Home LATEST NEWS BANGLA স্পিননির্ভর দল থেকে যেভাবে বাংলাদেশ টিমে পেস বিপ্লব ঘটেছে

স্পিননির্ভর দল থেকে যেভাবে বাংলাদেশ টিমে পেস বিপ্লব ঘটেছে

5
0

Source : BBC NEWS

তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ও হাসান মাহমুদ

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

Published

পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে একটা সময় ছিল, যখন বোলিং মানেই ছিল স্পিন। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকারিদের তালিকাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ২০২১ সালের শুরু পর্যন্ত দেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়া চার বোলার ছিলেন সাকিব আল হাসান, তাইজুল ইসলাম, মোহাম্মদ রফিক ও মেহেদী হাসান মিরাজ। চারজনই স্পিনার, তাঁদের মধ্যে তিনজন বাঁহাতি।

তালিকায় পঞ্চম স্থানে থাকা মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাই ছিলেন ব্যতিক্রম। কিন্তু ২০০৯ সালে শেষ টেস্ট খেলা মাশরাফীর উইকেট সংখ্যা ৭৮। বিপরীতে তাইজুলের ২৭৬, সাকিবের ২৪৬, মিরাজের ২২৪ ও রফিকের ১০০। অর্থাৎ টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথচলার প্রথম ২৬ বছরে কোনো পেসার ১০০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁতে পারেননি।

এখন সেই ছবিটাই বদলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের যে উত্থান ২০২১ সালের শেষ দিকে শুরু হয়েছিল, সেটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু পারফরম্যান্স নয়।

নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়, পাকিস্তানের বিপক্ষে সাফল্য, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ জয় এবং সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতে টেস্ট জয় দেখিয়েছে, বাংলাদেশের পেসাররা এখন শুধু সহায়ক শক্তি নন, ম্যাচ জেতানোর প্রধান অস্ত্রও হতে পারেন।

বদলটা শুরু হয়েছিল মানসিকতায়

বাংলাদেশের পেস বিপ্লবের গল্পে সাবেক টেস্ট অধিনায়ক মমিনুল হকের নাম তাই গুরুত্বপূর্ণ।

ঘরোয়া ক্রিকেটে চট্টগ্রাম বিভাগ ও ইস্ট জোনের অধিনায়ক থাকার সময় মমিনুল নিয়মিত তিনজন পেসার নিয়ে দল সাজাতেন। শুধু তাই নয়, উইকেটেও গতি ও বাউন্স চেয়েছিলেন। সেই পেসনির্ভর চিন্তাটাই পরে জাতীয় দলেও নিয়ে আসেন।

বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতিতে এটি ছিল বড় পরিবর্তন। এতদিন দলের পরিকল্পনা তৈরি হতো স্পিনকে কেন্দ্র করে। উইকেট তৈরি হতো স্পিনারদের কথা মাথায় রেখে, আর পেসারদের কাজ ছিল মূলত সহায়তা করা। মমিনুল সেই ধারণাটাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান।

জাতীয় দলের অধিনায়ক থাকাকালেই বাংলাদেশ মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো তাদের মাটিতে টেস্ট জয় পায়। সেই ম্যাচে বাংলাদেশের পেসাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে তামিম ইকবালও মমিনুলকে বাংলাদেশের ফাস্ট বোলিংয়ের পুনর্জাগরণে কৃতিত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

ডোনাল্ডের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিল পেসারদের মধ্যে দলগত মানসিকতা তৈরি করা।

ছবির উৎস, Getty Images

এরপর এলেন এলান ডোনাল্ড

মমিনুলের পেসনির্ভর চিন্তার সঙ্গে যোগ হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। কোর্টনি ওয়ালশ, চার্ল ল্যাঙ্গেভেল্ট ও ওটিস গিবসনের পর বাংলাদেশের ফাস্ট বোলিং কোচ হিসেবে আসেন দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি এলান ডোনাল্ড।

ডোনাল্ডের সময়টিই যেন এই পরিবর্তনকে আরও সংগঠিত করে।

তিনি শুধু অভিজ্ঞ তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কাজ করেননি, শরিফুল ইসলাম ও হাসান মাহমুদের মতো তরুণদেরও তৈরি করেছেন। একই সঙ্গে রেজাউর রহমান রাজা, মুশফিক হাসান এবং নাহিদ রানার মতো পরবর্তী প্রজন্মের পেসারদেরও নজরে রাখেন।

