Home LATEST NEWS BANGLA ইনানীতে বিপন্ন মেঘলা চিতাসহ আরও যেসব প্রাণীর দেখা মিললো

ইনানীতে বিপন্ন মেঘলা চিতাসহ আরও যেসব প্রাণীর দেখা মিললো

6
0

Source : BBC NEWS

মেঘলা চিতা ছাড়াও আরও ২২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে ইনানীর বনে

ছবির উৎস, From published article of Bipul Krishna Das

কক্সবাজার শহর থেকে একটু দূরেই ইনানী জাতীয় উদ্যান। উপকূলীয় এলাকায় পাহাড় ঘেরা এই বনকে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখা হয়।

বিস্তীর্ণ এই বনাঞ্চলে সম্প্রতি এক গবেষণায় ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। যেখানে রয়েছে মেঘলা চিতা আর উল্লুকের মতো চরম সংকটাপন্ন প্রাণীও।

এই গবেষণায় ক্যামেরা ট্র্যাপ, লাইন ট্রানসেক্ট এবং পরোক্ষ চিহ্ন বা স্পটিং পদ্ধতির ব্যবহার করেছেন গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস।

তিনি বলছেন, কেবল স্তন্যপায়ী প্রাণীই নয়- বৃক্ষ এবং আশপাশের জনবসতি তথা ওই বনাঞ্চলের সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের অবস্থাই গবেষণার মাধ্যমে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি।

তার মতে, মানুষের নানা কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়তই বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যে বড়ো ধরনের প্রভাব ফেলছে।

ফলে বাংলাদেশের বনাঞ্চল ও বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান।

“আমাদের অনেক জায়গায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জনবল সংকট, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নাই। যেভাবে আসলে ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন সেটা অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

বাংলাদেশে মহাবিপন্ন প্রাণী হিসেবে বিবেচিত পশ্চিমের উল্লুক রয়েছে ইনানীতে

ছবির উৎস, From published article of Bipul Krishna Das

গবেষণায় বিরল প্রজাতি

বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার ইনানীতে অবস্থিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলকে, ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে সরকার।

মূলত, উপকূলীয় ও পাহাড়ি বনাঞ্চলের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা সাত হাজার ৮৫ হেক্টরের এই উদ্যানটি ওই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলেই মনে করা হয়।

সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সেখানকার জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র কেমন অবস্থায় রয়েছে, সেটি নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা ছিল না।

মূলত একটি বনাঞ্চলে কী ধরনের প্রাণী বা বৃক্ষ রয়েছে এবং তার বাস্তুতন্ত্র কীভাবে টিকে থাকছে, এই বিষয়গুলো গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ওপরই নির্ভর করে সেখানকার জীববৈচিত্র্য টিকে থাকার বিষয়টি।

সম্প্রতি এই উদ্যানের স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক বিপুল কৃষ্ণ দাস।

যেখানে ক্লাউডেড লেপার্ড বা মেঘলা চিতা, উল্লুক এবং এশিয়ান এলিফ্যান্ট এর মতো বিপন্ন প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান মিলেছে।

পুরো উদ্যানকে ১১টি জোনে ভাগ করে গবেষণা কাজ করেছেন এই গবেষক। যেখানে ক্যামেরা ট্র্যাপ, লাইন ট্রানসেক্ট এবং পরোক্ষ চিহ্ন বা স্পটিং পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার প্রয়োজনে বনের বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরা বসানো হয়

ছবির উৎস, From published article of Bipul Krishna Das

মি. দাস বিবিসি বাংলাকে জানান, বনের ৩২টি স্থানে ক্যামেরা, সরাসরি দেখা ও আওয়াজ শুনে শনাক্ত এবং বিষ্ঠা, পায়ের ছাপ, গাছের আঁচড় বিশ্লেষণ করে শনাক্তের কাজটি করা হয়েছে।

এছাড়া উদ্যানের বৃক্ষ নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি আশেপাশে বসবাসরত প্রায় ৩০০ মানুষের সাথে কথা বলে, সেখানকার সমগ্র বাস্তুতন্ত্র কী অবস্থায় রয়েছে, সেটিও দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি।

“আমাদের গবেষণার দুটি অংশ,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বিপুল কৃষ্ণ দাস।

“একটি হলো এখানে স্তন্যপায়ী প্রাণীর বৈচিত্র্য কেমন, আরেকটি হলো ওই এলাকার বসবাস উপযোগিতা কেমন। কোন এলাকায় কোন প্রাণীর আধিক্য, সেই এলাকায় কী ধরনের গাছ আছে, সেখানকার এনভায়রনমেন্ট কেমন – সব মিলিয়ে একটা সম্পর্ক খুঁজে বের করা।”

