Home LATEST NEWS BANGLA ‘নিজেরাই তো চলতি পাচ্ছিনে, কর দেবো কী করে?’

‘নিজেরাই তো চলতি পাচ্ছিনে, কর দেবো কী করে?’

7
0

Source : BBC NEWS

ক্ষুদ্রঋণ

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের বাসিন্দা সখিনা বেগম। টানাটানির সরকারে একটু স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় বছর দশেক আগে ছাগল পালনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ছাগল কেনার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, সেটি জোগাড় করতে না পারায় একপর্যায়ে ঋণ নিতে যোগাযোগ করেন ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে।

“তারা বললো, ঋণ নিতি হলি আগে সদস্য হতি হবে এবং প্রতি সপ্তায় সঞ্চয়ের জন্য টাকা দিতি হবে,” বলছিলেন মিজ বেগম।

তখন থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কাছে সঞ্চয় হিসেবে নিয়মিতভাবে টাকা জমা রেখে আসছেন চল্লিশোর্ধ এই নারী।

“শুরু করছিলাম ১০ টাকা দিয়ে। এখন সপ্তায় ৫০ টাকা করে জমা দিই,” বলেন মিজ বেগম।

এভাবে সঞ্চয় করার ফলে প্রতিমাসে তার নামে যত টাকা জমা হচ্ছে, সেটার ওপর ছয় শতাংশ হারে সুদ পেয়ে আসছেন ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে। এতদিন সেই সুদের ওপর কোনো কর দিতে হতো না।

কিন্তু সরকার বলছে, এখন থেকে ওই সুদের টাকার ওপরেও দশ শতাংশ হারে উৎসে কর দিতে হবে।

“সঞ্চয় থেকে অল্পকিছু টাকা পাই। সেটা দিয়ে নিজেরাই তো চলতি পাচ্ছিনে, কর দেবো কী করে?” করারোপের খবর শুনে হতাশার সুরে বলেন মিজ বেগম।

ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম তদারককারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি’র (এমআরএ) তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ছয় শতাধিক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের সদস্য সংখ্যা প্রায় চার কোটি।

গত অর্থবছর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তাদের সঞ্চয়ের ওপর যত টাকা সুদ দেওয়া হয়েছে, সেটির উৎসে কর একসঙ্গে পরিশোধ করার জন্য ইতোমধ্যেই এনজিওগুলোকে চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

কিন্তু এর বিরোধিতা করে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করছে যে, সিদ্ধান্তটি তুলে নেওয়া না হলে সরকারের ‘লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে’।

এ অবস্থায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদের ওপর ধার্য করা কর তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠিও লিখেছে তারা।

টাকা

হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন?

ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সঞ্চয়ের ওপর উৎসে কর কাটার সরকারি সিদ্ধান্তটি তাদের হঠাৎ করে জানানো হয়েছে।

“কয়েক মাস আগেও আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি,” বলছিলেন ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামে’র (সিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক মো. সাজ্জাদ হোসেন।

তবে এনবিআর অবশ্য বলছে যে, এটা আকস্মিক কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিদ্যমান আয়কর আইনেই এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

আইনটির ১০২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, “অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, বাংলাদেশের কোনো আইনের অধীন কোনো প্রকার ব্যাংকিং, ইনস্যুরেন্স, লিজিং, ফাইন্যান্সিং, ডাক ও ব্যাংকিং, সমবায় বা মোবাইল ফাইন্যন্সিয়াল সার্ভিসেস কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোনো ব্যক্তি, অথবা কোনো প্রকারের আমানতের বিপরীতে সুদ বা মুনাফা পরিশোধকারী কোনো ব্যক্তি, অন্য কোনো নিবাসী ব্যক্তিকে কোনো প্রকারের সুদ বা মুনাফা পরিশোধ করিলে, সুদ বা মুনাফা পরিশোধের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সুদ বা মুনাফা কোনো ব্যক্তির হিসাবে ক্রেডিটের সময় অথবা সুদ বা মুনাফা পরিশোধের সময়, যাহা পূর্বে ঘটে, নিম্নবর্ণিত সারণীতে উল্লিখিত হারে উৎসে কর কর্তন করিয়া সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করিবেন।”

এরপর ছক তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ট্রাস্ট, ব্যক্তিসংঘ ও কোম্পানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর ধার্য করা হয়েছে।

“এক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু ট্রাস্ট, ব্যক্তিসংঘ বা কোম্পানির মধ্যে পড়ে না, সেজন্য তাদেরকে ‘অন্যান্য ক্যাটাগরি’তে ফেলা হয়েছে। ফলে সঞ্চয়ের সুদের ওপর তাদের ১০ শতাংশ হারে উৎসে পরিশোধ করতে হবে,” বলছিলেন এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা।

একটি কাঁচের পাত্রে পয়সা রাখছেন একজন। পাশে একটি ঘড়ি

কিন্তু আইনটি পাস হয়েছে ২০২৩ সালে। এরপর দুই বছর পার হলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। তাহলে এখন হঠাৎ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত কেন?

