Home LATEST NEWS BANGLA যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধটি আসলে কেন হয়েছিল?

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধটি আসলে কেন হয়েছিল?

5
0

Source : BBC NEWS

১৫ জুন তেহরানে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের বাইরে একটি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে কালো পোশাক পরা এক নারী হেঁটে যাচ্ছেন।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা চালানোর ভুল সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি তুলে ধরেছে।

মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। ইরান ও লেবাননে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই বেসামরিক।

যুক্তরাষ্ট্র এবং পরোক্ষভাবে ইসরায়েলও একটি কৌশলগত পরাজয়ের মুখে পড়েছে।

তেহরানের শাসনব্যবস্থা তাদের সবচেয়ে খারাপ আশঙ্কার মুখোমুখি হয়েছিল– বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে তাদের দুর্বল বা ধ্বংস করার প্রচেষ্টা।

কিন্তু এই শাসনব্যবস্থা শুধু টিকেই থাকেনি; বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে।

মোজতবা খামেনি

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসসহ অন্যান্য সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে চলাচল করে- সেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কৌশল ট্রাম্পকে এমন কিছু ছাড় দিতে বাধ্য করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী কট্টরপন্থি গোষ্ঠী এবং ইসরায়েলি সরকারকে ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করেছে।

সমঝোতা স্মারকটিতে লেবাননের যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইসরায়েলের মতে, এটি সম্ভব নয়। তারা লেবাননে অবাধ সামরিক স্বাধীনতা চায়, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে আরও গভীর বিভাজন তৈরি করতে পারে এবং আমেরিকার সঙ্গে কোনো চুক্তির বিরোধী ইরানের কট্টরপন্থিদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।

প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিনিময়ে এই স্মারকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ তুলে নেবে, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে- যার ফলে ইরান বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে। একইসঙ্গে বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করে আরও বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করার কথা বলা হয়েছে।

এর পর শুরু হবে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে কঠিন আলোচনা।

এই সবকিছু ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে ২৭শে ফেব্রুয়ারির অবস্থায়, যেটি ছিল যুদ্ধের আগের দিন। সেই দিন হরমুজ প্রণালি খোলা ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকরা পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

এই সমঝোতা স্মারকের ফলে আলোচকরা আবার কাজে ফিরবেন এবং জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টে জো বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এক্স-এ লিখেছেন, “এই যুদ্ধবিরতির একমাত্র ‘অর্জন’ হলো হরমুজ প্রণালির সম্ভাব্য পুনরায় খোলা- যা যুদ্ধ শুরুর আগেও খোলা ছিল। আর সেটি করতে গিয়েও সম্ভবত আমাদের ইরানকে অর্থ দিতে হবে”।

হরমুজ প্রণালি

ছবির উৎস, Getty Images

তবে যুদ্ধটি আসলে কেন হয়েছিল— এই প্রশ্নটি অনিবার্য এবং তা দূর হবে না।

এটি এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

এটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তির সূচনাও হতে পারে। অক্টোবরে নির্বাচনের মুখোমুখি হয়ে তাকে নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য ভোটারদের জবাবদিহি করতে হবে, যে ব্যর্থতার কারণে ইসরায়েলের শক্তিশালী সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর গাজা থেকে হামাসের আক্রমণ পরিকল্পনা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

নেতানিয়াহুর কঠোর সামরিক নীতি ও কূটনীতিকে অবজ্ঞা করার পেছনে অন্তত আংশিক উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে ইসরায়েলের ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

তেহরান সবসময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সম্ভাব্য শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, কূটনীতিক এবং গোয়েন্দারাও তা জানত।

কিন্তু ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, যিনি একজন সতর্ক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনি প্রণালীটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি নিতে চাননি।

যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েল তাকে এবং তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের হত্যা করার পর, তার উত্তরসূরিরা সঠিকভাবেই মনে করেছিল যে তারা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রয়েছে এবং প্রণালি বন্ধ করতে দ্বিধা করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প করমর্দন করছেন। দু’জনের পরনে গাঢ় নীল স্যুট ও লাল টাই; ট্রাম্প হাত দিয়ে নেতানিয়াহুর দিকে ইঙ্গিত করছেন।

ছবির উৎস, Reuters

ইরান এখন বুঝতে পেরেছে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির এই সংকীর্ণ প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ কতটা শক্তিশালী অস্ত্র। মধ্যপ্রাচ্যে বহু বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ে গড়ে তোলা মিত্র ও প্রতিনিধির নেটওয়ার্কের তুলনায় এটি ব্যবহারে সহজ এবং অনেক সস্তা।

