Home LATEST NEWS BANGLA ঢাকায় কবি নজরুলকে সমাহিত করা হয়েছিল পরিবার ও ভারত সরকারকে না জানিয়েই?

ঢাকায় কবি নজরুলকে সমাহিত করা হয়েছিল পরিবার ও ভারত সরকারকে না জানিয়েই?

5
0

Source : BBC NEWS

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ইসলামের সমাধিস্থল

ছবির উৎস, Getty Images

পঞ্চাশ বছর আগে ঢাকাতে কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের ঠিক পরদিন কলকাতার রবীন্দ্র সদনে কবির স্মরণে যে শোকসভা আয়োজন করা হয়েছিল, দমদম বিমানবন্দর থেকে উদভ্রান্ত ও বিপর্যন্ত অবস্থায় সেখানে এসে পৌঁছান নজরুলের জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী সব্যসাচী। সঙ্গে ছিলেন কবির ছোট পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীও, তারা দুজনেই সরাসরি ঢাকা থেকে ফিরছিলেন।

কাজী সব্যসাচী এসেই বিষণ্ণমুখে বারবার বলছিলেন, “মা রইলেন চুরুলিয়ায় আর বাবা রইলেন ঢাকায়। এ আক্ষেপ সারাজীবন থাকবে।”

কবিপুত্র আরও বলছিলেন, “ওরা আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই শেষ দেখা দেখতে পেতাম। আর ওদের এতো তাড়াহুড়ো করারই বা দরকার কী ছিল। ওদের জানানো হয়েছিল যে কবিপুত্র ঢাকা যাচ্ছেন দুপুরের প্লেনে। তবু কীসের এত তাড়াহুড়ো?”

বিবিসি বাংলার কাছে সে দিনের এই ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বর্ষীয়ান নজরুল গবেষক ও প্রাবন্ধিক বাঁধন সেনগুপ্ত, যিনি নিজে সেদিনের সেই স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন।

তিনি জানাচ্ছেন, কবির প্রয়াণের পর তার মরদেহ যে দাফন করার জন্য জন্মস্থান চুরুলিয়ায় নিয়ে আসা যায়নি এবং ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্তরেও বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি – সেটাই ছিল এই ক্ষোভ আর হতাশার মূল কারণ।

কবির পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য তখন কলকাতায় বা আসানসোলের কাছাকাছি থাকতেন, তাদের ইচ্ছা ছিল চুরুলিয়ার জন্মভিটেয় স্ত্রী প্রমীলা দেবীর কবরের পাশেই কবিকে সমাহিত করা হোক।

কবির পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীতশিল্পী সোনালি কাজী যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, “আমরা জানি ১৯৬২তে প্রমীলা দেবীর মৃত্যুর আগে তিনি বারবার বলে গেছেন আমাকে চুরুলিয়াতে গোর দিও, কারণ তোমার বাবাও তো শেষে ওখানেই যাবেন।”

ততদিনে অবশ্য নজরুল সৃষ্টিহীন হয়ে পড়েছেন, তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতাই নেই। তার জীবনের শেষ সোয়া চার বছর যে স্বাধীন বাংলাদেশে কাটবে, সেটাও কারো জানা নেই।

কবি নজরুল ইসলাম, যখন সৃষ্টির মধ্যগগনে

ছবির উৎস, Nazrul Academy WB

কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত এমন দাঁড়ায় যে নজরুলের মরদেহ ভারতে আনা তো দূরস্থান, কাজী সব্যসাচী ও কল্যাণী কাজী ঢাকাতে গিয়েও কবিকে শেষ দেখা দেখতে পাননি।

১৯৭৬-র ২৯শে অগাস্ট তারা গিয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌঁছান, তার বেশ আগেই কবরে মাটি চাপা দেওয়া হয়ে গেছে।

এর আগে ১৯৭২ সালের ২৪শে মে নিজের জন্মদিনে কবি নজরুল ইসলাম কলকাতা থেকে ঢাকায় পাড়ি দিয়েছিলেন – তখন ভাবা হয়েছিল এই যাত্রা একেবারেই সাময়িক, মাত্র অল্প কয়েকদিনের জন্য।

