Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
টাইপ ৫ ডায়াবেটিস এমন একটি সমস্যা যা দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভোগার কারণে তৈরি হয় বলে ধারণা করা হয়; যদিও এটিকে আলাদা একটি রোগের ধরন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও।
এ বিষয়ে এখনো যথেষ্ট প্রমাণ নেই বলে জানাচ্ছে সংস্থাটি।
তবে ২৫১টি জাতীয় ডায়াবেটিস সংগঠনকে প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডএফ) গত বছর এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।
কিছু বিজ্ঞানীর ধারণা, বিশ্বে প্রায় আড়াই কোটি রোগী টাইপ ৫ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে। সঙ্গে তারা এই সতর্কবার্তাও দিয়েছেন যে, এটিকে ডায়াবেটিসের অন্যান্য ধরনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলায় রোগীদের ক্ষতি হচ্ছে।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনে গ্লোবাল ডায়াবেটিস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মেরেডিথ হকিন্স মনে করেন, ডায়াবেটিসের এই ধরনটি শনাক্ত করতে না পারা “খুবই বিস্তৃত সমস্যা” এবং এর ফলে প্রয়োজন ছাড়াই ইনসুলিন ব্যবহারের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে।
“আমরা যেসব তরুণদের দেখেছি, তাদের অনেকেই সকালে আর জেগে উঠেনি,” বলেন তিনি।
ডায়াবেটিস তখনই হয়, যখন শরীর ইনসুলিনের মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে তা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে ৮৩ কোটিরও বেশি মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত।
ছবির উৎস, Getty Images
‘একটানা ক্লান্তি’
টাইপ ১ ডায়াবেটিস হলো একটি অটোইমিউন অবস্থা, যেখানে শরীর ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।
প্রসঙ্গত, অটোইমিউনের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলে সুস্থ অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে উল্টো আক্রমণ করে তা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আর টাইপ ২ ডায়াবেটিস ইনসুলিন প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, টাইপ ৫ দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যা ইনসুলিন উৎপাদনকারী অগ্ন্যাশয়ের বিকাশকে প্রভাবিত করে।
এই রোগীদের শরীরে কিছু ইনসুলিন তৈরি হলেও তা যথেষ্ট নয় এবং তারা ইনসুলিনের প্রতি অস্বাভাবিকভাবে সংবেদনশীল হতে পারেন।
এ কারণেই প্রচলিত চিকিৎসা সবসময় কার্যকর হয় না, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা ক্ষতিকর হতে পারে।
কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে, এমনকি সাধারণ মাত্রার ইনসুলিনও হাইপোগ্লাইসেমিয়া সৃষ্টি করতে পারে যা প্রাণঘাতী হতে পারে। যখন রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যায়, সেই অবস্থাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে।
অন্যান্য ধরনের মতোই, টাইপ ৫ থেকেও অন্ধত্ব, কিডনি বিকলতা, স্নায়ু ক্ষতি এবং ধীরে সারে এমন ক্ষত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন তৈরি করে।
কারণ এটি প্রায়ই গুরুতরভাবে কম ওজনের তরুণদের মধ্যে দেখা যায় এবং তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা খুব বেশি থাকে, তাই সহজেই এটি টাইপ ১ হিসেবে ভুল ধরা হয়।
এটির উপসর্গও খুব মিল থাকতে পারে।
নিজের অভিজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন উগান্ডায় বসবাসকারী নোয়েলা মুকুম্বি।