ডোনাল্ডের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিল পেসারদের মধ্যে দলগত মানসিকতা তৈরি করা। একজনের ওপর নির্ভর না করে একসঙ্গে কয়েকজন পেসারকে নিয়ে আক্রমণ করার ধারণা তৈরি হয়।

তাসকিন ও মোস্তাফিজুর হয়ে ওঠেন সেই আক্রমণের দুই অভিজ্ঞ মুখ। এরপর যোগ হয় নাহিদ রানা। টেস্টে মোস্তাফিজুরের জায়গায় শরিফুল ও হাসান মাহমুদের মতো পেসাররা সুযোগ পেতে থাকেন।

ডোনাল্ড ২০২৩ বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব ছাড়লেও সম্পর্কটা সেখানেই শেষ হয়নি। তরুণ পেসারদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এখনও রয়েছে। তাঁর তৈরি করা কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের পরের প্রজন্ম এগোচ্ছে।

নাহিদ রানা

ছবির উৎস, AFP

নাহিদ রানা বদলের প্রতীক

এই নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে বড় প্রতীক নাহিদ রানা।

বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্রুততম বোলার হিসেবে পরিচিত এই পেসার অন্যদের মতো অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের পথ ধরে জাতীয় দলে আসেননি। ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি মূলত টেনিস বলেই ক্রিকেট খেলেছেন। পরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজেকে তৈরি করে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন।

প্রথম শ্রেণির অভিষেকেই ৪ উইকেট নেওয়া রানা ২০২২-২৩ মৌসুমে ৪১টি উইকেট নেন, গড় ছিল ১৮.২৬। ২০২৩-২৪ মৌসুমে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিলেট টেস্টে অভিষেকের পরও তিনি খুব দ্রুত নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। রানভরা ম্যাচে তাঁর ঝুলিতে আসে পাঁচ উইকেট।

মাত্র ৩২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচেই তাঁর পাঁচটি পাঁচ উইকেটের ইনিংস রয়েছে। বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে এই সংখ্যায় তাঁর ওপরে আছেন শুধু মোস্তাফিজুর রহমান।

আর এই নাহিদ রানা চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতেই পারেননি এখানেই মূলত বাংলাদেশের ফাস্ট বোলিং ইউনিটের গভীরতা প্রকাশ পায়, অস্ট্রেলিয়া গিয়ে দায়িত্ব নিয়ে ম্যাচ জেতান হাসান মাহমুদ, অস্ট্রেলিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছেন শরিফুল।

শন টেইটের চোখেও আসল গল্পটা আরও তৃণমূলে

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পেস বিপ্লবকে শুধু বিদেশি কোচদের কৃতিত্ব দিলে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সাবেক অস্ট্রেলীয় পেসার ও বাংলাদেশের সাবেক ফাস্ট বোলিং কোচ শন টেইটও গুরুত্ব দিয়েছেন দেশের স্কাউটিং ও তৃণমূল পর্যায়ের কোচিং ব্যবস্থাকে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একজন ডোনাল্ড বা টেইট এসে একজন পেসারকে আরও ভালো করে তুলতে পারেন, কিন্তু সেই পেসারকে খুঁজে বের করার কাজটি শুরু হতে হয় আরও আগে। বাংলাদেশের বর্তমান পেস আক্রমণের সাফল্যের পেছনে তাই একদিকে জাতীয় দলের কোচিং, অন্যদিকে ঘরোয়া ক্রিকেট ও স্থানীয় কোচদের কাজও গুরুত্বপূর্ণ।

নাহিদ রানার ক্ষেত্রেও সেই ছবিটা পরিষ্কার। রাজশাহী ক্রিকেট একাডেমির কোচ আলমগীর কবির তাঁর রানআপ, শারীরিক সক্ষমতা ও বোলিংয়ের ভিত্তি তৈরিতে কাজ করেছেন। পরে ডোনাল্ড তাঁকে দ্রুত জাতীয় পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ দেখেন।

শন টেইট বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ফাস্ট বোলিং কোচ ছিলেন

