Home LATEST NEWS BANGLA সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের পর মৃতদেহও ফেরত পাচ্ছে না প্রবাসীদের পরিবার

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের পর মৃতদেহও ফেরত পাচ্ছে না প্রবাসীদের পরিবার

5
0

Source : BBC NEWS

একটি সম্পাদিত ছবিতে দাড়ি-গোঁফ কামানো দুই তরুণ ইথিওপিয়ান।

ছবির উৎস, Handout/BBC

“পরিবার হিসেবে সান্ত্বনা পেতে আমরা এই সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা করেছি। কিন্তু আমি আমার সান্ত্বনা পাবো না,” বলছিলেন কিনফে আরেগাউই নামের একজন বাবা, যিনি তার ছেলে কিব্রমের জন্য শোক জানাচ্ছিলেন।

“এটি আমার জন্য সারাজীবনের দুঃখ হয়ে থাকবে।”

সৌদি আরবে গাঁজা পাচারের দায়ে চলতি বছরের জুনে যে পাঁচজন ইথিওপিয়ানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, কিব্রম কিনফে আরেগাউই ছিলেন তাদের একজন।

বিশ্বের যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, চীন ও ইরানের পরই সেখানে ধারাবাহিকভাবে সৌদি আরবের অবস্থান।

কিনফের মতো অনেক ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের বিশ্বাসের একটি অপরিহার্য উপাদান হলো আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মীয় নিয়মে সমাহিত করা।

২৫ বছর বয়সী এই তরুণের শেষকৃত্য এভাবে করা সম্ভব হয়নি, কারণ তার মৃতদেহ দেশে তার পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়নি।

একটি অর্থোডক্স খ্রিস্টান শেষকৃত্য তুলে ধরা হয়েছে এমন একটি ইলাস্ট্রেশন। একদল মানুষ একটি খালি কফিনের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। কফিনের সামনে একজন মানুষের ছবি রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর তথ্যমতে, ২৭শে জুলাই পর্যন্ত এক বছরে সৌদি আরব ১১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।

“মৃতদেহ ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানানো কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়। এটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবারকেও শাস্তি দেয়া,” বলছেন ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর)-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের রক্ষায় কাজ করা দাতব্য সংস্থা রিপ্রিভ মেনা (মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা)-র কেসওয়ার্ক কনসালট্যান্ট দুয়া ধাইনি।

ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক নাজিলা ঘানেয়া সৌদি আরবের মৃতদেহ আটকে রাখার এই অভিযোগকে “নির্যাতন ও নিপীড়ন” বলে বর্ণনা করেছেন।

স্বজনরা বলছেন, দক্ষিণ সৌদি আরবের আসির প্রদেশের খামিস মুশাইত কারাগারে ২৩শে জুন যে পাঁচজন ইথিওপিয়ানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তারা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে আগে থেকে কোনো সতর্কবার্তা পাননি, এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাদের পরিবারকে তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বা মৃত্যুর সনদপত্রও দেওয়া হয়নি।

একজন নারী বসে আছেন, তার পিঠ একটি পাথরের দেয়ালে হেলান দেওয়া। তিনি একটি সাদা শাল এবং বেগুনি রঙের হেডস্কার্ফ পরে আছেন।

ছবির উৎস, Mebrahtom

কিব্রম প্রথমবার ২০২০ সালে বৈধ ভিসা ছাড়াই তার বাবার সাথে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সেবার তাদের গ্রেপ্তার করে ১৫ মাস কারাগারে রাখার পর দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।

তবে ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে কিব্রমআবার সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। লোহিত সাগর পাড়ি দিতে তিনি প্রথমে একটি অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকায় ওঠেন, এরপর পায়ে হেঁটে ইয়েমেন পাড়ি দেন।

২০২৩ সালে সীমান্ত পার হওয়ার সময় সৌদি কর্তৃপক্ষ কিব্রমকে আবারও গ্রেপ্তার করে এবং তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ আনে। তার বাবা কিনফে বলেন, তিন মাস কারাগারে থাকার পর তার ছেলেকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর তিন বছর কারাগারে কাটানোর পর জুনে হঠাৎ করেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

“সে আমাদের সাথে কথা বলারও সুযোগ পায়নি,” কাঁদতে কাঁদতে বলেন কিনফে। “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি তার মৃত্যুর খবর জানতে পারি,” তিনি বিবিসিকে বলেন।

কিনফে বিশ্বাস করেন যে তার ছেলে নির্দোষ এবং সৌদি আরবে তাকে অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

কিনফে বলেন, “আমার ছেলে হাশিশ (মাদক) পাচারের সাথে জড়িত ছিল এমন কোনো প্রমাণ নেই।”

“কেউ আমাকে তার মৃত্যুর সনদপত্র, তার কোনো জিনিসপত্র বা মৃতদেহ দেয়নি। আমি শুধু নিরবে কাঁদি । আমি আর কীই বা করতে পারি?”

