Source : BBC NEWS

বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর খসড়ায় থাকা কিছু প্রস্তাবনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এগুলো আইনে শেষ পর্যন্ত বহাল থাকলে ‘সাইবার স্পেস নজরদারি ও জবাবদিহিহীন নিপীড়নের ভুবনে’ পরিণত হবে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খসড়াটি এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে এবং সরকার এটিকে এমনভাবে তৈরি করতে চায় যাতে আইনটি ভবিষ্যতে কোনো ধরনের হয়রানির কাজে অপব্যবহার না হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত জুনে জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার রোধে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ রহিত করে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছিল।
পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ নামে পাশ হলেও তখনি সরকারের দিক থেকে পরবর্তীতে আইনে আরও সংশোধনী আনার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল।
সে অনুযায়ী সরকারের দিক থেকে একটি খসড়া প্রস্তুত করে তার ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ অংশীজনদের সাথে আলোচনা শুরু করেছে সরকার। খসড়াটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর বিল আকারে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আজ বলেছেন, এ আইনটির মূল লক্ষ্য হবে ডিজিটাল স্পেসে শালীনতা ফিরিয়ে আনা, নারী ও তরুণদের সাইবার বুলিং থেকে রক্ষা করা এবং একই সাথে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাতে আইনের কোনো ধরনের অপব্যবহার না ঘটে।
কিন্তু এর মধ্যেই সংশোধনীর প্রস্তাবিত খসড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ বিভিন্ন পক্ষ।
ছবির উৎস, Getty Images
কী আছে খসড়ায়, উদ্বেগ কেন
সরকারের মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করে আলোচনার জন্য আইনের যে খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে তা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেছেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। এরপরেই সংশোধনীর খসড়ার বিষয়টি সামনে আসে।
এরপর ওই খসড়াটির সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান।
তার মতে, খসড়ায় সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার সম্পর্কিত তিনটি বিষয় একই আইনে অন্তর্ভুক্ত করে তিনটির কোনোটিতেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
ওই খসড়ায় বলা হয়েছে, যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মন্ত্রণালয় কিংবা অন্য সংস্থা বা বাহিনী কাছে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ সাপেক্ষে বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে, সাইবার স্পেস বা ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য, অপতথ্য বা গুজব দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণ করে কিংবা ক্ষুণ্ণ করার আশংকা থাকে, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা বা জাতিগত সহিংসতা তৈরির উদ্রেক করে বা করার আশংকা থাকে, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা প্রদান করে বা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানহানিকর বা রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর হয়- তাহলে সরকারি বাহিনী বা সংস্থা সেসব তথ্য উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
খসড়ায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের কথা বলা হয়েছে, যাতে সরকারের পাঁচজন মন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা থাকবেন। তবে এতে দুইজন বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ থাকার কথা বলা হয়েছে, যারা সরকার মনোনীত হবে।
এই কাউন্সিল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, “এখানে পুরো বিষয়ই সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হবে। সরকার নিজেই তো সাইবার স্পেসের ব্যবহারকারী। ফলে স্বার্থের সংঘাতেরও ঝুঁকি আছে”।
খসড়ায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাক-মেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ ও মানহানিকর তথ্য সংক্রান্ত অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এর আওতায়, এডিটেড বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি করা তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এছাড়া যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ণ, ডিজিটাল শিশু নিপীড়ন সংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শন , মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন বা বুলিং করার মতো বিষয়গুলোর জন্য তথ্য, অডিও, ভিডিও, গ্রাফিকস, স্থিরচিত্রও শাস্তির আওতায় আসবে।
তবে ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, “যৌন হয়রানি ও সেক্সটর্শনের যে সংজ্ঞা খসড়ায় রাখা হয়েছে তা খুবই অপেশাদার। একেবারেই ইচ্ছেমতো এটি সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যৌন হয়রানির যে সংজ্ঞা আদালতের দেওয়া আছে সেটিকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে মূল যৌন হয়রানিকে টার্গেট না করে কেউ অপরাধী না হলেও তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস হতে পারে”।