তখন সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে নজরুলকে ঢাকায় পাঠানোর এই উদ্যোগটি নিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজে। কবির জন্মদিন এক বছর ঢাকায় ও পরের বছর কলকাতায় উদযাপিত হবে, এমনটাও ভাবা হয়েছিল।

“কিন্তু নজরুল যে আর কখনো দেশে ফিরবেন না, সেটা ভারত সরকারের কারো কল্পনাতেও ছিল না।”

“এমনকি তার মৃত্যুর পর তাকে যে ঢাকাতেই সমাহিত করা হবে, বাংলাদেশ সরকারও সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিজেরাই,” বিবিসিকে বলছিলেন ভারতের সাবেক কূটনীতিবিদ ও ঢাকাতে নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ভিনা সিক্রি।

অথচ আজও নজরুলকেই বাংলাদেশ ও ভারতের মৈত্রীর সেরা নিদর্শন বলেই মনে করেন মিস সিক্রি, কারণ “নবীন একটি দেশে তার বন্ধু প্রতিবেশী একজন কবিকে পাঠাচ্ছে – এমন দ্বিতীয় কোনও নজির বিশ্বে আছে বলে আমার জানা নেই!”

কিন্তু নজরুলের প্রয়াণের ঠিক পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সেই মাধুর্যকে অনেকটাই তিক্ত করে ফেলেছিল বলে ভারতে আজও অনেকেরই বিশ্বাস।

শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী, তাদের দুজনের আলোচনার ভিত্তিতেই কবিকে ঢাকাকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল

ছবির উৎস, Getty Images

কাজী সব্যসাচী যেভাবে খবর পেলেন

বর্ষীয়ান নজরুল গবেষক ও লেখক বাঁধন সেনগুপ্ত বিবিসিকে সেদিনের ঘটনাক্রমের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন। হালিশহরে নিজের বাড়িতে বসে তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন তা এরকম।

“কবির বড় ছেলে ও আবৃত্তিকার কাজী সব্যসাচী সে দিন একটি অনুষ্ঠানের জন্য কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্রে ছিলেন। বাংলাদেশ বেতারে কবির মৃত্যুসংবাদ শুনে তার কোনো বন্ধু সেখানে ফোন করে খবরটি সব্যসাচীকে জানান।

তিনি সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে যান কলকাতাস্থ বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রদূত অফিসে। সেখানেও কবির মৃত্যু সম্পর্কে নাকি তখনো বিশেষ কিছু জানা যায়নি। কলকাতার আকাশবাণী থেকে ইতোমধ্যে খবর যায় সব্যসাচীর বাড়িতে এবং কনিষ্ঠ পুত্র অনিরুদ্ধের (যিনি ১৯৭৪-য়ে প্রয়াত) পাইকপাড়ার বাসায়।

অনিরুদ্ধ-পত্নী কল্যাণী ও তার পুত্র কাজী অরিন্দম তখন বাড়িতে ছিলেন না। তারা মিনার্ভা থিয়েটার হলে গিয়েছিলেন একটি অনুষ্ঠানে। ফলে অনিরুদ্ধ-জায়া কল্যাণী কাজীও প্রথম খবর পান বেলা প্রায় ১১টায়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তখনো কেউ কবির প্রয়াণ সংবাদ সরাসরি কবি-পুত্রকে জানাননি। বাধ্য হয়েই সব্যসাচী প্রথমে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার ভবানীপুরের বেলতলা রোডের বাড়িতে যান। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তখন ছিলেন কলকাতার বাইরে।

এদিকে কলকাতায় কবির ভক্তরা শেষ দর্শনের আশায় মধ্য কলকাতায় সব্যসাচীর ক্রিস্টোফার রোডের ফ্ল্যাটের সামনে দলে দলে গিয়ে ভিড় করতে থাকেন। পার্ক সার্কাসে ওই বাড়িটির সামনে ততক্ষণে শত শত লোক জড়ো হতে শুরু করেছেন।

এরপর কাজী সব্যসাচী বাংলাদেশ উপদূতাবাসে গিয়ে এ-বিষয়ে সেদিন পুনরায় আবেদন জানান। তখন দেখা গেল, সব্যসাচীর পাসপোর্টটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও জরুরি ব্যবস্থা করে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কবি-পুত্র সব্যসাচী ও কবির কনিষ্ঠ পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীকে দুপুরের বিমানযোগে দমদম থেকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