কবর ও ক্রুশসহ একটি কবরস্থানের ছবি সম্বলিত একটি ইলাস্ট্রেশন।

একই দিনে এবং একই কারাগারে সিগাবু গেব্রেমারিয়ামকেও একই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

ইথিওপিয়ার সেন্ট্রাল তিগ্রায় অঞ্চলের একটি গ্রামীণ জেলার আট ভাইবোনের মধ্যে ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ ছিলেন সবার বড়।

তার বাবা হাগোস গেব্রেমেস্কেল বলেন, ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর দারিদ্র্য ও গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে সে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

হাগোস বলেন, “আমাদের এলাকায় তরুণদের জন্য তেমন কোনো কাজ নেই। আমাকে সাহায্য করার জন্যই সে সৌদি আরবে গিয়েছিল।”

সিগাবু মাদক পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাড়ে তিন বছর কারাগারে কাটিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে শেষবার তার পরিবারের সাথে কথা হয়।

হাগোস বিবিসিকে বলেন, “সে বলেছিল সে শিগগিরই [দেশে] ফিরে এসে বিয়ে করবে।”

তার মা, লেতেখ্রিস্টোস ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ছেলের শেষকৃত্যের আয়োজন করতে হলো।

তিনি বলেন, “আমার সব সন্তান মেয়ে, সে-ই ছিল একমাত্র ছেলে। বোনদের অনেক আশা ছিল যে তাদের ভাই শিগগিরই বাড়ি ফিরে আসবে। তারা তার জন্য বিয়ের গান বানাচ্ছিল। এখন, তাদের কষ্ট আমার চেয়েও বেশি।”

একটি ছোট কারাগারের সেলে এক ব্যক্তি হাত গুটিয়ে বসে আছেন। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন, তার পরনে হাফ-হাতা গাঢ় নীল রঙের ইউনিফর্ম।
স্বত্ব: পরিবার সরবরাহ করেছে

ছবির উৎস, Family supplied

সৌদি আরবে বসবাসকারী আত্মীয়দের কাছ থেকে সিগাবুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানার পর, তার অর্থোডক্স খ্রিস্টান পরিবার তাদের স্থানীয় গির্জায় একটি প্রতীকী শেষকৃত্য এবং প্রার্থনার আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রথাগত ৪০ দিনের শোক পালন করা লেতেখ্রিস্টোস বলেন, “আমি জানতে চাই কেন তার মৃতদেহ দেশে আসেনি। এটি আমাদের শোককে আরও ভারী করে তুলেছে, আমাদের হৃদয় ভেঙে দিচ্ছে।”

সিগাবুর বাবা-মা চান সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের ছেলের অপরাধের প্রমাণ দিক। তারা ভাবছেন যে অন্য কেউ তার সরলতার সুযোগ নিয়েছে কিনা।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গত বছর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক সংক্রান্ত অপরাধে যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাদের ৭৫ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। ধাইনি মনে করেন, দুর্বল ব্যক্তিদের অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো ব্যবহার করে থাকে।

ধাইনি ব্যাখ্যা করেন, “ইথিওপিয়ার কিছু ক্ষেত্রে, আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে সীমান্ত পার হতে সাহায্য করার বিনিময়ে তাদের বিভিন্ন জিনিসপত্র বহন করতে প্ররোচিত করা হয়েছিল, অন্যদিকে আমরা এমন কিছু পাকিস্তানি ব্যক্তিদের নথিবদ্ধ করেছি যাদেরকে নিষিদ্ধ পদার্থ গিলতে বাধ্য করা হয়েছিল, কখনো কখনো জোরজুলুম করে বা চাকরির প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে।”

একটি পাথরের দেয়াল এবং ঢেউতোলা টিনের তৈরি বিভাজকের সামনে চেয়ারে বসা এক ব্যক্তি। তিনি একটি নীল শার্ট পরা।