৩০ বছর বয়সী এই নারী কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক এবং পেশায় একজন হেয়ারড্রেসার। ২০২৩ সালে তার টাইপ ১ ডায়াবেটিস ছিল বলে শনাক্ত করা হয়। কিন্তু কিছু একটা ঠিক নেই বলে মনে হচ্ছিল তার।
নোয়েলা বলেন, শরীরের গড়নের দিক থেকে তিনি সবসময়ই পাতলা ছিলেন। তার দ্বিতীয় সন্তান জন্মের কিছুদিন পর থেকেই অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন।
“আমার মুখ সবসময় শুকনো থাকত। আমি খুব বেশি পানি পান করতাম, এমনকি রাতে দুই-তিনবার ঘুম ভেঙে যেত,” বলেন তিনি।
তিনি দ্রুত ওজন হারান, যা ৫৮ কেজি থেকে ৪৯ কেজিতে নেমে যায়। একইসঙ্গে তিনি সারাক্ষণ ক্লান্ত অনুভব করতেন, যা টাইপ ১-এর সাধারণ দুটি উপসর্গ।
ছবির উৎস, BBC World Service
প্রথম যখন নোয়েলাকে ইনসুলিন দেওয়া হয়েছিল, তখন ডাক্তাররা ভেবেছিলেন তারা তার জীবন বাঁচাচ্ছেন। তবে ওই চিকিৎসা তার কাছে মারা যাওয়ার মতো অনুভূতি তৈরি করেছিল বলে জানান তিনি।
প্রতিদিন নিয়মিত ইনসুলিন নেওয়া শুরু করার পর তিনি বলেন, তার মাথা ঘুরত এবং ভারসাম্য হারাতেন। একদিন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
“আমি বাচ্চাদের কাপড় গোছাচ্ছিলাম, তখনই আমার স্বামী আমাকে মাটিতে পড়ে চিৎকার করতে দেখেন,” তিনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে বলেন।
তিন বছর পর বিশেষজ্ঞরা তাকে জানান, সম্ভবত তার টাইপ ৫ ডায়াবেটিস রয়েছে।
এরপর ডাক্তাররা নোয়েলার ইনসুলিন কমিয়ে দেন এবং তাকে মেটফরমিন দেওয়া শুরু করেন যা সাধারণত টাইপ ২-এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, তার স্বাস্থ্যের নাটকীয় উন্নতি হয়েছে; দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার হয়েছে এবং তিনি আবার ওজন বাড়িয়েছেন।
ছবির উৎস, Sophia Sharer
অপুষ্টির কারণে ডায়াবেটিস?
টাইপ ৫ বিশেষ করে এশিয়া ও সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বেশি দেখা যায়, যেখানে শৈশবের অপুষ্টিতে ভোগার হার এখনো ব্যাপক।
তবে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য দেশেও কম ওজনের মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস বাড়ছে।
২০২৩ সালে ‘ডায়াবেটিস কেয়ার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায়, যুক্তরাষ্ট্রের ২৬ লাখেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, স্থূল নয় এমন মানুষের মধ্যে তথাকথিত ‘লিন ডায়াবেটিস’, যাকে বলা যেতে পারে অপুষ্টির কারণে ডায়াবেটিস, এর হার বাড়ছে।
লন্ডনের সোফিয়া শেয়ারার মনে করেন, তিনি এই শ্রেণিতে পড়েন।
২৩ বছর বয়সে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষায় তার রক্তে শর্করার মাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে ডায়াবেটিসের পর্যায়ে পাওয়া যায়।
এখন ২৬ বছর বয়সী এই সাংবাদিক বলেন, শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় তিনি গুরুতরভাবে কম ওজনের ছিলেন এবং একসময় হাসপাতালে চিকিৎসাও নিয়েছেন।
১৯ বছর বয়সে যখন তার ওজন বাড়তে শুরু করে, তখন থেকেই তিনি অসুস্থ বোধ করতে থাকেন।
তিনি বলেন, “আমি খুব দ্রুত খুব ক্ষুধার্ত হয়ে যেতাম, শরীর কাঁপত, মনে হতো অজ্ঞান হয়ে যাব।”
পরীক্ষায় টাইপ ১ এবং বিরল জেনেটিক ধরনের ডায়াবেটিস বাদ দেওয়ার পর, বিকল্প না থাকায় চিকিৎসকেরা তাকে টাইপ ২ ক্লিনিকে পাঠান।
টাইপ ৫ শনাক্তকরণের সঙ্গে যুক্ত একজন বিজ্ঞানী তাকে বলেন, তার মধ্যে এ রোগের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।
তবে যুক্তরাজ্যে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্ণয় পদ্ধতি না থাকায় তার রোগ নিশ্চিত হয়নি।

