসার) আসতে পারে।”

“সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গে তিস্তা অববাহিকায় হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। সিকিমের কিছু জায়গা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় চলে যেতেও বলা হয়েছে। এখনো যা পরিস্থিতি তাতে, যতক্ষণ না ওই ব্লকেড সরে যাচ্ছে ততক্ষণ সমস্যাটা থেকেই যাবে।”

গতবছর ভারী বৃষ্টির কারণে উত্তরবঙ্গের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। বালাসন নদীর জলে তলিয়ে যায় দুধিয়ার অস্থায়ী সেতু। জাতীয় সড়কে ভয়াবহ ধস দেখা দেয়, বহু মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন, জলের স্রোতে পশুদের ভেসে দেওয়ার দৃশ্যও চোখে পড়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় আটকে পড়েন বহু পর্যটক।

এর আগে ২০২৩ সালে সিকিমে আকস্মিক বন্যা দেখা গিয়েছিল। সে সময় চুংথাং-এর তিস্তা-থ্রি বাঁধ ভেঙে যায়, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সেতুও ডুবে যায়।

তিস্তার জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় সিকিমের মাঙ্গান, গ্যাংটক, পাকিয়ং এবং নামচি জেলা এবং পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং, কোচবিহার , জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলার বহু এলাকা প্লাবিত হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বহু পর্যটক আটকে পড়েন।

ফ্ল্যাশ ফ্লাডের এই ঘটনার প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশেও।

শনিবার রাতের ঘটনা সেই সমস্ত স্মৃতি উস্কে দিয়েছে।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ান তনয়া গুপ্ত বলেছেন, “বহু চেষ্টার পরও সিকিমে আগেরবারের দুর্যোগের চিহ্ন এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে গিয়েছিল। ঘটনার পর যখন আবার রাস্তাঘাট চালু হলো, সে সময় কালিম্পং হয়ে সিকিম যাওয়ার পথে চোখে পড়েছিল কারো বাড়ির চাল এসে একপাশে ঝুলে রয়েছে, কারো ব্যবহার করা জিনিস। সেই দৃশ্য ভোলার নয়।”

“এবারে এখনো পর্যন্ত তেমন ভয়াবহতা দেখা না গেলেও ভারী বৃষ্টিতে নদীর জলস্তর বেড়ে গেলেই উদ্বেগ বাড়ে।”

ধসের পর তোলা ছবি

ছবির উৎস, Aveek Das

যে কারণে উদ্বেগ

সিকিম বা উত্তরবঙ্গে ভূমিধ্বস এবং বন্যা পরিস্থিতি নতুন নয়। তাই এখনো তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও উদ্বেগ রয়ে যাচ্ছে বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদের অ্যাসোসিয়েট এডিটর গৌতম সরকার ব্যাখ্যা করেছেন, “ক্যাচমেন্ট এরিয়াতে ভারী বৃষ্টি হলে, প্রচুর জল আসে। এর আগেও তিস্তা বাজার এলাকাকে এভাবে কয়েকবার ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তিস্তা বাজারের ডাউন স্ট্রিমে সেবকের পর যে এলাকা রয়েছে- গজলডোবা থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত মেখলিগঞ্জের দুই পাশে অনেকটাই প্রতিবারই প্রভাবিত হয়। সেখানকার গ্রাম ডুবে যায়, সাধারণ মানুষকে অন্যত্র সরে যেতে হয়। এটা প্রায় প্রতিবছরই দেখা দেয়।”

“যে ক্ষয়ক্ষতি এখানে হবে সেটা বাংলাদেশেও দেখতে পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নেপালের ক্ষেত্রে যেমন আমরা দেখেছি ওই ধস যত এগিয়েছে তত দুপাশের বাড়ি ঘর সবকিছু নিয়ে এগিয়েছে। ফলে এখানে সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার গ্রাম, গবাদি পশু-সব সঙ্গে নিয়ে নামবে। এই ডেব্রিসও (ভুমিধসের ফলে আকস্মিক বন্যার সঙ্গে ধেয়ে আসা ধ্বংসাবশেষ বোঝাতে) বাংলাদেশে ঢুকে যাবে।”

“এখন কতটা আশঙ্কা তা বলা সম্ভব নয়। ওই ব্লকেড না সরলে কিছু অনুমান করা সম্ভব নয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।”

নেপাল বিপর্যয়ের পর এই ঘটনা আরো উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে সিকিমে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে এবং ওই রাজ্যে একাধিক উচ্চঝুঁকির হিমবাহ-হ্রদ চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৩ সালে চুংথাং এলাকাতেই আকস্মিক বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

হিমবাহ গলে গেলে তার পৃষ্ঠে বা নিকটবর্তী নিম্নভূমিতে গিয়ে জল জমে এবং হিমবাহ হ্রদ তৈরি হয়। এই অতিরিক্ত জল জমে গেলে কিংবা ভুমিকম্পের কারণে তা উপচে পড়তে পারে। এই বন্যা ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে। এর ফলে ডাউন স্ট্রিমের দিকে থাকা এলাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

পরিবেশবিদ সৌভিক চোঙদার ব্যাখ্যা করেছেন, “সিকিমেও এমন ১০০-রও বেশি গ্লেসিয়াল লেক আছে। এর মধ্যে পঞ্চাশের বেশি গ্লেসিয়াল লেক উচ্চঝুঁকিপূর্ণর তালিকায় আছে। অর্থাৎ সিকিমে যদি নেপালের মতো ভুমিধসের ফলে ফ্ল্যাশফ্লাড দেখা যায় তাহলে সিকিম ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগযোগ রয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং পর্যটন কেন্দ্র জলের তলায় চলে যেতে পারে। এই বিষয়ে আমরা বারবার সর্তক করে এসেছি এবং এখন সেই পরিস্থিতি কিন্তু আরো ভয়ানক হয়ে উঠেছে।”