ছবির উৎস, Mebrahtom

ইএসওএইচআর-এর হিসেব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজা সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ সিংহাসনে আরোহণের পর থেকে সৌদি আরবে মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ২,০০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৪২ শতাংশই বিদেশি।

সংস্থাটি হিসেব করেছে যে সৌদি আরব ২০২৫ সালে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, যা এখন পর্যন্ত এক বছরে মৃত্যুদণ্ডের রেকর্ড।

সৌদি আইনে দূতাবাসের খরচে মৃতদেহ দেশে ফেরত পাঠানোর অনুমতি আছে, তবে ধাইনি বলছেন সেটা কখনোই ঘটে না।

তিনি বলেন, “মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো অভিবাসী নাগরিকের মৃতদেহ তাদের পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। সৌদি নাগরিকদের ক্ষেত্রে আমাদের নথিবদ্ধ করা ঘটনাগুলোতেও একই ব্যাপার দেখা গেছে।”

অতীতে কিছু পরিবার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের – যাদের মধ্যে তুর্কি ও জর্ডানের নাগরিকরা আছেন – মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে প্রচারণাও চালিয়েছে, কিন্তু কোনো সাফল্য আসেনি বলে জানান ধাইনি।

তিনি বলেন, “জর্ডানের পরিবারটিকে দেওয়া মৃত্যুর সনদপত্রটি ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত। এতে মৃতদেহ কোথায় সমাহিত করা হয়েছে বা কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে সেসব তথ্য ছিল অনুপস্থিত।”

সোফায় বসা চশমা পরা এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি, তার মাথায় একটি লাল টুপি।

ছবির উৎস, Kinfe Aregawi

বিবিসি সৌদি সরকারের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং লন্ডনের দূতাবাসের মাধ্যমে এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সৌদি কর্তৃপক্ষ মাদক সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় কথা বলে থাকে।

জুনে গাঁজা সংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত এক সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করার সময়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতিতে কোরআনের আয়াত উল্লেখ করা হয়, যেখানে যারা “পৃথিবীতে বিপর্যয়” সৃষ্টি করে তাদের কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকার “নাগরিক ও বাসিন্দাদের মাদকের অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে এবং মাদকের কারণে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ও ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টির কারণে, মাদক পাচারকারী ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনে নির্ধারিত কঠোরতম শাস্তি আরোপে” প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সৌদি আরবের ইথিওপিয়ান দূতাবাসের কাছেও মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে।

বর্তমানে কতজন বন্দী মৃত্যুদণ্ডের প্রহর গুনছেন তা সৌদি আরব প্রকাশ করে না, তবে মানবাধিকার কর্মীদের মতে এই সংখ্যা শত শত হতে পারে।

এইচআরডব্লিউ-এর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের গবেষক জোয়ি শিয়া বলেন, “সৌদি আরবে গোপনে বা কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়া যেসব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তা বন্দীদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘন করে।”

গাদাগাদি করে বসবাস করার কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরা বন্দীতে পরিপূর্ণ একটি কারাকক্ষের ইলাস্ট্রেশন।

অলৌকিক ঘটনার জন্য প্রার্থনা

এই গোপনীয়তা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের জীবনকেও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে।

নিরাপত্তার কারণে যার অবস্থান এবং পরিচয় প্রকাশ করা যাচ্ছে না এমন এক বন্দী বিবিসিকে তার কারাবাসের অবস্থা সম্পর্কে জানিয়েছেন।

২০২৩ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং মাদক পাচারের অভিযোগ স্বীকার করেন। তিনি বলেন যে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি ক্ষমার আশা করছেন।

এই বছর তিনি তার ১৫ জন সহবন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখেছেন এবং এখন মৃত্যুদণ্ডের সার্বক্ষণিক আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

“প্রতিবার যখন রক্ষীরা দরজা খোলে, আমরা ভাবতে থাকি এরপর কার পালা আসবে।”

তিনি একটি অলৌকিক ঘটনার – একটি মুক্তির – জন্য প্রার্থনা করছেন। কিন্তু যদি সবচেয়ে খারাপ পরিণতিই ঘটে, তবে তিনি চান তার মৃতদেহ যেন দেশে পাঠানো হয়।

“আমি চিন্তায় থাকি যে আমার বাবা-মা হয়তো আমার মৃতদেহটাও দেখতে পারবেন না।”