Home LATEST NEWS BANGLA সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগ কীভাবে হয়?

সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগ কীভাবে হয়?

5
0

Source : BBC NEWS

চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে গ্রুপ করে তিনজন পড়ালেখা করছেন

ছবির উৎস, Getty Images

Published

পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশে সরকারি চাকরির নিয়োগবিধিতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানো এবং লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে নতুন এই পরিবর্তনটি আনা হচ্ছে।

সরকারি চাকরির ১১তম গ্রেড থেকে ২০ তম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগে এই পরিবর্তন আসবে বলে জানা যাচ্ছে। এরইমধ্যে, এই প্রস্তাব অনুমোদন করেছে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি।

তবে, এখনো এই সিদ্ধান্তের গেজেট প্রকাশিত হয়নি। তার আগেই সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা আলোচনা, সমালোচনা চলছে।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় নানা স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ অনেক পুরোনো। ফলে এখন লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে, মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ালে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সরকারি কর্মচারীদের এই নিয়োগে দুর্নীতি, অনিয়ম তৈরির সুযোগ তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

তবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার জানিয়েছেন, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়, বরং দক্ষ – যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে পরিবর্তন এনেছে সরকার।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে কীভাবে হয় নিয়োগ পরীক্ষা?

সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন

ছবির উৎস, SOPA Images via Getty Images

কত নম্বরের পরীক্ষা হয়?

বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত প্রথম শ্রেণি, আর দশম থেকে ১২তম গ্রেড পর্যন্ত দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি হিসেবে পরিচিত।

এছাড়া ১৩তম থেকে ১৬তম গ্রেড পর্যন্ত তৃতীয় শ্রেণি এবং ১৭তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত চতুর্থ শ্রেণির সরকারি চাকরি বলে বিবেচিত হয়।

বর্তমানে সরকারি চাকরির প্রথম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগ হয় সরকারি কর্ম কমিশন বা পিএসসির মাধ্যমে।

বর্তমানে লিখিত, মৌখিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে অ্যাপটিটিউড টেস্ট বা প্র্যাকটিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হয়।

তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে বিভিন্ন অধিদপ্তর বা পরিদপ্তরের পরীক্ষার নম্বরের ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে।

মন্ত্রণালয়ের জন্য বাংলাদেশ সচিবালয় (ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড কর্মকর্তা এবং নন-গেজেটেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৪ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়।

এতে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, সাঁট-মুক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, ইলেকট্রিশিয়ান এবং প্লেইন পেপার কপিয়ার পদে সরাসরি নিয়োগের পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিকসহ মোট ১১০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয়।

সর্বনিম্ন ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাস করতে হবে। এই ১১০ নম্বরের মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ১০০।

এর মধ্যে বাংলায় ৩০, ইংরেজীতে ৩০, গণিতে ২০ এবং ২০ নম্বরের সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

বাকি ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়।

তবে, এই পদগুলোতে আবার কম্পিউটার অ্যাপটিটিউড টেস্টে উত্তীর্ণ প্রার্থীরাই মৌখিক পরীক্ষার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে বলে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ২০তম গ্রেডের এমএলএসএস ও ডুপ্লিকেটিং মেশিন অপারেটর পদে মোট ৫০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

এতে লিখিত পরীক্ষায় ৪০ নম্বর এবং মৌখিক পরীক্ষায় ১০ নম্বর।

লিখিত পরীক্ষার বাংলায় ১৫, ইংরেজিতে ১৫ এবং গণিতে ১০ নম্বরের মোট ৪০ নম্বরের পরীক্ষা হয়।

চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সংযুক্ত অধিদপ্তর, পরিদপ্তর এবং দপ্তরের কমন পদ নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৯ অনুযায়ী নিজস্ব কর্মচারী নিয়োগ করা হয়ে থাকে।

এই বিধিমালা অনুযায়ী, উচ্চমান সহকারী, সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক কাম অফিস সহকারী, কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং প্লেইন পেপার কপিয়ার পদের নিয়োগে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয়ে থাকে।

এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৭০ এর মধ্যে বাংলায় ২০, ইংরেজিতে ২০, গণিতে ১৫ এবং সাধারণ জ্ঞানে ১৫ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

আর ৩০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় বিভিন্ন অধিপ্তর, পরিদপ্তর বা দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায়।

এসব পদের নিয়োগপ্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি কম্পিউটার ওয়ার্ড প্রসেসিং, ই-মেইল, ফ্যাক্স মেশিন ইত্যাদি চালানোর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাও থাকতে হয়।

এক্ষেত্রেও এই পদের নিয়োগপ্রার্থীদের বাংলা, ইংরেজি টাইপিংয়ের কম্পিউটার বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়।

এই দুই বিষয়ে একেক পদে ভিন্ন ভিন্ন নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয়।

যেমন- সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে ২০০ নম্বরের বাংলা ও ইংরেজি টাইপিং পরীক্ষা হয়। সর্বনিম্ন ৪০ নম্বর পেয়ে পাস করতে হবে।

