Home LATEST NEWS BANGLA কেন জিন্নাহর স্বাস্থ্যকে ‘ভারতের গোপনতম রহস্য’ বলে মনে করা হতো?

কেন জিন্নাহর স্বাস্থ্যকে ‘ভারতের গোপনতম রহস্য’ বলে মনে করা হতো?

6
0

Source : BBC NEWS

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

ছবির উৎস, Getty Images

ফুসফুসের উপর পিং-পং বলের চেয়ে বড় দুটি কালো বৃত্ত, চারপাশে সাদা গোল গোল দাগ। এগুলো থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যে যক্ষ্মা ফুসফুসকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর ফুসফুসের এক্স-রে ছিল সেটি।

ল্যারি কলিন্স এবং ডমিনিক ল্যাপিয়ের তাদের ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ বইতে লিখেছেন যে, ১৯৪৬ সালের জুন মাসে তৎকালীন বোম্বের দুই চিকিৎসক – ড. ল রতনজি প্যাটেল এবং রেডিওলজিস্ট ড. জল ডেবু – এই এক্স-রে থেকেই বুঝতে পারেন যে, রোগটি এতটাই ছড়িয়ে গিয়েছিল যে মি. জিন্নাহ হয়তো আর মাত্র এক বা দুই বছর বাঁচবেন।

কিন্তু মি. জিন্নাহর নির্দেশে ওই দুই ডাক্তার বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন।

পাকিস্তান সৃষ্টির ৭৯ বছর পর, এই দুই পার্সি ডাক্তারকে “নীরব থেকে গোপনীয়তা বজায় রেখে অসাধারণ সেবা” করার স্বীকৃতি স্বরূপ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘নিশান-ই-কায়েদ-ই-আজম’-এর জন্য মনোনীত করা হয়েছে।

পাকিস্তানের পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান আহসান ইকবাল এক বিবৃতিতে লিখেছেন যে, “এটি এমন একটি গোপন বিষয় ছিল, যাকে অনেক ঐতিহাসিক বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিহাস সৃষ্টিকারী গোপন তথ্য বলে মনে করেন।”

“মি. জিন্নাহর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং ব্রিটিশ শাসকরা যদি তার অসুস্থতার কথা জানতে পারতেন, তাহলে হয়তো ভারতের বিভাজন বিলম্বিত হতো এবং পাকিস্তান সৃষ্টিও বিপন্ন হতে পারত।”

হেক্টর বলিথোর বই 'জিন্নাহ, ক্রিয়েটর অফ পাকিস্তান' -তে জিন্নাহ-র স্বাস্থ্য সম্পর্কে নানান তথ্য পাওয়া যায়

ছবির উৎস, OUP

জিন্নাহ-র শারীরিক অবস্থার অবনতি

মি. জিন্নাহর স্বাস্থ্য ক্রমশ ভেঙে পড়া ও তার শরীরের উপর প্রচণ্ড চাপ বিশ্বের দৃষ্টি থেকে আড়ালে ছিল।

আকবর আহমেদ তার ‘জিন্নাহ, পাকিস্তান অ্যান্ড ইসলামিক আইডেন্টিটি: ইন সার্চ অফ সালাদিন’ বইতে লিখেছেন যে, “জিন্নাহর সুন্দর পোশাক এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব এই সত্যটি আড়াল করে রেখেছিল যে তার শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো ছিল না।”

“১৯৩৮ সাল থেকে তিনি তার স্নায়ু এবং শারীরিক শক্তির উপর প্রচণ্ড চাপের কথা বলে আসছিলেন। এরপর তিনি প্রায়েই অসুস্থ হতে শুরু করেন, তবে তার এই অসুস্থতার কথা গোপন রাখা হয়েছিল।”

লেখক হেক্টর বলিথো ১৯৫২ সালের মে মাসে বোম্বেতে ড. প্যাটেলের সঙ্গে দেখা করেন।

হেক্টর বলিথো তার ‘জিন্নাহ ক্রিয়েটর অফ পাকিস্তান’ বইতে লিখেছেন যে, ড. প্যাটেল তাকে বলেছিলেন যে, ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে যখন তিনি মি. জিন্নাহকে পরীক্ষা করেন, তখন তার রক্তচাপ ছিল প্রায় ৯০।