এই গবেষণায় ক্যামেরা, ট্র্যাপ ও মাঠ জরিপে আরও ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী নথিভুক্ত করা হয়েছে।

যেখানে এশিয়ান হাতি, মায়া হরিণ, বনশূকর পশ্চিমের উল্লুক গিবন, লাল বানর, শহরমুখী বানর, মুখপোড়া হনুমান এবং বড় বাঘডাশ যেমন রয়েছে।

তেমনি মেছো বিড়াল, লেপার্ড ক্যাট, কাঁকড়াভুক বেজি, গন্ধগোকুল, ছোট গন্ধগোকুল, সোনালি শিয়াল, মালয় শজারু, ইরাবতী কাঠবিড়ালি, লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালি, লার্জ-টুথড ফেরেট ব্যাজার এবং গেছো ছুঁচো এর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

মেঘলা চিতা বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী

ছবির উৎস, From published article of Bipul Krishna Das

মেঘলা চিতা

ইনানী জাতীয় উদ্যানে মেঘলা চিতা বা ক্লাউডেড লেপার্ড এর সন্ধান পাওয়া গেছে। অতীতে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এর নাম শোনা গেলেও কোনো গবেষণায় এই প্রথম এর নাম এলো।

মেঘলা চিতা বা ক্লাউডেড লেপার্ড হলো বিড়াল গোত্রের একটি অত্যন্ত বিরল বন্য প্রাণী।

প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট বা আইইউসিএন এর লাল তালিকা অনুযায়ী এই প্রাণীটি বিশ্বব্যাপী সংকটাপন্ন এবং বাংলাদেশে অত্যন্ত বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত।

বাংলাদেশে “মহাবিপন্ন” তালিকার এই প্রাণীটি ইনানিতে প্রথমবারের মতো ক্যামেরায় ধরা পড়ল।

গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস বলছেন, “ওখানে পাঁচটা আমার ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে ধরা পড়েছে, আর ১৩টা ইভেন্টস আছে। মানে পাগমার্ক বা তার স্টুল – এগুলো দিয়ে আমরা ১৩টি ইভেন্টে ক্লাউডেড লেপার্ড পেয়েছি।”

বন্যপ্রাণী জগতে মেঘলা চিতা গাছের ওপর চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। শক্তিশালী থাবা এবং নমনীয় গোড়ালির কারণে, এরা গাছের খাড়া কাণ্ড বেয়ে মাথা নিচের দিকে রেখে অনায়াসে নেমে আসতে পারে। দিনের বেশিরভাগ সময় এরা গাছেই কাটায়।

গবেষণায় পাগমার্ক ও স্টুল যাচাই পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়েছে

ছবির উৎস, Bipul Krishna Das

বৃক্ষ ও বন ব্যবস্থাপনা নিয়েও গবেষণা

কেবল স্তন্যপায়ী প্রাণী নয়, বৃক্ষ ও বন ব্যবস্থাপনাও এই গবেষণার অংশ। মূলত পৃথক গবেষণার মাধ্যমে উদ্যানের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রের বিষয়টি তুলে আনা হয়েছে।

এতে করে ওই বনাঞ্চলে যে-সব প্রাণী রয়েছে, তাদের টিকে থাকা বা বিলুপ্তির কারণ এবং কী করলে তাদেরকে রক্ষা করা বা বিস্তার ঘটানো যাবে, এই বিষয়গুলোই দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।

মি. দাস বলছেন, ইনানিতে ৬৬ প্রজাতির গাছ শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক বন যেখানে বেশি, সেখানে প্রাণীর বৈচিত্র্যও বেশি। আর বাগান বা ধ্বংস হওয়া এলাকায় প্রাণী কম।

“এই গবেষণার মধ্য দিয়ে আমরা ম্যানেজমেন্টের কাছে এটিই প্রেসক্রিপশন করতে চাই যে, এই ধরনের গাছগুলো লাগাতে হবে। এই গাছগুলো এই ধরনের প্রাণীগুলো পছন্দ করে। এভাবে এর হ্যাবিট্যাট ডেভেলপ করলে পরবর্তীতে এর সংখ্যা বাড়বে,” বিবিসি বাংলাকে মি. দাস।

