Home LATEST NEWS BANGLA কেন নতুন পাকিস্তান-চীন সীমান্ত চুক্তি ভারতকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে

কেন নতুন পাকিস্তান-চীন সীমান্ত চুক্তি ভারতকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে

7
0

Source : BBC NEWS

পাকিস্তান সীমান্তঘেঁষা খুনজেরাব পাসের কাছে তুষারের মধ্যে সামরিক মহড়া চালাচ্ছেন সৈন্যরা।

ছবির উৎস, Future Publishing via Getty Images

বহু দশক ধরে ভারত হিমালয়ের একটি বিতর্কিত অঞ্চলে পাকিস্তান-চীন সীমান্তকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে, যেটিকে দিল্লি নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। কিন্তু গত সপ্তাহে পাকিস্তান ও চীন ওই পার্বত্য অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত অংশে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সীমান্ত নির্ধারণ করেছে, যা নিয়ে দিল্লির তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

দুই দেশ পাকিস্তান-চীন সীমান্ত যৌথ কমিশন গঠন সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করেছে।

পাকিস্তান একে একটি “গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক” হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও সংযোগের ক্ষেত্রে ভারতের আঞ্চলিক দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করবে।

দিল্লি এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ভারতের দাবি, যে ভূখণ্ডে এই সীমান্ত অবস্থিত, সেটি ভারতের অংশ এবং সে কারণে তারা কোনো পাকিস্তান-চীন সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয় না।

বিশেষভাবে সংবেদনশীল একটা সময়ে এই ঘোষণাটি এলো।

হিমালয় সীমান্তের বড় অংশজুড়ে উভয় বাহিনীকে পৃথক করা বিতর্কিত রেখা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) ঘিরে কয়েক বছরের সামরিক উত্তেজনার পর ভারত ও চীন তাদের সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

এমন একটা সময়ে বেইজিং ও ইসলামাবাদ সীমান্তের একটি পার্শ্ববর্তী অংশে নিজেদের সহযোগিতা আরও গভীর করছে, যে এলাকার ওপর ভারতেরও দাবি রয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। আমরা তথাকথিত যৌথ কমিশন প্রত্যাখ্যান করছি, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।”

শাকসগাম নদী ও কারাকোরাম পর্বতমালা

ছবির উৎস, Corbis via Getty Images

এই কমিশন পাকিস্তান-চীন সীমান্তসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে শাকসগাম উপত্যকা। প্রায় ৫,১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চলটি পাকিস্তান ১৯৬৩ সালে চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল, কিন্তু ভারত এটিকে লাদাখে অবস্থিত নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।

ভারতের দাবি, অঞ্চলটি জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক দেশীয় রাজ্যের অংশ ছিল এবং পাকিস্তান অবৈধভাবে এটি দখল করার পর চীনের কাছে হস্তান্তর করে।

ভারত সরকার কখনও এই চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং এটিকে অবৈধ ও অকার্যকর বলে মনে করে।

এই ইতিহাসই বুধবারের ঘোষণাটিকে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “ভারতের ভূখণ্ড, যা অবৈধ ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের দখলে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার পাকিস্তানের নেই।”

পাকিস্তান বলছে, জম্মু ও কাশ্মীর এখনও একটি বিতর্কিত অঞ্চল, এবং তাই ১৯৬৩ সালের চীন-সংক্রান্ত সীমান্ত চুক্তি নিয়ে ভারত প্রশ্ন তোলার অবস্থানে নেই। পাকিস্তান চুক্তিটিকে বৈধ বলে মনে করে।

দিল্লির শিব নাডার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জেকব বলেন, ”সর্বশেষ এই ঘটনা দুই পক্ষের বহু পুরনো বৈরিতার আরেকটা প্রকাশ বলা যেতে পারে, একেবারে নতুন কিছু নয়”।

তিনি বিবিসিকে বলেন, “১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতেই একটি যৌথ সীমান্ত কমিশনের কথা বলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এটি এই সময়ে কার্যকর করা হলো।”

তিনি বিবিসিকে বলেন, “১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতেই একটি যৌথ সীমান্ত কমিশনের কথা বলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এটি এই সময়ে কার্যকর করা হলো।”

তার মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের বৃহত্তর সীমান্ত নির্ধারণ প্রচেষ্টা এবং পাকিস্তানের অন্যান্য সীমান্তে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার সময়ে এই সীমান্তে যোগাযোগ ও চলাচলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আগ্রহ।

২০২০ সালের ১৯ জুন ভারতের গাগানগিরে চীন সীমান্তঘেঁষা সড়ক দিয়ে লেহর দিকে অগ্রসর হচ্ছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বহর।

ছবির উৎস, Getty Images

জাবিন টি জেকব বলেন, এই উন্নয়ন নিয়ে ভারতের “উদ্বিগ্ন” হওয়া উচিত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার মতে, এই পদক্ষেপটি ১৯৬৩ সালের চুক্তির একটি ধারাকেও উপেক্ষা করছে বলে মনে হয়।

তিনি বলেন, চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাশ্মীর বিরোধ নিষ্পত্তির পর যে দেশ শেষ পর্যন্ত ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পাবে, তার সঙ্গে চুক্তিটি পুনরায় আলোচনা করার কথা ছিল।

জেকবের মতে, ভারতের জন্য সমস্যাটি আন্তর্জাতিক তথ্য পরিবেশনের কারণেও জটিল হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে চীনের তুলনামূলক প্রাধান্য, যেমন সিজিটিএন, সিআরআই এবং সামাজিক মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি, তাদেরকে বৈশ্বিক পরিসরে নিজেদের বয়ান ও মানচিত্র তুলে ধরার সুযোগ দেয়। অন্যদিকে ভারত প্রায়শই এমন প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা বিশ্বের অন্যান্য রাজধানী উপেক্ষা করতে পারে।”

