Home LATEST NEWS BANGLA আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দেশজুড়ে পুলিশের সর্তকতার কারণ কী?

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দেশজুড়ে পুলিশের সর্তকতার কারণ কী?

2
0

Source : BBC NEWS

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ঢাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN/AFP via Getty Images

বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘অবনতির’ আশঙ্কার কথা বলছে পুলিশ। এ জন্য সারাদেশে পুলিশ সদস্যদের ‘প্রয়োজনীয় সতর্কতার’ পাশাপাশি ‘নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা’ নিতে নির্দেশনাও দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তরের ‘গোপনীয়’ একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী ২৩শে জুন ‘নিষিদ্ধ সংগঠন’ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার নিয়ে প্রকাশ্যে মিছিল হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে, দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজি বরাবর পাঠানো ওই বার্তায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির ‘সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন’ করার কথা বলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে কোনো হুমকি রয়েছে কি-না, শনিবার একটি সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে।

জবাবে তিনি বলেছেন, “২৩শে জুনকে টার্গেট করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে একটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল দেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে, সেজন্য পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে”।

পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠি পাওয়ার পর ঢাকার এরই মধ্যে সবগুলো থানায় সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নাশকতার আশঙ্কায় ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে। তল্লাশি অভিযান শুরু করা হয়েছে। থানায় থানায় বিশেষ সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে যে চিঠিটি দেওয়া হয়েছে, সেখানে সুনির্দিষ্ট করে এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সাথে সংঘর্ষেরও আশঙ্কা করেছে পুলিশ।

এর জবাবে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, যে জায়গাগুলোতে আওয়ামী লীগ নাশকতার চেষ্টা করবে সেখানে সজাগ দৃষ্টি রাখবে এনসিপি।

এদিকে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই কর্মসূচি ঘিরে গত কয়েকদিনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে ছোটখাটো মিছিলও করতে দেখা গেছে।

দলটির নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের মতো কর্মসূচির মধ্য দিয়ে “সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করবে” তাদের দল।

শনিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ছবির উৎস, SCREEN GRAB

২৩শে জুন কী করতে পারে আওয়ামী লীগ?

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১১ই মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনও দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।

দলটির নেতাকর্মীদের কেউ কেউ মনে করেছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগ হয়তো কিছু কার্যক্রমের সুযোগ পাবে।

কিন্তু নির্বাচনের পর দেখা গেছে, তেমনটা ঘটেনি; বরং বিএনপি সরকারের সময়ে এসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী বিলও সংসদে পাস হয়ে গেছে।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই আছেন আত্মগোপনে। কেউ কেউ গ্রেফতার অবস্থায় কারাগারেও রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২৩শে জুন বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী।

এই কর্মসূচিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সরব দেখা গেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির নেতাকর্মীদের। অন্যদিকে, গত কয়েকদিনে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে মুখে মাস্ক পড়ে ছোট ছোট মিছিলও বের করতে দেখা গেছে নেতাকর্মীদের।

আগামী ২৩শে জুন মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিনে আসলে কী করতে চায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ, এমন প্রশ্ন ছিল আত্মগোপনে থাকা দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের কাছে।

জবাবে তিনি বলেছেন, দলটি বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এবং সেগুলো সফল করতে “দলীয় নেতাকর্মীরা যখনই সক্রিয় হয়েছে তখনই তাদের গণগ্রেফতার করা হচ্ছে”।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের চিঠি

ছবির উৎস, COLLECTED

সরকারের হুঁশিয়ারি, নিরাপত্তা জোরদার

গত ১৮ই জুন বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি মো. কামরুল আহসানের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে বলা হয়, “দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলনে এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার নিয়ে প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে আওয়ামী লীগ”।

দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজি বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে আওয়ামী লীগের এই কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপর তারা “ক্ষুব্ধ হতে পারে” বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে।

শনিবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন “আমরা রাজনৈতিকভাবে বলি- এটা কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটা একটা মাফিয়া পার্টি। তারা বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে পুলিশ বাহিনী তার দায়িত্ব পালন করবে”।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এ সংক্রান্ত চিঠি তারাও পেয়েছেন।

তিনি জানান, চলতি সপ্তাহে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু না, আশুরাও পালিত হবে সামনে (আগামী শুক্রবার)। এই কারণে ঢাকায় যেন কোনো ধরনের কিছু অপ্রীতিকর কিছু না হয় সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কর্মকর্তা মি. ইসলাম বলেন, “সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে আমাদের রেগুলোর পুলিশি কার্যক্রমের পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে। বিভিন্ন হোটেল মোটেলে ব্লক রেড হচ্ছে। যারা চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদেরকেও খোঁজা হচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি”।

পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার ঢাকার মহাখালীতে একটি ঝটিকা মিছিল বের করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণেরও ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

এদিকে, ঢাকার দুইটি থানার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সাথেও কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের এই কর্মসূচিকে ঘিরে ঢাকায় যেন মিছিলসহ কোনো ধরনের কর্মসূচির পালন করতে না পারে সেদিকে নজরদারি রাখতে পুলিশকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ডিএমপির পক্ষ থেকে।

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে

ছবির উৎস, BBC/MUKIMUL AHSAN

কোন প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করবে সরকার?

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে শুধু নিষেধাজ্ঞা না, ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানেও দেখা গিয়েছিল।

তবে, চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে কিছুটা সরব হয়ে ওঠে।

রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় মিছিল, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ‘শপথ’ নিতে দেখা গেছে দলটির নেতাকর্মীদের।

গত কয়েকদিন আওয়ামী লীগ কর্মী সমর্থকদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন প্রচারণাও চালাতে দেখা গেছে যে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসবে শিগগিরই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও সারাদেশে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো সক্রিয় রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও আওয়ামী লীগ তাদের উপস্থিতি জানান দিতে সক্রিয় হয়ে উঠছে। এটা তাদের রাজনীতিরই অংশ”।

তবে, সরকার এই কার্যক্রমকে আইনিভাবে নাকি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তিনি।

অধ্যাপক ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “আওয়ামী লীগ কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করলে সেটিকে মোকাবিলা করার দুইটি জায়গা রয়েছে। প্রথমত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় যখনই তারা কোনো কর্মসূচি পালন করবে সেটি আইন প্রয়োগ করে সরকার মোকাবিলা করতে পারে”।

“একই সাথে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এই কার্যক্রমগুলোকে সরকারি দলের মোকাবিলা করতে গেলে তাদের একটা রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে,” যোগ করেন তিনি।

যদিও শনিবার সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্টতই আইনি দিকটিতেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যে চিঠিতে সর্তকতা দেওয়া হয়েছে সেখানে আওয়ামী লীগের এই কর্মসূচিকে ঘিরে বিদ্যমান অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এনসিপির নেতাকর্মী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সাথে সংঘর্ষ তৈরির আশঙ্কাও করা হয়েছে।

যে কারণে এনসিপি এই বিষয়ে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গ্রুপের তথ্য ফাঁস হলে সেখানে দেখতে পাই তাদের ক্ষোভ এনসিপির প্রতি। যদি এমন কিছু থাকে তাহলে আমরা আশা করবো সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে”।

এমন পরিস্থিতিতে কী মাঠে নেমে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করবে ছাত্রদের নতুন এই রাজনৈতিক দলটি?

জবাবে এনসিপি নেতা মি. মাহমুদ বলেছেন, সাধারণত ঢাকার যেই জোনগুলোতে আওয়ামী লীগ নাশকতা করার চেষ্টা করে, সেই জোনগুলোতে এনসিপি নেতাকর্মীরা সজাগ দৃষ্টি রাখবে।