Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Nagib Bahar
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের যশোর অঞ্চলের বেনাপোল সীমান্তে একদল ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা ‘জিরো লাইনের’ কাছেই জড়ো করে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলের কাছে বাংলাদেশ সীমান্তে থাকা বিবিসির সংবাদদাতা নাগিব বাহার জানিয়েছেন, জড়ো করা লোকজনকে খালি চোখে দেখা না গেলেও তাদের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি মঙ্গলবার বিকেলেও দেখা গেছে।
যশোরের রঘুনাথপুরের বিজিবি কমান্ডার লে. কর্ণেল সাইফুল আলম খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা অবৈধভাবে কাউকে ‘জিরো লাইন’ ক্রস করতে দিবেন না।
তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা কোনো ধরনের পুশ ইন-এর খবর অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, “শুধু ওই পেট্রাপোল (বেনাপোলের দিকে ভারতীয় সীমান্ত) অঞ্চলে নয়, অন্য জায়গা দিয়েও কাউকে পাঠানো হয় নি”।
ওদিকে ঢাকায় মঙ্গলবার বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, “ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে কোনো তালিকা পাঠালে আইন অনুযায়ী রিপ্যাট্রিয়েশন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তালিকা সরকার পায়নি”।
তিনি আরও বলেছেন, “বর্ডারে আমাদের বিজিবি অ্যালার্ট আছে। আমরা যে কোন ধরনের ইল্লিগ্যাল পুশ ইন বা পুশ ব্যাক এগুলোর বিপক্ষে”।
এদিকে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা সংলগ্ন ভারতের হাকিমপুর সীমান্তে অবৈধভাবে দেশটিতে যাওয়া কয়েকশ কথিত বাংলাদেশি ফেরার জন্য জড়ো হয়েছেন বলে জানা গেলেও তাদের রাজ্য পুলিশ তাদের রাজ্য পুলিশ সেখান থেকে বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা।
ছবির উৎস, BGB
কী ঘটেছে, পরিস্থিতি এখন কেমন
বিজিবি সূত্র ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে বিবিসির সংবাদদাতা জানতে পেরেছেন যে, রবিবার গভীর রাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ প্রায় ১৫ জনের একটি দলকে যশোরের বেনাপোলের রঘুনাথপুর ও সাদীপুর এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল।
খবর পেয়ে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সতর্ক অবস্থান নেয় এবং এর নিন্দা জানায়। এই প্রেক্ষাপটে সোমবার বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক হলেও সেই বৈঠকে বিএসএফ এমন কোনো কিছুর সাথে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার খবর প্রত্যাখ্যান করে বলে বিজিবি সূত্র বলছে।
ভারতীয় কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, এটি ছিল একটি রুটিন বৈঠক।
যদিও সোমবার দুই দেশের শূন্য রেখার কাছেই একদল ব্যক্তিকে অবস্থান করতে দেখা গেছে।
বিবিসি সংবাদদাতা নাগিব বাহার বলছেন, মঙ্গলবার কোনো ব্যক্তিকে জিরো লাইনের কাছে সরাসরি দেখা না গেলেও সেখানে ব্যবহৃত নানা দ্রব্যাদি পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
“সীমানা চৌকির কাছেই গাছপালা আছে। ধারণা করা হচ্ছে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার জন্য জড়ো করা ব্যক্তিদের সেখানেই রাখা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে তাদের দেখা যাচ্ছে না,” আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল থেকে বলছিলেন মি. বাহার।
তবে বিজিবির দিক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএসএফ যাদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করছে তাদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু আছে।
বিজিবি বলছে, তাদের কেউ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি।
ছবির উৎস, Uttarayan Chakrabarti/BBC
রঘুনাথপুর বিজিবি কমান্ডার লে কর্ণেল সাইফুল আলম খান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারি থেকে তারা জানতে পেরেছিলেন যে বিএসএফ আনুমানিক ১০০ জনকে জড়ো করেছিল।
“তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। এর মধ্যে বিজিবি সতর্ক হওয়ায় ওইসব ব্যক্তিরা নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেয়। কাউকে আমরা অবৈধভাবে জিরো লাইন ক্রস করতে দিবো না,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. খান।
তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে, যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছিল বিএসএফ। এর মধ্যে কিছু ‘পকেট’ দিয়ে কিছু লোকজন বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
যদিও বিজিবি বলছে, তারা কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়নি।
রঘুনাথপুর এলাকায় বিবিসি বাংলার সাথে কথা হয়েছে নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির। তিনি সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকা থেকে এসেছেন বলে জানিয়েছেন।
মি. ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, বিএসএফ যাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে তাদের মধ্যে তার পিতাও আছেন।
তার দাবি ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ অবস্থান করা তার পিতা তার সাথে ভিডিও কলে কথাও বলেছেন। তিনি ৫/৬ বছর আগে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে আর দেশে ফিরে আসতে পারেননি বলে জানান মি. ইসলাম।
“তিনি ভারতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য তাকেও ধরে আনা হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
তার পিতার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে নজরুল ইসলাম জানান যে, এই দলটিতে মোট ৬০ জনের মতো ছিল, যাদের অনেকে বিভিন্ন পথে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে।
ছবির উৎস, Getty Images
তবে বিজিবির যশোর দক্ষিণ পশ্চিম জোন কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার মাহমুদুল হাসান বলছেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য ও মিডিয়া রিপোর্ট হওয়ার পর তারা সীমান্ত নজরদারি বাড়িয়েছে।
রঘুনাথপুর কমান্ডার লে কর্ণেল সাইফুর আলম খান বলছেন, গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারি থেকে তারা জানতে পারেন যে আনুমানিক ১০০ জনকে সীমান্তের ওপাড়ে জড়ো করা হয়েছিল।
“তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। এর মধ্যে তারা সতর্ক হওয়ায় ওইসব ব্যক্তিরা নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেয়,” বলছিলেন তিনি।
ওদিকে বেনাপোল এলাকার সীমান্ত দিয়ে পুশ ইনের চেষ্টা বিস্মিত করছে ওই এলাকার মানুষকে।
সীমান্ত সংলগ্ন সাদীপুর গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বেনাপোল এলাকার সীমান্তে এ ধরনের ঘটনা বিরল।
“এই অঞ্চলে আগে বর্ডার দিয়ে গোপনে যাওয়া আসা হতো। কিন্তু বেনাপোল বন্দর থাকার কারণে এই অঞ্চলে উভয় দিকের কড়া নজরদারি থাকে। সাধারণত এই এলাকার সীমান্ত দিয়ে পুশ ইনের এমন চেষ্টা খুব একটা দেখা যায় না,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, এর আগে সাতক্ষীরা সীমান্তেও বিএসএফ এর পুশব্যাক চেষ্টা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল কয়েকদিন আগেই। ফলে ওই সীমান্তেও নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়েছে বিজিবি।
ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি সন্দেহে ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করে দেওয়ার বেশ কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। ভারতের দিক থেকে যেটা পুশ-ব্যাক, বাংলাদেশের চোখে সেটাই পুশ-ইন।
সাম্প্রতিককালে গত এক বছর ধরে খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার খবর এসেছে।
গতমাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ও ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ আটক করে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। তাদের আটক করতে হোল্ডিং সেন্টার তৈরিও ঘোষণা দিয়েছেন।