ছবির উৎস, AFP
খসড়ায় ‘মানহানি’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’ ও ‘বুলিং’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে সেটিও সুনির্দিষ্ট হয়নি বলে সমালোচনা উঠছে। এছাড়া খসড়ায় গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করাকে দশ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
এখানে গুজবের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “গুজব অর্থ এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে”।
আর অপতথ্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “অপতথ্য অর্থ এমন কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা হয়”।
খসড়ায় সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, খসড়ায় সাইবার অপরাধের সাথে সাইবার সুরক্ষা মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রকে একাকার করার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণমূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তার মতে, “খসড়াটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস একটি অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিহীন নিপীড়নমূলক ভুবনে পরিণত হবে”।
“আইনে গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন, মানহানিকর, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকরসহ বেশ কিছু ধারণাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যার ফলে ইচ্ছাকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে টার্গেটেড অপব্যবহার বিশেষ করে বাক স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ করার ঝুঁকি তৈরি করা হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন ডঃ ইফতেখারুজ্জামান।
এছাড়া খসড়ায় অজামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে মতো বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় এগুলো ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হতে পারে বলেও আশংকা প্রকাশ করেছেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলছেন, খসড়ায় এমন কিছু বিষয় রাখা হয়েছে যা খুবই উদ্বেগজনক কারণ এগুলোর মাধ্যমে আগেও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
“ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বা সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট যেসব ধারা ব্যবহার করে ব্যাপক অপব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলো অধ্যাদেশে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন খসড়ায় সেগুলো আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এগুলো আগে ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করা হয়েছিল,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
ছবির উৎস, Getty Images
মিজ চৌধুরী বলেন, খসড়ায় গুজব বা অপতথ্য-র মতো বিষয়গুলো ইচ্ছেমতো সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে অথচ আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বলেছে মিসইনফরমেশন বা ডিসইনফরমেশনকে ক্রিমিনালাইজ করা যাবে না।
” কোনটা মিসইনফরমেশন বা কোন ডিসইনফরশন তা নির্ধারণ করার সক্ষমতা তো নেই। সে কারণে সবসময় সঠিক তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এগুলোকে মোকাবেলার কথা বলা হয়,” বলছিলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডঃ বি এম মইনুল হোসেন বলছেন, খসড়ায় কিছু ক্ষেত্রে কার্যত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে, অথচ এগুলো নিয়েই দীর্ঘকাল ধরে প্রতিবাদ ও সমালোচনা হয়েছে।
“এখানে নিরপরাধ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যে রক্ষাকবচ ছিল সেগুলোকেও বাদ দেওয়ার উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি। মানহানি, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর- এমন অনেক বিষয়কে আনা হয়েছে যেগুলো মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করবে। কারণ মানুষ এখন সাইবার স্পেসেই মত প্রকাশ করে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
যদিও বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সাথে আলোচনার পর তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেছেন, বিষয়টি এখনো ড্রাফটিং ও আলোচনার পর্যায়ে। তিনি বলেন, আইনটি যেন এমনভাবে ড্রাফট করা হয় যাতে ভবিষ্যতে কেউ এটাকে হয়রানি করার জন্য ব্যবহার না করতে পারে।
“গণতন্ত্রের নামে গালিগালাজ বা অ্যাবিউজ কিভাবে আইনের আওতায় আনা যায় আবার মিডিয়ার ফ্রিডম যেন ঠিক থাকে—দুটো যেন সাংঘর্ষিক না হয় সেটি নিশ্চিত করতেই আমরা আলোচনা করছি,” বলেছেন তিনি।
ওদিকে আজ ঢাকায় আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইন্সটিটিউট (আইআরআই)-এর একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই বৈঠকে সাইবার অপরাধ ও অনলাইন বুলিং প্রতিরোধ এবং প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
“সরকার নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রতিটি নাগরিকের মতপ্রকাশ ও গঠনমূলক সমালোচনার অধিকার রয়েছে। তবে গঠনমূলক সমালোচনা আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চরিত্রহনন বা গালিগালাজ এক নয়,” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।