“সেই সময় তিনি পূর্ণ উদ্যমে কাজ করছিলেন কিন্তু খুব শীর্ণ ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং বুকে ব্যথা ও কাশির কথাও বলছিলেন। তার ফুসফুসের নিচের অংশে নিউমোনিয়ার লক্ষণও ছিল যা তখনও পুরোপুরি সেরে যায়নি।

ডক্টর প্যাটেল বললেন, “আমি তাকে ক্যালশিয়াম ভ্যাক্সিন, পুষ্টিকর ওষুধ আর শর্ট-ওয়েভ ডায়াথার্মি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলাম। কাশিটা থেমে যায় এবং তিনি বিশ্রামের জন্য পাহাড়ে চলে গেলেন। তিনি ফিরে আসার পর দেখা গেল ততদিনে তার ওজন ১৮ পাউন্ড বেড়ে গেছে। খবরটা সংবাদপত্রে ছাপা হলো এবং তার সঙ্গে আমার নামও প্রকাশ্যে চলে এলো। আমি মি. জিন্নাহর কাছে গিয়ে বললাম, ‘কোন এক নির্বোধ এই খবরটা সংবাদপত্রকে দিয়েছে।’ তিনি জবাব দিলেন যে, তিনি পণ্ডশ্রম করছেন। যে লোক আমাকে এত সেবা করল, তাকে আমার ধন্যবাদ জানানো উচিত।”

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

ছবির উৎস, Getty Images

রোগটা বেড়েই চলল

আকবর আহমেদের মতে, ১৯৪৫ সালের প্রথম ছয় মাসের বেশিরভাগ সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন।

“ইসফাহানি কালেকশনে থাকা সেই বছরের নয়ই অক্টোবরের একটি চিঠি অনুসারে, তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, চাপ এতটাই বেশি যে আমি তা আর সহ্য করতে পারছি না।”

“তার চিকিৎসক, ড. জল প্যাটেল এবং ড. দিনশা মেহতা তাকে বিশ্রাম নিতে এবং কিছুটা কিছুটা থিতু হওয়ার কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একদিকে পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে, অন্যদিকে মি. জিন্নাহর হাতে সময়ও কমে আসছিল।

ল্যারি কলিন্স এবং ডমিনিক ল্যাপিয়ের লিখেছেন যে, দুর্বল ফুসফুসের কারণে মি. জিন্নাহ সারাজীবন ভুগেছেন।

“১৯৪৬ সালের মে মাসের শেষ দিনগুলিতে, মুসলিম লীগের এই নেতা শিমলায় আবারও ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হন। মি. জিন্নাহর খুব কাছের বোন মিজ. ফাতিমা তাকে ট্রেনে করে বোম্বে নিয়ে আসেন, কিন্তু যাত্রাকালে তার অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। মিজ. ফাতিমা সঙ্গে সঙ্গে ড. প্যাটেলকে ফোন করেন, যিনি শুনেই বুঝতে পারেন যে তার রোগীর অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর।”

১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে যখন মি. কলিন্স ও মি. ল্যাপিয়ের তাদের বইয়ের জন্য গবেষণা করছিলেন, তখন ড. প্যাটেল তাদের মি. জিন্নাহর গোপন মেডিকেল ফাইলটি দেখান, যেখানে কেবল ‘এম এ জিন্নাহ’ লেখা ছিল।

ততদিনে মি. জিন্নাহর রেডিওলজিস্ট ড. জল ডেবু মারা গিয়েছিলেন। তাই ল্যারি কলিন্স তার মেয়ে মিজ. হোমির সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি তার বাবার ক্লিনিকে কাজ করতেন। মিজ. হোমিও ড. প্যাটেলের মতোই একই তথ্য দেন।

প্যাটেল এবং ডেবু সিদ্ধান্ত নেন যে রোগটি একটি নিরাময়-অযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, অর্থাৎ সারিয়ে তোলার আর কোনো উপায় নেই।

১৯৭৫ সালে প্রকাশিত তাদের বই ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’-এ মি. ল্যারি এবং মি. ডমিনিক সর্বপ্রথম এই গোপন তথ্যটি বিশ্বের সামনে প্রকাশ করেন।