“এটা যেহেতু আইনেই রয়েছে, সেহেতু তাদেরই উচিত ছিল নিজে থেকে করটা দেওয়া। কিন্তু তারা সেটা করেনি। ফলে বাধ্য হয়ে এনবিআর এখন চিঠি দিয়েছে,” বলেন নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা।

তবে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এমনও ধারণা দিয়েছেন যে, রাজস্ব আয় বাড়ানোর সরকারি নির্দেশ মানতে গিয়েই এনবিআর এখন নতুন নতুন খাত খুঁজে বের করছে।

সম্প্রতি এনবিআরের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে, সেখানে ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের ওপর দেওয়া সুদের উৎসে কর কেটে একসঙ্গে জমা দিতে বলা হয়েছে।

সেইসঙ্গে, আগের অর্থবছরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর জমা না দেওয়ায় দুই শতাংশ হারে জরিমানাও চাওয়া হয়েছে।

২৯শে সেপ্টেম্বর ওই অর্থ জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান উৎসে করের অর্থ জমা দেয়নি বলে জানা যাচ্ছে।

“বরং সরকার যেন এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে, সেজন্য আমরা সরকারের কাছে চিঠি লিখেছি,” বলেন সিডিএফের নির্বাহী পরিচালক মি. হোসেন।

কী আছে চিঠিতে?

ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদের ওপর থেকে ১০ শতাংশের উৎসে কর তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে গত ২৩শে সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে চিঠি দিয়েছে ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)।

এনবিআর, পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) কাছেও একই আবেদন করেছে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওই সংগঠনটি।

সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ এবং ২০২১ সালের অর্থ আইনে, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সনদপ্রাপ্ত বেসরকারি সংস্থাগুলোর ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থেকে অর্জিত সার্ভিস চার্জকে করমুক্ত আয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

সিডিএফ বলেছে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয়ের যে অর্থ জমা নিয়ে আসছে, সেটিও তাদের কার্যক্রমেরই অংশ।

২০০৬ সালের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) আইনে সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০১০ সালের এমআরএ বিধিমালা অনুযায়ী, আমানতের ওপর ন্যূনতম ছয় শতাংশ হারে সুদ পাওয়া সদস্যদের অধিকার।

ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হলে সরকারের আয় বাড়বে প্রায় ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা

“যেহেতু প্রতিষ্ঠানের অর্জিত সুদ করমুক্ত, সেহেতু প্রতিষ্ঠানের প্রদেয় সুদও করমুক্ত বলেই অনুশীলন হয়ে আসছে,” চিঠিতে উল্লেখ করেছে সিডিএফ।

কিন্তু এতবছরের অনুশীলনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সম্প্রতি এনবিআর উৎসে করের চিঠি পাঠানোয় অবাক হয়েছে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো।

সিডিএফ বলছে, ২০২৩ সালের যে আয়কর আইনের বলে এনবিআরের কর দিতে বলছে, সেখানে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর সদস্যদের সঞ্চয়ের সুদের ওপর কর নেওয়ার কথা স্পষ্ট করে কোথাও বলা নেই।

অন্যদিকে, গত বাজেটে সাধারণ সঞ্চয়পত্রের ওপরেও ১০ শতাংশ উৎসে কর ধার্য করা হয়েছে। কিন্তু এনবিআরের নতুন নিয়ম অনুসারে, করদাতারা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে রাখা উৎসে কর রিটার্ন জমার সময় সমন্বয় করতে পারেন।

কিন্তু ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে যাদের অর্থের ওপর করারোপ করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগেরই আয় করমুক্ত আয়সীমার নিচে বলে জানা যাচ্ছে।

“ফলে অগ্রিম আয়কর সমন্বয়ের সুযোগ তাদের নেই,” চিঠিতে লিখেছে সিডিএফ।

এ অবস্থায় করারোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।

টিনের বেড়া দেওয়া ঘরে একটি দা নিয়ে সবজি কাটছেন একজন নারী

কী লাভ, কী ক্ষতি?

সিডিএফের মতে, তাদের সাড়ে চার কোটি সদস্যের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র সঞ্চয় অনেকটা অনানুষ্ঠানিক বিমার মতোই কাজ করে।

“কারণ তাদের পরিবারের কারও অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি বা আকস্মিক আয়সংকটের সময়ে ক্ষুদ্র সঞ্চয় আর্থিক সুরক্ষা দেয়,” বলেন সিডিএফের নির্বাহী পরিচালক মো. সাজ্জাদ হোসেন।

সংগঠনটির হিসেবে, ২০২৫ সালের ৩০শে জুন মাস পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ খাতে মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ৭৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা।

এর ওপর গড়ে ছয় শতাংশ হারে সুদ দিলে মোট সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। আর সেটার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হলে সেই করের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে, কর আদায়ের মাধ্যমে সরকার এই অর্থ নিতেই পারে, “কিন্তু তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে,” বলেন সিডিএফ কর্মকর্তা মি. হোসেন।

টাকা

ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে ব্র্যাককে অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটিই বাংলাদেশের বৃহত্তম ও শীর্ষস্থানীয় ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী এনজিও।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহও মনে করেন, ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদের ওপর কর নেওয়ার সিদ্ধান্তটি সমাজে ভুল বার্তা দেবে।

“রাজস্বের অঙ্কে প্রাপ্তি সামান্য, কিন্তু বার্তাটি স্পষ্ট; যার সঞ্চয় সবচেয়ে কম, করের বোঝা তার ওপরই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ব্র্যাকের শীর্ষ কর্মকর্তা মি. সালেহ।

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে, সরকার যেখানে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চালাচ্ছে, সেখানে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে উৎসে কর কেটে নেওয়ার উদ্যোগ পুরোপুরিভাবে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়।

“কারণ যাদের অর্থের ওপর কর চাওয়া হচ্ছে, তারা প্রায় সবাই নিম্ন আয়ের গরিব মানুষ। ২০-৫০ টাকা করে জমিয়ে সেখান থেকে প্রতিমাসে তারা অল্প কিছু বাড়তি অর্থ পাচ্ছেন। এখন সেটির ওপর যদি করা দিতে হয়, তাহলে প্রান্তিক শ্রেণির এসব মানুষ সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এতে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সরকারেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামে’র (সিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক মো. সাজ্জাদ হোসেন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।