কলকাতার রাজভবনে শেখ মুজিবের সঙ্গে কবিপুত্র কাজী সব্যসাচী (ছবির ডানদিকে), কাজী অনিরুদ্ধ (মুজিবের ডান পাশে) ও তার স্ত্রী কল্যাণী কাজী (মুজিবের বাঁ পাশে), ফেব্রুয়ারি ১৯৭২

ছবির উৎস, Anindita Qazi

সেদিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের তদানীন্তন রাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় দিল্লিতে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি। কাজী সব্যসাচী ও কাজী কল্যাণী একই সঙ্গে চুরুলিয়ায় নিজ জন্মস্থানে কবিকে এনে কবর দেওয়ার আবেদন জানিয়ে রাজ্যের মুখ্য সচিবের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন, কিন্তু তিনিও কিছুই করতে পারেননি।

যাই হোক, অনেক দৌড়োদৌড়ির পর অবশেষে দমদমে গিয়ে সব্যসাচী ও কল্যাণী কাজী ঢাকার বিমানে চেপে বসলেন। কিন্তু ‘কোনো অজ্ঞাত কারণে’ সেই বিমান ছাড়তেও অনেক দেরি হলো।

অবশেষে তারা যখন ঢাকা বিমানবন্দরে গিয়ে পৌঁছালেন, তখন স্থানীয় সময় প্রায় সোয়া ছটা। এয়ারপোর্ট থেকে ফোন করেও নাকি তারা অনুরোধ করেছিলেন, কবরে মাটি চাপা দেওয়ার আগে যেন অপেক্ষা করা হয় – ছেলে ও পুত্রবধূ এখনই পোঁছে যাচ্ছেন।

কিন্তু অবশেষে তারা দুজনে যখন গিয়ে পৌঁছান, ততক্ষণে সব চুকেবুকে গেছে।

সব্যসাচী পরে জানিয়েছেন, রীতিমতো গান স্যালুট দিয়ে কবিকে শেষ বিদায় দেওয়া হয়েছিল বলে তারা শোনেন, উপস্থিত ছিলেন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানও – কিন্তু তাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য সরকারের কেউই আর অপেক্ষা করছিলেন না।

বস্তুত রাতে তারা কোথায় থাকবেন, তারও কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না।

অবশেষে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনারের নির্দেশে দূতাবাসের কর্মকর্তা সুব্রত ব্যানার্জি (পথের পাঁচালী সিনেমায় সর্বজয়ার চরিত্রে অভিনয় করা করুণা ব্যানার্জির স্বামী) নিজের বাড়িতে তাদের দুজনের থাকার ব্যবস্থা করেন।

পরদিনের বিমানে চেপে কলকাতায় ফিরে আসেন দুজনে – সঙ্গে ছিল শুধু কবির কবর থেকে তুলে আনা কয়েক মুঠো মাটি।

পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়

ছবির উৎস, Getty Images

কবিকে না ফেরাতে পারায় কলকাতার শোক

পরের দিন (৩০শে অগাস্ট, ১৯৭৬) কলকাতায় রবীন্দ্রসদনে এক স্মরণসভায় পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজ নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। অনুষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ছিলেন কলকাতার শেরিফ রঘুনাথ দে, পৌরোহিত্য করেন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়।

বাঁধন সেনগুপ্ত লিখেছেন, “সেই সভায় উপস্থিত থাকার সময় দেখেছিলাম প্রেক্ষাগৃহ পরিপূর্ণ। দেখেছি অসংখ্য মানুষ রবীন্দ্রসদনের বাইরে সেদিন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন। হলের দরজা বাধ্য হয়েই খোলা রাখতে হয়েছিল।”

“কবির বন্ধুরাও সেখানে প্রায় সকলেই উপস্থিত ছিলেন। লেখক সমাজের সকলেই সভায় এসে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। শিল্পীরা শ্রদ্ধা জানান কবিকে গানের মাধ্যমে।”