সিরিয়ার আসাদ শাসনব্যবস্থা, ২০২৪ সালের শেষ দিকে যেটির পতন হয়েছে, সেটি ছাড়া ইরানের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা সমর্থনকারী শক্তিগুলো কোনোভাবে এখনো টিকে আছে। তবে ইসরায়েলের আঘাতে তা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে তারা আদৌ কতটা ‘প্রতিরোধ’ করতে পারবে, তা এখন অনিশ্চিত।

ইরান একটি পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে, যা তারা অস্ত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে নয় বলে দাবি করলেও বাস্তবে তা তেহরানের জন্য হুমকি হওয়ার পাশাপাশি একটি বিকল্প হিসেবেও আবির্ভুত হয়েছে।

কিন্তু এটি এমন একটি যুদ্ধ উসকে দিয়েছে, যার ফলে শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলেও ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা সহজ ছিল এবং এর দ্রুত ও বিধ্বংসী প্রভাব আরবের তেল উৎপাদনকারী রাষ্ট্রগুলোসহ বিশ্বের বড় অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান বাহিনী কিছু কৌশলগত জয় অর্জন করেছিল। কিন্তু তা কৌশলগত পরাজয় এড়াতে যথেষ্ট ছিল না।

কারণ শাসন পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে তাদের কৌশলটি ছিল ভুল ও অলস অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে। তারা মনে করেছিল সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করলে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

কিন্তু প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলো এই ধরনের আঘাত প্রতিরোধ করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে। এটি ভেনেজুয়েলার মতো নয়, যেখানে একজন নেতা অপহৃত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখে পড়ার পর ভেঙে পড়েছিল দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থা।

ইরানের শাসনব্যবস্থা নিঃসন্দেহে দুর্নীতিগ্রস্ত ও কঠোর দমনমূলক। জানুয়ারিতে তাদের বাহিনী রাস্তায় হাজারো বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে। তবে এটি একটি আদর্শবাদ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জাতীয় নিরাপত্তা, আত্মত্যাগ ও টিকে থাকার ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা ১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের সঙ্গে বিধ্বংসী যুদ্ধ থেকে জন্ম নিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি

ছবির উৎস, Reuters

যুদ্ধ শুরু হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন তেহরানের শাসনব্যবস্থা পতন হবে। তিনি ইরানি জনগণকে তাদের দেশ পুনরুদ্ধারের “প্রজন্মে একবার আসা সুযোগের” জন্য প্রস্তুত হতে বলেন।

অল্প সময় পরই তিনি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান।

নেতানিয়াহু, যিনি এর আগে বহুবার হোয়াইট হাউসে বসা ট্রাম্পের পূর্বসূরিদের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তাদের প্রত্যাশিত ঘটনার ব্যাপ্তি বোঝাতে বাইবেলের ভাষা ব্যবহার করেন, “এই জোট আমাদের ৪০ বছর ধরে যার আকাঙ্ক্ষা করেছি তা করতে দেবে- সেটা হলো সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করা”।

কিন্তু দুজনের কেউই তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

এই সমঝোতা স্মারক কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এটি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইস্যু- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর একটি চুক্তি।

তবে এতে ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছাড় আগে থেকেই যুক্ত করা হয়েছে। আলোচনা এগোলে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলেছে।

সবকিছু নির্ভর করছে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে ৬০ দিনের আলোচনার সফলতার ওপর—যা জটিলতার কারণে বাড়ানো হতে পারে এবং সম্ভবত বাড়ানোই হবে।

দুই পক্ষই একে অপরকে বিশ্বাস করে না। অনেক কিছুই ভুল হতে পারে।

ওয়াশিংটন, তেহরান এবং ইসরায়েলের কঠোরপন্থিরা চায় না এই চুক্তি সফল হোক।

ইরান আসন্ন আলোচনায় অতিরিক্ত কঠোর অবস্থান নিতে পারে, যা তাদের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক লাভকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

তবুও এই চুক্তি হাজারো প্রাণহানি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা সৃষ্টি করা যুদ্ধের তুলনায় অনেক ভালো।

যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের সন্তুষ্টি অনুযায়ী একটি পারমাণবিক চুক্তি হয় এবং উভয় পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য বদলে যেতে পারে।

তবে সেটি একটি বড় ‘যদি’ এবং দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার শেষে উত্তরের ওপর নির্ভর করছে।