নতুন স্বীকৃতি
টাইপ ৫ ডায়াবেটিস নির্ণষে নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষার অভাবের কারণেই এই অবস্থাটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।
১৯৮৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে ‘অপুষ্টিজনিত ডায়াবেটিস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু ১২ বছর পর তারা এটি বাদ দেয়, কারণ চিকিৎসকেরা একমত হতে পারেননি এটি টাইপ ২ থেকে আলাদা কি না।
এরপর এটি চিকিৎসা শাস্ত্রের মূলধারার পাঠ্যবই ও ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকা থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
তারপর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন বা আইডিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই অবস্থাকে স্বীকৃতি দেয়।
গত বছর ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত ৫০ জনের বেশি বিজ্ঞানীর একটি গবেষণাও এ স্বীকৃতিতে ভূমিকা রাখে।
ডব্লিউএইচও জানায়, ১৯৯৯ এবং ২০০৬ সালের শ্রেণিবিন্যাস সংশোধনের সময় “এটিকে পৃথক একটি শ্রেণি হিসেবে রাখার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি”।
তবে তারা স্বীকার করে, তাদের বর্তমান শ্রেণিবিন্যাস “সব ডায়াবেটিস রোগীর বৈশিষ্ট্য ধারণ করে না” এবং যথেষ্ট প্রমাণ পেলে ভবিষ্যতে টাইপ ৫ পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
সমর্থকদের মতে, আইডিএফ-এর স্বীকৃতিই ইতোমধ্যে রোগীদের আরও উপযুক্ত চিকিৎসা পেতে সহায়তা করছে।
ড. হকিন্স বলেন, “প্রথমবারের মতো, খুব শিগগিরই ‘ডিগ্রুট’স এন্ডোক্রিনোলজি’ বইয়ে এ নিয়ে একটি অধ্যায় থাকবে”- যা বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকেরা ব্যবহার করেন।
ছবির উৎস, Noella Mukumbi
গবেষকদের সতর্কতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং কিছু বিজ্ঞানী প্রশ্ন তুলেছেন- টাইপ ৫ আদৌ আলাদা কোনো রোগ কি না।
ভারতের একজন বিশেষজ্ঞের মতে, যাকে টাইপ ৫ বলা হচ্ছে, তা হয়তো কম ওজনের মানুষের মধ্যে টাইপ ২ বা টাইপ ১-এর একটি ভিন্ন রূপ হতে পারে।
চেন্নাইয়ের ড. মোহান’স ডায়াবেটিস স্পেশালিটিজ সেন্টারের চেয়ারম্যান ড. ভি মোহান বলেন, “এটি যদি টাইপ ৫ হয়, তাহলে বলুন এটি কীভাবে নির্ণয় করবেন? একটি মার্কার দেখান।”
নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা পদ্ধতির অভাবে এখনো চিকিৎসকেরা কিছু লক্ষণ দেখে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। যেমন শৈশবের অপুষ্টি, কম ওজন এবং ইনসুলিনের প্রতি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার মতো বিষয়।
আইডিএফ ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক নির্ণয় মানদণ্ড ও চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে।
প্রাথমিক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, কিছু রোগী উন্নত পুষ্টি ও সাবধানে ব্যবস্থাপিত ওষুধে সাড়া দিতে পারেন।
তবে বিদেশি সহায়তা ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বাজেট কমে যাওয়ায় অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় দাতাদের ক্ষেত্রেও।
সঙ্গে কিছু গবেষক আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটে আক্রান্ত অঞ্চলে এ রোগ আরও বাড়তে পারে।
প্রফেসর হকিন্স বলেন, “আমরা সম্ভবত একটি গুরুতর বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। এটি আগামী প্রজন্মের জন্য খুব খারাপ সংবাদ বয়ে আনবে।”