“ঢাকা থেকে সরাসরি রবীন্দ্রসদনে এসে উপস্থিত হন কবিপুত্র সব্যসাচী ও পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীও। কল্যাণী মঞ্চে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি কাঁদছিলেন আর বলছিলেন – ‘এত করে ছুটে গেলাম, বাবাকে শেষবারের মতো একটু দেখতেও পেলাম না।’ না, ওদের কেউ ডাকেনি। শোক-সমবেদনাও জানায়নি।”

“সমাবেশে সকলেই আবেগে তখন বেশ বিচলিত। ড. রমা চৌধুরীর বুকে মাথা রেখে মঞ্চে তখন কেঁদেই চলেছেন কবির পুত্রবধূ। সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তাকে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়।”

মঞ্চে তখন আরো উপস্থিত বিচারপতি শঙ্করপ্রসাদ মিত্র, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, শিক্ষামন্ত্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসু, স্পিকার অপূর্বলাল মজুমদার, বিচারপতি মাসুদ, শেখ আনোয়ার আলি, তুষারকান্তি ঘোষ, প্রবোধকুমার সান্যাল, উপাচার্য সতেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ বিদ্বজ্জন।

বাঁধন সেনগুপ্ত আরও জানাচ্ছেন, কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে সকলেই কবির মৃতদেহ তার জন্মস্থানে পত্নীর কবরের পাশে না আনায় হতাশা ব্যক্ত করেন।

লেখক মনোজ বসু ও শেখ আনোয়ার আলি নজরুলের মরদেহ ভারতে আনা যায়নি বলে তাদের বক্তৃতায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।

কলকাতার ক্রিস্টোফার রোডে এখানেই ছিল কাজী সব্যসাচীর ফ্ল্যাটবাড়ি, কলকাতায় কবির শেষ ঠিকানা

জন্মস্থান চুরুলিয়াতেও শোক আর হতাশা

কবির জন্মস্থান আসানসোলের কাছে চুরুলিয়াতেও সেদিন তার পরিবারের সদস্যরা অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তার দেহ সেখানেই হয়তো আসবে।

নজরুলের দুই ভ্রাতুষ্পুত্র, কাজী রেজাউল করিম ও কাজী মজহারুল হোসেন তো কবিপত্নী প্রমীলার সমাধির পাশে কবর খুঁড়েও রেখেছিলেন – যাতে দেহ আসামাত্র সঙ্গে সঙ্গে সেখানে দাফনের ব্যবস্থা করা যায়।

কাজী রেজাউল করিমের কন্যা ও সঙ্গীতশিল্পী সোনালি কাজী বিবিসিকে আরও বলছিলেন, “জামুড়িয়া থানায় ওয়্যারলেসে প্রথম দাদুর মৃত্যুসংবাদ আসে। খবর শোনার পর থেকেই আমার বাবা, জেঠুরা অনেক আশায় বুক বেঁধেছিলেন দেহ নিশ্চয়ই জন্মভিটেতেই আসবে।”

ঘটনাচক্রে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায় সে দিন একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বার্নপুরে এসেছিলেন, যা ছিল চুরুলিয়া থেকে মাত্র বিশ কিলোমিটার দূরে।

“বাবা, জেঠুরা সঙ্গে সঙ্গে একটা গাড়ি ভাড়া করে বার্নপুরেও ছুটে গিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তারা আর্জি জানান, তিনি যেন কবির দেহ বাংলাদেশ থেকে দ্রুত আনানোর ব্যবস্থা করেন।”

“সিদ্ধার্থশংকর রায় সব শুনলেও তাদের কোনো আশার আলো দেখাতে পারেননি। বাবা-জেঠুরা পরে বুঝেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের এ ব্যাপারে আসলে কোনো যোগাযোগই হয়নি,” বলছিলেন সোনালি কাজী।

জামুড়িয়া থানায় ওয়্যারলেসে কোনো খবর আসে কি না, সেই আশায় কবির ভ্রাতুষ্পুত্ররা প্রায় সারাদিন সেখানে হত্যে দিয়ে বসে ছিলেন।

কিন্তু সন্ধ্যার পর যখন জানা গেল ঢাকায় কবির সমাধি দেওয়া হয়ে গেছে, তারা চরম নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। চুরুলিয়া ও আশেপাশে কবির আত্মীয়স্বজন ও অনুরাগীরা তীব্র হতাশায় ভেঙে পড়লেন – বলছিলেন সোনালি কাজী।

কবির ভ্রাতুষ্পুত্র কাজী রেজাউল করিমের কন্যা সোনালি কাজী

ছবির উৎস, Sonali Qazi

পরিবারের মধ্যেই নানা রকম মত?