বই অনুসারে, ড. প্যাটেল মি. জিন্নাহকে সতর্ক করেছিলেন যে, বোম্বে রেলস্টেশনে তাকে স্বাগত জানাতে আসা জনতার মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পারেন।

বইতে উল্লেখ আছে, ” মি. প্যাটেল তাকে শহরতলির স্টেশন থেকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই প্যাটেল এমন এক সত্য আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীকালে ভারতের গোপনতম রহস্য হয়ে ওঠে।”

দুঃখের সঙ্গে মি. প্যাটেল তার বন্ধু ও রোগীকে এই মারাত্মক অসুস্থতার কথা জানান।

“তিনি মি. জিন্নাহকে বলেছিলেন যে তার শারীরিক শক্তির সীমা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। যদি তিনি কাজের চাপ না কমান, নিয়মিত বিরতি না নেন, বিশ্রাম না নেন, ধূমপান ত্যাগ না করেন এবং শরীরের ওপর থেকে চাপ না কমান, তবে তিনি এক বা দুই বছরের বেশি বাঁচবেন না।”

ড. প্যাটেলের মতে, এই দুঃসংবাদ শুনে মি. জিন্নাহর মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি।

“তার ফ্যাকাশে মুখে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। তিনি ড. প্যাটেলকে সরাসরি বলে দিলেন যে, স্যানেটোরিয়ামের বিছানায় শুয়ে পড়ার জন্য সারাজীবনের সংগ্রাম ত্যাগ করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।”

“কবর ছাড়া আর কিছুই তাকে তার কাজ থেকে বিচ্যুত করতে পারত না। মি. জিন্নাহর জীবনের উদ্দেশ্য ছিল ইতিহাসের এই সংকটময় মুহূর্তে ভারতের মুসলমানদের নেতৃত্ব দেওয়া।”

মি. জিন্নাহ জানতেন যে তার বিরোধীরা যদি জানতে পারে তিনি মৃত্যুপথযাত্রী, তবে তাদের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যেতে পারে। তারা হয়তো মি. জিন্নাহর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করবে এবং তারপর মুসলিম লীগে তার জায়গায় কোনো ‘নমনীয়’ নেতাকে বসানোর চেষ্টা করবে।

‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’-এ লেখা হয়েছে যে, ড. প্যাটেলের কাছ থেকে প্রতি দুই সপ্তাহে গোপনে ইনজেকশন নেওয়ার পর মি. জিন্নাহ কাজে ফিরে যান।

“তিনি তার চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার কোনো চেষ্টা করেননি। অসাধারণ সাহস ও উদ্দীপনা নিয়ে মি. জিন্নাহ তার আজীবনের লক্ষ্যে অবিচল থাকেন।”

আকবর আহমেদের মতে, পাকিস্তান গঠিত হওয়ার সময়ে মি. জিন্নাহর স্বাস্থ্য গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

“তিনি যক্ষ্মায় ভুগছিলেন। প্রতিদিন তার প্রিয় ব্যান্ড ‘ক্রেয়ন এ’ সিগারেট দিনে ৫০টি করে খাওয়া এবং কঠোর পরিশ্রমের প্রভাব তার স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছিল।”

১৯৪৭ সালের ৩১শে জুলাই পাকিস্তান তৈরি হওয়ার দু’সপ্তাহ আগে মি. জিন্নাহ বোম্বের আরামবাগে তার স্ত্রী রতনবাই (রতি)-র কবরস্থানে যান। তিনি জানতেন যে তিনি হয়তো আর বোম্বেতে কোনওদিন ফিরতে পারবেন না।

পাকিস্তান আলাদা দেশ তৈরি হওয়ার পর জিন্নাহ আবার খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে তার দৈনন্দিন জীবনে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও অন্যন্য রাজনীতিকরা

ছবির উৎস, Getty Images

‘আমি খুব ক্লান্ত’

হেক্টর বলিথো লিখেছেন, ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর দীর্ঘদিনের পার্সি বন্ধু জামশেদ নাসরওয়ানজি পাকিস্তানের রাজধানী করাচির গভর্নমেন্ট হাউসের বাগানে একটি বেঞ্চের কাছে অর্ধ-নিদ্রিত অবস্থায় জিন্নাহকে দেখতে পান।

