Home LATEST NEWS BANGLA ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রি কি নিষিদ্ধ?

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রি কি নিষিদ্ধ?

2
0

Source : BBC NEWS

অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থটি ২০১২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়

ঢাকার বাংলাবাজারে একটি প্রকাশনী সংস্থায় শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রিতে বাধা এবং প্রতিষ্ঠানটিতে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকার পরও বইটি বিক্রি নিয়ে যা ঘটেছে, সেটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত হিসেবেই দেখছেন লেখক ও প্রকাশকদের অনেকে।

তাদের অভিযোগ, এই ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র নিশ্চুপ থাকছে বলেই বারবার এর পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

এই ঘটনা নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ভুক্তভোগী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড বা ইউপিএল।

তারা বলছে, কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হলে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সেটি করতে হয়। কিন্তু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেছে বলে তাদের জানা নেই।

সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।

এছাড়া, প্রকাশনার মতো জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম ‘আইনসম্মত নয়’ এমন চাপ বা হুমকির মুখে থাকলে তাতে দেশের সামগ্রিক সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে ইউপিএল।

এদিকে, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের এই ঘটনা নিয়ে সমালোচনা করছেন লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের অনেকে। তারা বলছেন, কোনো বইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে, রাষ্ট্র সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু ব্যক্তি ইচ্ছার কারণে যে কেউ এমন ঘটনা ঘটাতে পারে না।

শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'

ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে সোমবার বিকেলে রাজধানীর বাংলাবাজারে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড এর বিক্রয়কেন্দ্রে বাধা দেওয়া এবং হট্টগোলের অভিযোগ ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন বিকেলে দুই জন যুবক ইউপিএল-এর বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি কিনতে চান। বিক্রয়কর্মীরা বইটি বের করে দেখালে তারা দাবি করেন- বইটি ‘নিষিদ্ধ’।

কেন ‘নিষিদ্ধ’ বই বিক্রি করা হচ্ছে- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং শোরুমে হট্টগোল শুরু করেন ওই দুই ব্যক্তি।

একপর্যায়ে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে যায় এবং বিক্রয়কেন্দ্রের শাটার নামিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

পরে বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মী আমিনুল ইসলাম ও হুমায়ূন কবীরকে সেখান থেকে ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, তুলে নেওয়া দুই কর্মীকে থানায় আনা হয়নি। তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়ার পর সেখান থেকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনায় বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি, কিংবা কাউকে আটক করা হয়নি বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে, মঙ্গলবার এ নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে ভুক্তভোগী প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএল। যেখানে তারা এই ঘটনাকে ‘লজ্জাকর এবং দুর্ভাগ্যজনক’ বলে উল্লেখ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, কোনো বইকে নিষিদ্ধ করতে হলে একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সবাইকে জানাতে হয়। কিছু আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়। এ বইয়ের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেছে বলে তাদের জানা নেই।

একজন পাঠক বই পড়ছেন

সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে ইউপিএল সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।

ইউপিএল কর্তৃপক্ষ বলছে, অতীতেও বিভিন্ন সরকারের সময় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বই প্রকাশ নিয়ে এই ধরনের চাপের সম্মুখীন হয়েছে তারা।

এক্ষেত্রে মওদুদ আহমেদের গ্রন্থাবলি এবং অধ্যাপক আসিফ নজরুলের গঙ্গাচুক্তি বিষয়ক গ্রন্থের উদাহরণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

“প্রকাশক হিসেবে আমরা যথাসম্ভব এই চাপগুলো উপেক্ষা করেছি। পেশাদারত্বের এই নীতির কারণে ইউপিএল বহুবার বাণিজ্যিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু কখনোই প্রকাশনার মৌলিক মানদণ্ড থেকে সরে আসেনি,” বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড অনুসরণ করে তারা এবং স্বাধীনভাবে প্রতিটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি যাচাই করা হয়।