তবে সে দিনের ঘটনা ঠিক কীভাবে ঘটেছিল এবং কবির দেহ ভারতে আনা উচিত ছিল কি না – তা নিয়ে কবির পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই যে মতভেদ আছে বিবিসির কাছে তা স্বীকার করছিলেন নজরুলের প্রপৌত্র অঙ্কন কাজী।

অঙ্কন কাজী হলেন নজরুলের কনিষ্ঠ পুত্র কাজী অনিরুদ্ধর নাতি এবং কাজী অনির্বাণের পুত্র। তিনি ২০১৬ সালে ‘ক্যারাভান’ সাময়িকীতে প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ান গবেষক এলা ওয়েইসারের একটি নিবন্ধের প্রতিও এই প্রতিবেদকের দৃষ্ট আকর্ষণ করেন।

ওই নিবন্ধে এলা ওয়েইসার লিখেছেন, ১৯৭৬ সালের ২৯শে অগাস্ট ঢাকাতে কল্যাণী কাজী ও কাজী সব্যসাচীকে বলা হয়েছিল কবির দেহ তাড়াতাড়ি দাফন করে দিতে হয়েছে, কারণ মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সূর্যাস্তের আগেই দেহ মাটিচাপা দেওয়া উচিত।

কিন্তু কল্যাণী কাজী এলা ওয়েইসারকে বলেছিলেন, “আমরা কিন্তু এটাও শুনেছিলাম তাড়াহুড়ো করে কবর দেওয়া হয়েছে কারণ ওদের ভয় ছিল আমরা গিয়ে দেহ ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাতে পারি।”

কল্যাণী কাজীর ছেলে কাজী অনির্বাণ আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, তার বিশ্বাস বাংলাদেশ সরকার ইচ্ছে করে ঢাকাগামী ফ্লাইটটি দেরি করিয়ে দিয়েছিল যাতে তার মা ও জেঠু ঠিক সময়ে গিয়ে পৌঁছতে না পারেন!

তবে নজরুলের যে নাতনি (কাজী সব্যসাচী ও উমা কাজীর কন্যা) এখনো ঢাকাতেই থাকেন, সেই খিলখিল কাজী এলা ওয়েইসারকে বলেছিলেন, “আমাদের সবারই ভয় ছিল দাদুর দেহ হয়তো কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হবে। গোটা বাংলাদেশেরই আসলে সেই ভয় ছিল!”

“কিন্তু নজরুল হলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি – কীভাবে তাকে আপনি ভারতে নিয়ে কবর দিতে পারেন?” আরো মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

কল্যাণী কাজী, মৃত্যুর কয়েক বছর আগে বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে

খিলখিল কাজী বিবিসিকে যা বললেন

ঠিক অর্ধ শতাব্দী আগে ১৯৭৬ সালের ২৯শে অগাস্ট যেদিন কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকার পিজি হাসপাতালে মারা যান, শেষ শয্যায় তার পাশে ছিলেন পুত্রবধূ উমা কাজী এবং কবিকে দেখাশোনা করা সহকারীরা।

উমা কাজী ছিলেন কবির বড় ছেলে কাজী সব্যসাচীর স্ত্রী, এবং কবির নাতনি খিলখিল কাজীর মা।

খিলখিল কাজীর বয়স তখন খুব অল্প, কিন্তু সেদিনটির প্রায় সব কথাই তার মনে আছে।

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, যেহেতু তার দাদু তখন জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত, মৃত্যুর পর তার দাফন ও শেষ শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টি রাষ্ট্রীয় তদারকিতে করা হয়।

তিনি জানিয়েছেন, পিতার মৃত্যুর দিনে কাজী সব্যসাচী কলকাতায় ছিলেন। কিন্তু পরিবারের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি যখন ঢাকায় পৌঁছান, ততক্ষণে কবির দাফন হয়ে গিয়েছে।

“আমার বাবা সে দিন অনেক দেরিতে পৌঁছেছিলেন। তিনি মনে কষ্ট পেয়েছিলেন বাবাকে (কবিকে) শেষ দেখা দেখতে পাননি বলে, এবং বাবার দাফনে নিজে থাকতে পারেননি বলে,” বিবিসিকে বলেছেন খিলখিল কাজী।

“তবে, বাবা কখনো এ নিয়ে কোনো আপত্তি বা অভিযোগ করেননি কোথাও,” বলেন তিনি।

খিলখিল কাজী জানিয়েছেন, সেসময় রোজার মাস চলছিল, ফলে জানাজা ও দাফনের ব্যাপারটি ইফতারের পরে ও এশার নামাজের আগে করার কথা বিবেচনা করা হয়েছিল।

একই সঙ্গে ঘটনার দিন কলকাতা থেকে কাজী সব‍্যসাচীর ফ্লাইটটিও ডিলে হয়েছিল, যে কারণে তিনি পৌঁছানোর আগেই কবির দাফন সম্পন্ন হয়।

খিলখিল কাজী জানিয়েছেন, কবির ছোট ছেলে কাজী অনিরুদ্ধ এর বছরদুয়েক আগে ১৯৭৪ সালেই কলকাতায় মারা যান, ফলে তার ঢাকায় আসার কোনো প্রশ্নও ছিল না।

খিলখিল কাজী

ছবির উৎস, Khilkhil Qazi

কবরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন বেছে নেয়া হয়েছিল?

বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, ১৯৭২ সালের ২৪শে মে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয়।

প্রয়াণের কয়েকমাস আগে, ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে।

তবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাকে জাতীয় কবি বলেই সম্বোধন করা হতো, এবং তাকে সে মর্যাদাও দেওয়া হয়েছে। সকল সরকারি প্রতিষ্ঠান, জাতীয় পাঠ্যক্রমে কবিকে জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তার জন্ম এবং মৃত্যুর দিন বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে পালন করা হয়।

কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ২০২৪ সালের ১৫ই ডিসেম্বর।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয় যে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসার দিনটি থেকে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ২৪শে মে থেকে তাকে জাতীয় কবি ঘোষণা করা হচ্ছে।

তাতে আরো উল্লেখ ছিল যে ঢাকার আসার পর ধানমন্ডি ২৮ নম্বর সড়কে কবিকে একটি বাড়ি বরাদ্দ দেয়া হয়। শেষবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির আগ পর্যন্ত ওই বাড়িতেই বসবাস করেছেন নির্বাক কবি।

পরিবার ও গবেষকদের দেয়া তথ্যে জানা যায়, ঢাকায় কবির চিকিৎসাসহ প্রায় সব দায়িত্ব সরকারিভাবেই পালন করা হতো।

ঢাকায় সে দিন কবির দাফনে আগাগোড়া উপস্থিত ছিলেন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান

ছবির উৎস, Getty Images

কবির মৃত্যুর পর তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পার্শ্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী ও নজরুল গবেষক নাশিদ কামাল বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, কবির মৃত্যুর পর তার অন্তিম যাত্রা বা দাফনের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, কবির মৃত্যুর পর সরকারিভাবে যখন চিন্তভাবনা চলছে কবিকে কোথায় দাফন করা হতে পারে, তখন সেখানে এগিয়ে আসেন নজরুল গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং লোকসঙ্গীত শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী।

“কবি যখন মারা গেলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং মুস্তাফা জামান আব্বাসী তখন সরকারকে গাইড করেন কোথায় দাফন করা যায় সে নিয়ে।”

“কবির ইচ্ছা ছিল মসজিদের পাশে সমাহিত হওয়ার। এ নিয়ে তার কবিতা ও গানও রয়েছে – ‘মসজিদেরও পাশে আমায় কবর দিও ভাই’। ফলে, তারা তখন কর্মকর্তাদের বুঝিয়েছিলেন যে, কবিকে যেন মসজিদের পাশেই দাফন করা হয়,” বলেন তিনি।

আর সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু ছিল দেশে রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র, সে বিবেচনায় তখন কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।