এই পরীক্ষায় বাংলায় টাইপিং এর গতি প্রতি মিনিটে সর্বনিম্ন ৫০ শব্দ এবং ইংরেজিতে সর্বনিম্ন ৮০ শব্দ টাইপ করতে হবে।

আবার উচ্চমান সহকারী পদে এই যোগ্যতা ভিন্ন।

এই পদের প্রার্থীকে বাংলা ও ইংরেজিতে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয়। পাস নম্বর ৪০।

এই পদের প্রার্থীকে প্রতি মিনিটে বাংলায় সর্বনিম্ন ২৫ শব্দ এবং ইংরেজিতে সর্বনিম্ন ৩০ শব্দ টাইপ করতে হবে।

এছাড়া অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বা এই ধরনের পদের প্রার্থীকে ৫০ নম্বরের কম্পিউটারের এই পরীক্ষা দিতে হয়।

একইসঙ্গে, ২০তম গ্রেডের ফটোকপি অপারেটর, অফিস সহায়ক, ডেসপাচ রাইডার পদের নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক নিয়ে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৭০ এবং ৩০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয় একেকজন প্রার্থীকে।

তবে, ২০১৩ সালেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদের নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বন্টন করা ছিল না।

সেসময় কোনো কোনো নিয়োগ বিধিমালায় শুধু লিখিত পরীক্ষার নম্বর নির্ধারিত থাকত। কোনো পদে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হত।

অর্থাৎ পরীক্ষা পদ্ধতি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বন্টনের হারের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এমনকি একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় না থাকায় ২০১৩ সালের পাঁচই মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আগের বিধিমালায় পরিবর্তনের কথা জানায়।

তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে ৭০ শতাংশের লিখিত এবং ৩০ শতাংশ মৌখিক পরীক্ষা রেখে সংশোধনী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তখন।

লাইন ধরে বসে আছেন পরীক্ষার্থীরা

ছবির উৎস, Getty Images

যে পরিবর্তন হতে যাচ্ছে

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিভিল প্রশাসনে সরকারি কর্মচারীদের পদ আছে প্রায় ২০ লাখ।

এর মধ্যে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সোয়া ১৩ লাখ।

বর্তমানে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভায় ১০ নম্বরের বদলে তিন ভাগে ২৫, ৪০ ও ৫০ নম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়েছে।

সরকারি প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১তম ও ১২তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে মোট ১৫০ নম্বরের পরীক্ষা হবে।

এর মধ্যে, লিখিত পরীক্ষায় ১০০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৫০ নম্বর থাকবে।

এই দুই গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভায় ১০ নম্বরের পরিবর্তে ৫০ নম্বরের প্রস্তাব করা হয়েছে।

একই গ্রেডের লিখিত পরীক্ষায় ৯০ নম্বরের পরিবর্তে ১০০ নম্বর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই গ্রেডে বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাস করতে হয়, প্রস্তাবিত বিধিমালায় সেটি ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আর মৌখিক পরীক্ষায় পাস নম্বর ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান বিধিমালায় ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভা ১০ এবং ৯০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দিতে হয়।

প্রস্তাবিত বিধিমালায় এসব গ্রেডে ৪০ নম্বরের ভাইভা এবং ৬০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ হলেও প্রস্তাবিত বিধিমালায় কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে।

১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে আগের মতোই মোট ৫০ নম্বরের পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি।

কিন্তু বর্তমান বিধিমালায় এই গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় প্রার্থীদের ৪০ নম্বরের লিখিত এবং ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয়।

প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালায় লিখিত পরীক্ষায় ২৫ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ২৫ নম্বর রাখা হয়েছে।

এই পদের প্রার্থীদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান এবং সংশ্লিষ্ট টেকনিকেল পরীক্ষায় পাঁচ নম্বরের পরীক্ষা হবে।

এদিকে, জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় যখন লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমে এবং মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ে, তখন সেখানে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ বেড়ে যায়।

এর আগে, ২০০৩ সালের বিএনপি সরকারের আমলে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার নম্বর একবার কমিয়ে ৬০ করা হয়েছিল এবং মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে ৪০ করা হয়েছিল।

পরে নানা অনিয়মের মুখে এই মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ২০ করা হয়েছিল। এই ২০ এর মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ফলাফলের জন্য পাঁচ নম্বর বরাদ্দ করা হয়।

সাবেক স্থানীয় সরকার সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়লে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

“ভাইভা পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে দিলে যারা মৌখিক পরীক্ষা নেবেন, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যাবে, তাদের ওপর থেকে প্রভাবান্বিত করা যাবে এবং ভেতর থেকেও অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য এটাকে ব্যবহার করা যাবে,” বলেন তিনি।

সাবেক এই সচিব মনে করছেন, লিখিত পরীক্ষায় ৮০ নম্বরের নিচে থাকা উচিত নয়।

“মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানো মানে অন্যায়, অনিয়মের ও দুর্নীতির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করা” বলেন মি. খান।