ছবির উৎস, AP

তাসকিনের প্রত্যাবর্তন, মোস্তাফিজের অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের বর্তমান পেস আক্রমণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প তাসকিন আহমেদের।

একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পেসারদের একজন তাসকিন ২০১৮ সালের দিকে জাতীয় দলের হিসাবের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। কোভিডের সময় নিজেকে নতুন করে তৈরি করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। জিম, বালুর ওপর অনুশীলন এবং ফিটনেস নিয়ে কাজ করে ফিরে আসেন জাতীয় দলে।

তার পাশে ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। বাঁহাতি কাটার, বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় মোস্তাফিজ তখন বাংলাদেশের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক তারকা পেসার।

এই দুই অভিজ্ঞ পেসারের সঙ্গে নাহিদ রানার গতি যুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশের আক্রমণে নতুন মাত্রা আসে। তাসকিনের আগ্রাসন, মোস্তাফিজের বৈচিত্র্য এবং রানার গতি মিলে তৈরি হয় ভিন্ন ধরনের পেস আক্রমণ।

তাসকিনের বয়স এখন ৩১, মোস্তাফিজুরের ৩০। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে শরিফুল, হাসান মাহমুদ, তানজিম হাসান সাকিব, মুশফিক হাসান ও নাহিদ রানার মতো তরুণদের যোগ হওয়ায় বাংলাদেশের পেস ইউনিটের বড় শক্তি শুধু মান নয়, বয়সও। নাহিদ, সাকিব, মুশফিক ও শরিফুল ২৫ বা তার কম বয়সী।

অস্ট্রেলিয়ায় জয়ের বিশ্বাস আরও বেড়েছে

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০২৬ সালের টেস্ট সিরিজ বাংলাদেশের পেস আক্রমণের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা ছিল।

ডারউইনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে পেসাররা বড় ভূমিকা রাখেন। সেই জয়ের পর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে ছয়ে উঠে আসে। এর আগে টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল নয়।

যদিও ম্যাকেতে দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ ইনিংস ও ৫১ রানে হেরে যায় এবং সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ হয়, পুরো সফরটিকে শুধু ওই একটি ম্যাচ দিয়ে বিচার করতে চান না দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।

শান্তর মতে, ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নিয়মিত খেলতে পারলে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা এই ধরনের কন্ডিশনে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। তাঁর যুক্তি, অস্ট্রেলিয়ার মতো জায়গায় বারবার খেললেই বোঝা যাবে কীভাবে এই পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে হয়।

এখানেই শান্তর নেতৃত্বের আরেকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু একটি সিরিজের ফলাফল দেখছেন না, বরং বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটকে নিয়মিত বিদেশের কঠিন কন্ডিশনে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।

আতাহার আলী খান বলছেন, এবার ব্যাটারদের দায়িত্ব

বাংলাদেশের সাবেক ওপেনার ও ধারাভাষ্যকার আতাহার আলী খান মনে করেন, পেসাররা নিজেদের কাজটা করে যাচ্ছেন। এখন ব্যাটারদের ধারাবাহিক হতে হবে।

তাঁর যুক্তি, বাংলাদেশের পেসাররা অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে প্রথম ইনিংসে ১০টি উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানের মাটিতেও একইভাবে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং ভেঙে দিয়েছেন। কিন্তু ব্যাটিংয়ে সেই ধারাবাহিকতা এখনও দেখা যাচ্ছে না।

ডারউইনে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করেছিল। কয়েক দিন পর ম্যাকেতে দুই ইনিংসে তাদের সংগ্রহ ছিল মাত্র ৬৪ ও ৯৫।

আতাহারের মতে, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ যদি প্রতিটি ইনিংসে ৩৫০ থেকে ৪০০ রান করতে পারে, তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের বিপক্ষেও তাদের জয়ের বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে। তাঁর পরামর্শ, টেস্ট ব্যাটারদের শুরুতে অপ্রয়োজনীয় আক্রমণাত্মক শট কমিয়ে নতুন বল সামলাতে হবে, উইকেটে সময় কাটাতে হবে এবং সেট হওয়ার পর রান করার দিকে যেতে হবে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের টেস্ট দলের যে জায়গাটি এখনো সবচেয়ে বেশি উন্নতি চায়, সেটি পেস বোলিং নয়, ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা।