Home LATEST NEWS BANGLA ডারউইনে বাংলাদেশের জয় নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সেলিব্রিটিরা যা বলছেন

ডারউইনে বাংলাদেশের জয় নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সেলিব্রিটিরা যা বলছেন

5
0

Source : BBC NEWS

'অবিশ্বাস্য বাজে', 'ভয়ানক', 'আপসেট'- আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেভাবে উঠে এলো বাংলাদেশের ডারউইন জয়

ছবির উৎস, Screen Grab

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

‘গবস্ম্যাকিং শ্যাম্বলস’ – দ্য অস্ট্রেলিয়ান ঠিক এভাবেই বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়ার হারকে উপস্থাপন করেছে।

গবস্ম্যাকিং শব্দটি মূলত একটি ব্রিটিশ স্ল্যাং, খুবই অনানুষ্ঠানিক ও কথ্য ভাষায় ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হতবাক করে দেওয়ার মতো বা অবিশ্বাস্য।

আর শ্যাম্বলস বলতে বোঝায় চরম বেহালবা বিশৃঙ্খল অবস্থা। অর্থাৎ ‘গবস্ম্যাকিং শ্যাম্বলস’ বলতে ‘চরম হযবরল অবস্থা’ বোঝানো হয়েছে।

দ্য অস্ট্রেলিয়ানের প্রতিবেদনের শুরুতেই বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার এ হারকে তার প্রাপ্য মূল্যায়ন করতে হবে – কারণ এটি একই সঙ্গে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন এবং অস্ট্রেলিয়ার জন্য সবচেয়ে লজ্জাজনক পরাজয়গুলোর একটি।

রবার্ট ক্র্যাডকের লেখা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কাছে নয় উইকেটের হারে টেস্ট ক্রিকেটের সম্ভবত সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি ঘটেছে।

অস্ট্রেলিয়ার ১২ মাসে ২০ টেস্ট খেলার দীর্ঘ যাত্রার শুরুটাই হয়েছে একেবারে বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে।

ঘরের মাঠে ক্যামেরন গ্রিনের বহু প্রতীক্ষিত প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি শেষ পর্যন্ত শুধু ম্যাচের ফলাফল কিছুটা বিলম্বিত করেছে। কারণ সাড়ে তিন দিনের লড়াইয়ের পর যে ম্যাচটি শুরুতে ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য, সেটিই ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়ার অনিবার্য পরাজয়ের দিকে এগিয়ে যায়।

প্রতিবেদনে অবশ্য মারারা স্টেডিয়ামের পিচকে প্রশংসা করে বলা হয়েছে, পুরো ম্যাচেই উইকেটটি ছিল চমৎকার।

দ্য অস্ট্রেলিয়ান বলছে, টপ এন্ডের দুই টেস্টের প্রথম ম্যাচটি শুরুতে মনে হচ্ছিল দুই দলের শক্তির বিশাল ব্যবধানের এক অসম লড়াই।

একদিকে অস্ট্রেলিয়া, যারা সর্বশেষ দুটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলেছে এবং নিজেদের শেষ ২৩ টেস্টের ১৮টিতেই জয় পেয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ বিদেশের মাটিতে নিয়মিত সংগ্রাম করা একটি দল, যারা এশিয়ার বাইরে নিজেদের সর্বশেষ ২৬ টেস্টের ২২টিতেই হেরেছে।

শুধু তাই নয়, গত দুই মাসেই বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ে এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানে হারের স্বাদ পেয়েছিল।

কিন্তু সেই বাংলাদেশই রোববার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে লিখেছে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায়।

নাজমুল হোসেন শান্তর দলকে নিয়ে প্রতিবেদনে কিছুটা রসিকতাও করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, আইফোন বাজারে আসার পর থেকে এত দীর্ঘ সময় পর প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নামা বাংলাদেশই শেষ পর্যন্ত নিজেদের ৪০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত উপহার দিয়েছে।

আর সেই মুহূর্তের নাম – ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নয় উইকেটের ঐতিহাসিক জয়।

স্বভাবতই অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম স্পোর্টস ইস্যুতে বেশ কড়া, সমালোচনা ও কঠোর হতে তারা দ্বিধাবোধ করেন না।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকরাও বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার এই হারকে একরকম বিপর্যয় হিসেবেই দেখছেন।

ছবির উৎস, Screen Grab

হেরাল্ড সানের শিরোনাম ছিল, ডিজাস্টার ইন ডারউইন অর্থাৎ ডারউইনে বিপর্যয়। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকরাও বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার এ হারকে বিপর্যয় হিসেবেই দেখছেন।

বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়ার এই পরাজয়কে এক রকম অপমান হিসেবে দেখতে চাইছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

তাদের শিরোনামে বাংলাদেশের জয় উঠে এসেছে এভাবে- Australia humiliated as Bangladesh make history with crushing Test victory, অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও বিশাল টেস্ট জয়।

খবরটিতে বলা হয়েছে, ক্যামেরন গ্রিনের ক্যারিয়ার বাঁচানো সেঞ্চুরির পরও অস্ট্রেলিয়াকে তাদের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম লজ্জাজনক ও বড় ব্যবধানে পরাজয়ের স্বাদ দিয়েছে বাংলাদেশ।

ডারউইনে দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে অলআউট করে বাংলাদেশ। জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫৭ রান। এক উইকেট হারিয়েই সেই রান তুলে নেয় সফরকারীরা। ফলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ।

তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে এ পরাজয়কে আলাদা করে দেখছে দ্য গার্ডিয়ান। কারণ, এবার অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচের কোনো পর্যায়েই স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি বাংলাদেশ। শুরু থেকেই প্রতিটি দিন আধিপত্য বিস্তার করেছে তারা।

আর সেটিই এই জয়কে আরও অবিশ্বাস্য করে তুলেছে।

খবরটিতে বলা হয়েছে, ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিনে অস্ট্রেলিয়াকে নয় উইকেটে গুঁড়িয়ে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অঘটনটি ঘটিয়েছে বাংলাদেশ।

এ ফলাফলটি আরও বেশি স্মরণীয়, কারণ ক্রিকেট র‍্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে থাকা টেস্ট দল বাংলাদেশ মাত্র কয়েকদিন আগে ডারউইনে এক প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিরুদ্ধে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল।

জুন মাসে তারা হারারেতে তাদের একমাত্র ম্যাচে ক্রিকেট বিশ্বের সেরা ১০ টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে র‍্যাঙ্কিংয়ের সর্বনিম্ন থাকা জিম্বাবুয়ের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খেলোয়াড়দের সাথে এক ভিডিও কলে পুরো দলকে অভিনন্দন জানান।

বাংলাদেশ যেন অস্ট্রেলিয়াকে ধোলাই করেছে

ছবির উৎস, Screen Grab

‘বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দিন’

ভারতের রাজনীতিক ও ক্রিকেটপ্রেমী শশী থারুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের জয়কে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এ জয় বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের ‘greatest victory’। তার ভাষায়, বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল দৃঢ়, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়ী।

ক্রিকেট বিশ্লেষক হার্শা ভোগলেও এ জয় নিয়ে কথা বলেছেন। “বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দিন।”

পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরামের চোখেও এ জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে অগ্রগতির প্রমাণ। তিনি বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশের পেসার হাসান মাহমুদের।

তার মতে, হাসান এমন কোনো অস্বাভাবিক কিছু করার চেষ্টা করেননি, বরং সঠিক টেস্ট লেংথে ধারাবাহিকভাবে বল করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের চাপে রেখেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ড্যামিয়েন ফ্লেমিংও ডারউইনের জয়কে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ম্যাচটিতে ছিল কঠিন টেস্ট ক্রিকেটের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান – ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং দক্ষতা।

অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের জন্যও এ পরাজয়ের ধাক্কাটা ছিল আলাদা। ৩৯ টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে এটি তার নবম হার। ঘরের মাঠে হারের অভিজ্ঞতাও তার আছে। ২০২৪ সালে গ্যাবায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছেও হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া।

কিন্তু বাংলাদেশের কাছে এ হার যেন অন্য মাত্রার।

কারণ অস্ট্রেলিয়া শুধু ম্যাচটি হারেনি, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছিল। বাংলাদেশের কাছে তারা এমনভাবে পরাজিত হয়েছে, যাকে অস্ট্রেলিয়ার ঘরের মাঠে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রিকেট নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সব পোস্টের জন্য পরিচিত আইসল্যান্ড ক্রিকেটও সুযোগটি ছাড়েনি।

ইংল্যান্ডকে খোঁচা দিয়ে তারা লিখেছে, গত ১৫ বছরে ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যতগুলো টেস্ট জিতেছে, বাংলাদেশ এখন অস্ট্রেলিয়ায় ততগুলো টেস্ট জয়ের মালিক।

রসিকতার আড়ালে অবশ্য একটি বাস্তবতা আছে।

বাংলাদেশের এ জয় এসেছে এমন একটি দলের বিপক্ষে, যারা ঘরের মাঠে প্রায় অজেয় বলেই পরিচিত। আর সেটিও এসেছে এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশের নিজেদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে থাকার কথা ছিল।

কিন্তু ডারউইনে বাংলাদেশ অপেক্ষা করেনি অস্ট্রেলিয়া ভুল করবে বলে। তারা নিজেদের সুযোগ তৈরি করেছে।

আর এ কারণেই অধিনায়ক কামিন্সও ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন, “তাদের জয়টা প্রাপ্য ছিল।”

সম্ভবত ডারউইনের জয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্য এটিই।

কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেটে বহু বছর ধরে প্রশ্ন ছিল- তারা কি শুধু নিজেদের পরিচিত কন্ডিশনে ভালো করতে পারে, নাকি বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষেও তাদের ক্রিকেটীয় মানসিকতা, শৃঙ্খলা ও দক্ষতা ধরে রাখতে পারে?

ডারউইনে বাংলাদেশ সেই প্রশ্নের একটি জোরালো উত্তর দিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয় এখন আর কেবল অসম্ভব কোনো গল্প নয়।

বাংলাদেশ সেটিকে বাস্তব করে দেখিয়েছে।