মি. জিন্নাহ চোখ খুলে বললেন, “আমি খুব ক্লান্ত, জামশেদ, খুব ক্লান্ত।”

বলিথোর মতে, পাকিস্তান সৃষ্টির আগে তিনি সবসময় এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে বাইরে বসে এভাবে ঝিমিয়ে পড়ার কথা কল্পনা করাও তার পক্ষে অসম্ভব ছিল।

“কিন্তু এই সময়ে তিনি মাঝে মাঝে বাগানে বসে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ ভাবতেন এবং তারপর অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নিতেন। কখনও কখনও, বাগানে হাঁটার সময়, তিনি ঝুঁকে একটি ফুল তুলে তার কোটে সাজাতেন।”

বলিথোর মতে, ফেব্রুয়ারির এক সকালে, ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর প্রাক্তন সম্পাদক ইয়ান স্টিফেনস মি. জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।

তিনি পরে লিখেছিলেন যে, ‘সেই সময় কেউ বুঝতে পারেনি যে পাকিস্তানের স্থপতি মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। তার ফুসফুস যক্ষ্মায় মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল যে ব্যাপারে কেউ জানত না এবং কয়েক মাস পরে যা তার জীবন কেড়ে নেয়।’

সাক্ষাৎ শেষে মি. জিন্নাহ বলেছিলেন, “লোকেরা বলে যে আমি অসুস্থ ছিলাম। আমি অসুস্থ ছিলাম না। আমি শুধু ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমি আর তরুণ নই, আমার অনেক দায়িত্ব আছে… তাই যখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি, আমি বিশ্রাম নিই। আমি আমার ডাক্তারদের চলে যেতে বলি। আমি চাই না তারা অকারণে আমার চারপাশে ঘোরাঘুরি করুক।”

বোলিথোর মতে, সাড়ে তিন বছর আগে বোম্বের ডাক্তারদের দেওয়া উদ্বেগজনক তথ্য মি. জিন্নাহ নিজের মধ্যেই গোপন রেখেছিলেন।

১৯৪৮ সালের জুলাই মাস নাগাদ মি. জিন্নাহর দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ আরও বেড়ে গিয়েছিল। তাই মি. জিন্নাহকে বেলুচিস্তানের একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা ঘোরাতে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে বাতাসের ঘনত্ব কম। কিন্তু বেড়াতে গিয়েও মি. জিন্নাহর অবস্থার উন্নতি হয়নি।

মি. জিন্নাহর রক্ত পরীক্ষা এবং বুকের এক্স-রে বিস্তারিত পর্যালোচনার পর তার চিকিৎসক এলাহি বখশ নিশ্চিত হন যে, তার দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগটি আর সারবে না।

সম্ভবত সেই দিনগুলোতে মি. জিন্নাহর কিছু বন্ধু তার চিকিৎসা করার চেষ্টা করছিলেন।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ফাতিমা জিন্নাহ

ছবির উৎস, Getty Images

অজানা ফোন কল

তার ‘টিউবারকুলোসিস: দ্য গ্রেটেস্ট স্টোরি নেভার টোল্ড’-বইতে চিকিৎসক ও লেখক ড. ফ্র্যাঙ্ক রায়ান লিখেছেন, “ওয়াশিংটন ডিসি-তে অবস্থিত পাকিস্তানি দূতাবাস থেকে আমি কয়েকটি রহস্যময় ফোন কল পাই। তারা বলেন, আমাকে জরুরি ভিত্তিতে পাকিস্তানের করাচিতে যেতে হবে একজন ব্যক্তিকে পরীক্ষা করার জন্য, যার নাম ও শারীরিক অবস্থার কথা আমাকে জানানো হয়নি।”

“আমি চেষ্টা করেও সমস্যাটি কী তা জানতে পারিনি। কয়েকদিন পর ফোনে আমাকে জানানো হয় যে আমার পরিষেবার আর প্রয়োজন নেই, কারণ রোগীটি মারা গেছেন।”