“এই আত্মবিশ্বাসই আমাদের আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি, যার শক্তিতে কোনো চাপের মুখেই ইউপিএল কখনো কোনো বই সরিয়ে নেয় না। বিগত আমলের মতো এখনও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিজ্ঞাপন ইউপিএল-এর পেজে প্রকাশিত হয়,” বলছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, বিশেষজ্ঞদের এমন মতামতের প্রেক্ষিতেই সম্প্রতি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক রচিত ‘জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস’ বিষয়ক গ্রন্থটিও প্রকাশ করা হয় বলেও জানিয়েছে ইউপিএল।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’- বাংলাদেশের ইতিহাসের পরিক্রমায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই হিসেবেই উল্লেখ করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি। তারা বলছে, কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনে বইটি নিষিদ্ধ করলে ইউপিএল আইন অনুসারেই কাজ করবে।

স্টলে বই দেখছেন একজন পাঠক

লেখক-প্রকাশকদের সমালোচনা

গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বই নিষিদ্ধের ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও নানা কারণে বই নিষিদ্ধের ঘটনা ঘটেছে।

পৃথিবীর অনেক দেশেই নামী লেখক কিংবা পাঠকপ্রিয় বিভিন্ন বই নিষিদ্ধ হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু কোনো বই নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্তের নির্দেশ যখন দেওয়া হয় তখন কর্তৃপক্ষ তার কারণ ব্যাখ্যা করে।

বাংলাদেশে কোনো বই নিষিদ্ধ করা বা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বইকে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে একক কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। বই নিয়ে বিভিন্ন সময় যখন অভিযোগ ওঠে, তখন আলাদা আলাদা বিভাগ বা অধিদপ্তর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়।

যদিও লেখক, গবেষক এবং প্রকাশকরা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেই বই নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

অতীতে ‘নারী’ বইটি যখন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তখন প্রথমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সে উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটির বিষয়ে সরকারের নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি না এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও উত্তর পাওয়া যায়নি।

এছাড়া প্রতি বছর বাংলাদেশে একুশে বইমেলার সময় মেলা-কেন্দ্রিক একটি বিশেষ টাস্কফোর্স কাজ করে। যার কাজ কোনো বই নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ কমিটিকে জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া।

বাংলা একাডেমি শুধু বইমেলা কেন্দ্রিক বইগুলোর ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়। বাকি ১১ মাস কোনো বই সম্পর্কে অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে বাংলা একাডেমি পদক্ষেপ নিতে পারে না।

বইয়ের দোকানে একসাথে অনেক লেখকের বই দেখা যাচ্ছে

অথচ সম্প্রতি আইনের তোয়াক্কা না করে ব্যক্তি পর্যায় থেকে- জোর করে নির্দিষ্ট কোনো বই বিক্রি বন্ধ বা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ করার প্রবণতা ভাবিয়ে তুলেছে প্রকাশক ও লেখকদের।

প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলছেন, “কোনো বইয়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ রাষ্ট্রীয়ভাবে নেই। কিন্তু তারপরও গত আড়াই বছর ধরে এরকম ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে, রাষ্ট্র নিশ্চুপ।”

তিনি বলছেন, ২০২৫ সালের বই মেলাতে জোর খাটিয়ে স্টল বন্ধ করে দেওয়া হলেও, অপরাধীদের জবাবদিহি করেনি রাষ্ট্র।

“রাষ্ট্র কোনো বই নিষিদ্ধ করবে বা কোনো প্রকাশনাকে অভিযুক্ত করবে কেবল তখনই অভিযুক্ত হবে, তার আগে ব্যক্তিগতভাবে কেউ নিষিদ্ধ করে দিতে পারে না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

লেখক কী লিখবেন, প্রকাশক কী ছাপবেন, পাঠক কী পড়বেন- এটা সম্পূর্ণ তাদের এখতিয়ার বলেই মনে করেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।

তার প্রশ্ন, “আপনার পছন্দ হলে পড়বেন, না হলে পড়বেন না। আরেকজনের পড়ার ইচ্ছে হলে তাকে কেন বাধা দেবেন?”

মি. আহমদ বলছেন, পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকলেও মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিন মাও সে তুং, হো চি মিন, আর্নেস্টো চে গিভেরা- সবার বই দোকানে প্রকাশ্যে বিক্রি হতো।

“এ যাবত এ দেশে অনেক বই ও পত্রিকা নিষিদ্ধ হয়েছে। কোন সরকারের আমলে কয়টা নিষিদ্ধ হয়েছে, সেটা আপনারা খুঁজে দেখতে পারেন। দেখবেন, কারও চেয়ে কেউ কম যায় না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।