তিনি বলছেন, কক্সবাজারের ইনানি থেকে উখিয়ার শিলখালি পর্যন্ত বিস্তৃত এই বনাঞ্চল শুধু কক্সবাজারের জন্যই নয়, বাংলাদেশের গোটা দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারত ও মিয়ানমারের বনের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী একটি করিডোর।

গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস বলছেন, “এই অঞ্চলজুড়ে বিপুল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং স্থানীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধি কক্সবাজার এলাকার জীববৈচিত্র্যে বড়ো ধরনের চাপ তৈরি করেছে।”

আরও চারটি বড়ো হুমকির কথা তুলে ধরেছেন তিনি। মি. দাস বলছেন, বনের মধ্য দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ফলে হাতি ও অন্যান্য প্রাণীর চলাচলের করিডোর ভেঙে যাচ্ছে। ইনানি এশিয়ান হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর।

এছাড়া পাহাড় কেটে ঘর, গাছ কেটে ফসল, অবৈধ শিকার ও পাচার এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অন্যায় দখলের বিষয়গুলোও রয়েছে।

বনের বৃক্ষ এবং বাস্তুতন্ত্র নিয়েও গবেষণা হয়েছে

ছবির উৎস, Bipul Krishna Das

বাংলাদেশে বণ্যপ্রাণীর সুরক্ষা

আইইউসিএন এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৯০টি বন্য প্রাণী বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে, যার মধ্যে ৫৬টি প্রজাতি মহাবিপন্ন, ১৮১টি বিপন্ন এবং ১৫৩টি প্রজাতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বলছেন, বাংলাদেশে কোন এলাকায় কোন প্রাণী কী অবস্থায় আছে বা তাদের প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে করণীয় কী, এমন নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

কিন্তু প্রাণী বা বাস্তুতন্ত্র ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কিনা এই প্রশ্ন এখনও রয়েছে।

মি. জামান বলছেন, “আমাদের অনেক জায়গায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যারা এগুলো নিয়ে কাজ করি তারা যখন বলতে যাচ্ছি তখন এই ধরনের উত্তর আসে যে আমাদের জনবল সংকট, পর্যাপ্ত অর্থসম্পদ নাই। যেভাবে আসলে ব্যবস্থাপনা করা উচিত সেটা অনেক জায়গায়ই হয় না।”

সুন্দরবনের মতো দেশে আরও যে-সব সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে, সেসব জায়গায় গুরুত্বের সঙ্গে নজর দেওয়ার কথা বলছেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলছেন, “সব সংরক্ষিত এলাকায় সমানভাবে যদি নজর দেওয়া যেত তাহলে ভালো হতো। বিপন্নের হুমকিতে থাকা অনেক প্রাণী কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত জায়গায় চলে আসতো।”

বণ্যপ্রাণী সুরক্ষায় আরও তৎপর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

ছবির উৎস, From published article of Bipul Krishna Das

বনাঞ্চল দখল হচ্ছে, গাছ ও পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে, বন্যপ্রাণী পাচারের মতো ঘটনা ঘটছে- বন বিভাগ চেষ্টা করছে বলে দাবি করছে, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা দলবদ্ধ ব্যক্তিদের অন্যায় অবস্থান রয়েছে।

বাংলাদেশে যেসব বিপন্নপ্রায় প্রজাতি রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলছেন, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য ধরে রাখতে প্রতিটি প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রাকৃতিকভাবে যে খাদ্যচক্র সেখানে সব প্রাণিই অংশ নেয়।

এছাড়া প্রকৃতির ভারসাম্য ধরে রাখতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার কোনো বিকল্প নেই।

“প্রতিদিন বিলিয়ন বিলয়ন ইনসেক্ট (পোকা) পাখিরা খাচ্ছে, কিন্তু এই পাখি যদি বিলুপ্ত হয় তাহলে বিলিয়ন বিলিয়ন পোকা আবার তৈরি হতো। অর্থাৎ ইনভাইরনমেন্টাল ব্যালান্স ধরে রাখতে প্রাণীদের সংরক্ষণও জরুরি,” বলেন তিনি।

৭ হাজার ৮৫ হেক্টরের ইনানি প্রমাণ করেছে, মানুষের চাপের মধ্যেও প্রকৃতি লড়াই করে টিকে থাকতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই লড়াইয়ে প্রকৃতির পাশে দাঁড়াবো?

গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস বলছেন, “যে প্রাণীগুলো বিলুপ্ত প্রায় সেগুলো টিকিয়ে রাখতে বা তাদের বংশবৃদ্ধি বাড়াতে, বন টিকিয়ে রাখতে হবে।”