মি. ফ্র্যাঙ্ক লিখেছিলেন, “আমি সান ফ্রান্সিসকোতে চলে যাওয়ার দুই বা তিন বছর পর একজন ডাক্তার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।”

“তিনি বললেন যে এই ফোন কলগুলো তারই করা এবং রোগীটি স্বয়ং মি. জিন্নাহ ছাড়া আর কেউ নন।”

“তিনি ছিলেন মি. জিন্নাহর ব্যক্তিগত চিকিৎসক। এটা জানার পরেই গোপনীয়তার কারণ স্পষ্ট হয়ে যায়। এই ডাক্তার কয়েক বছর আগে পাস্তুর ইনস্টিটিউটে আমার বক্তৃতা শুনেছিলেন এবং আমার কিছু প্রকাশনাও পড়েছিলেন”, বলে বইতে উল্লেখ রয়েছে।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের যক্ষ্মায় ভুগছিলেন, যা ১৯৪৬ সালের জুন মাসে প্রথম শনাক্ত করেন তাঁর চিকিৎসক ডক্টর প্যাটেল।

মি. জিন্নাহর অসুস্থতার প্রকৃত স্বরূপ গোপন রাখার গুরুত্ব পরবর্তীকালে ল্যারি কলিন্স এবং ডমিনিক ল্যাপিয়ের প্রকাশ করেন, যার উল্লেখ ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ বইটিতে রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সহ-সভাপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু; লর্ড ইসমে, লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং আলি জিন্নাহ ( বাঁ দিক থেকে)

ছবির উৎস, Getty Images

অভাবনীয় গোপনীয়তা

ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট বইতে লেখা হয়েছে যে, ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে যদি লর্ড মাউন্টব্যাটেন, জওহরলাল নেহেরু বা মোহনদাস গান্ধী এই অভাবনীয় গোপন তথ্যটি জানতেন, তাহলে হয়তো ভারত ভাগ এড়ানো যেত।

মি. জিন্নাহতার মুসলিম দেশবাসীর জন্য একটি পৃথক মাতৃভূমি নিশ্চিত করতে এতটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে তিনি শেষ ভাইসরয়কে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করেছিলেন বলে বইতে উল্লেখ আছে।

মি. ডমিনিক পরে বলেছিলেন যে, যখন তিনি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে এই তথ্যগুলো প্রকাশ করেন, তখন তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি বলেছিলেন যে, যদি তিনি তখন মি. জিন্নাহর অসুস্থতার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতেন, তাহলে আলাদা করে পাকিস্তানের অস্তিত্ব থাকত না।

“যদি আমি তখন এই সবকিছু জানতাম, তাহলে ইতিহাসের গতিপথ ভিন্ন হতো। আমি স্বাধীনতা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বেশ কয়েক মাস বিলম্বিত করে দিতাম। পাকিস্তানও তৈরি হত না।”

“তিনি প্রথমে বললেন, আমি এটা বিশ্বাস করি না। তারপর গভীর বিস্ময়ে হাঁপিয়ে উঠে বললেন, ‘হে ঈশ্বর!’ তখন তার সাধারণত শান্ত নীল চোখ দুটি তীব্র আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে।”

বইটি অনুসারে, এই গোপনীয়তা এতটাই সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল যে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাও এ বিষয়ে কিছুই জানতে পারেননি।

স্বাধীনতার ঠিক এক বছর পর, ১৯৪৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর মাসে মি. জিন্নাহ ফুসফুসের যক্ষ্মায় মারা যান।

পাকিস্তানের পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান আহসান ইকবাল একটি মন্তব্যে লিখেছেন যে, ড. জল রতনজি প্যাটেল এবং ড. জল ডেবু-এর পেশাগত আনুগত্য তাদের অজান্তেই পাকিস্তান তৈরিতে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।

ভারত সরকার ১৯৬২ সালে ড. জল রতনজি প্যাটেলকে তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার পদ্মভূষণ প্রদান করেছিল। পাকিস্তান এই বছরের ১৪ই আগস্ট ড. জল ডেবু-র সঙ্গে তাকেও ‘নিশান কায়েদে আজম’ পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করেছে।

আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে ২৩শে মার্চ একটি অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারটি প্রদান করা হবে।