২০২০ সালের ১৭ জুন, চীন সীমান্তের কাছে ভারতের লাদাখ অঞ্চলের চাং লা উচ্চ পার্বত্য গিরিপথের সড়কে চলাচল করছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যানবাহন। ওই দিন পরিস্থিতি “শীতল” করতে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক করেছিল ভারত ও চীন। এর আগে সীমান্তে সহিংস সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

তবে সীমান্তে বাস্তবে যেভাবে কার্যক্রম চলছে, তার তুলনায় এই উদ্বেগের অনেকটা ভিন্নতা রয়েছে।

পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে ইতোমধ্যেই এই অঞ্চলে বিস্তৃত অবকাঠামো ও যোগাযোগ সংক্রান্ত সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) এবং কারাকোরাম মহাসড়ক।

যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমি ও হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো হুসেইন হাক্কানি বলেন, নতুন কমিশনটি একই সঙ্গে বাস্তবধর্মী ও রাজনৈতিক।

হাক্কানি বিবিসিকে বলেন, “এটি উভয়ের সমন্বয়। সীমান্ত ও সীমানা সহযোগিতা জোরদার করা, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট কৌশলগত অবকাঠামো রক্ষার জন্য এটি একটি প্রক্রিয়া।”

তার মতে, এটি ভারতের প্রতি একটি বার্তাও দেয় যে, বেইজিং এখনও কাশ্মীর প্রশ্নকে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখে।

মি. হাক্কানি বলেন, “চীন কখনও কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের অবস্থান মেনে নেয়নি এবং গিলগিট-বালতিস্তানকে তারা পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, ভারতের নয়।”

তিনি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের সেই অঞ্চলটির কথা উল্লেখ করেন, যা চীনের সঙ্গে সীমান্ত ভাগাভাগি করে এবং যেটিকে ভারত নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।

মি. হাক্কানি বলেন, ভারত-শাসিত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদের অবস্থানও পরিবর্তিত হয়েছে।

তিনি বলেন, “পাকিস্তান এখনও মনে করে জম্মু ও কাশ্মীরের চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ বাকি। কিন্তু ভারত যখন তাদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর অংশে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মতো অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন করেছে, তখন ১৯৬৩ সাল থেকে চীনের সঙ্গে যা অঘোষিত অবস্থায় রয়েছে, সেটিকে এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পাকিস্তান কোনো সমস্যা দেখছে না।”

২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর করাচির পশ্চিমে গওয়াদার বন্দরে একটি বাণিজ্য প্রকল্প উদ্বোধনের সময় কনটেইনারবাহী একটি জাহাজ দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Anadolu Agency/Getty Images

বেইজিংয়ের জন্যও এই ব্যবস্থা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে থাকা সম্পর্ক ব্যবহার করে ভারতের প্রতি নিজেদের অবস্থান ও বার্তা দেওয়ার বৃহত্তর কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মি. হাক্কানি বলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করা বেইজিংয়ের জন্য কৌশলগত এবং ভূরাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “কৌশলগতভাবে এটি পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও গভীর করে তোলে। সেই সাথে ভূকৌশলগত দিক থেকে এটি ভারতকে চীন ও পাকিস্তানের দ্বিমুখী হুমকির ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা পাকিস্তানকে খুশি করে। বিষয়টি চীনের জন্য উপকারী।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘোষণার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ।

মি. হাক্কানি বলেন, “চীন সবসময়ই তাদের সিদ্ধান্ত কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর আগেই পরিকল্পনা করে। তাই যৌথ সীমান্ত কমিশন কার্যকর করার সিদ্ধান্তও অনেক আগেই নেওয়া হয়ে থাকবে।”

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলন সফরের পর এই তথ্য প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে পাকিস্তানকে কৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়ে আশ্বস্ত করা যায় এবং ভারতকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায় যে বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আনে না।”

তবে জেকব সতর্ক করে বলেন, এই বিষয়ের প্রতিটি দিককে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে এলএসি-র জন্য কোনো তাৎক্ষণিক বা দৃশ্যমান প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই।”

এতে বোঝা যায়, গত সপ্তাহের ঘোষণার গুরুত্ব হয়তো বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের মধ্যে নয়, বরং ধীরে ধীরে এমন ব্যবস্থাগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মধ্যে নিহিত, যেগুলো ভারত ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতের অবস্থান “স্পষ্ট এবং ধারাবাহিক”।

দিল্লির মতে, পাকিস্তানের অবৈধভাবে দখল করে রাখা ভারতীয় ভূখণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার যে কোনো প্রচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য এবং তা ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না।

তবে হাক্কানি মনে করেন, বিরোধটি সীমান্তের আইনি প্রশ্নের চেয়েও বড়।

তিনি বলেন, “সীমান্ত ও সীমানা নিয়ে ভারত ও চীনের মূল মতভেদ ভূকৌশলগত, মানচিত্রগত নয়।”

“তাই সীমান্ত নিয়ে আলোচনা আর বাস্তবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তা কতটা কি অর্জন করতে পারে, তারও কিছু সীমা সীমা রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “পাকিস্তান এখনও ভারতের বিরুদ্ধে চীনের দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরোধক” এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পৃক্ততা দিল্লির প্রতি সেই বার্তাই প্রকাশ করতে থাকবে।