Home LATEST NEWS BANGLA ‘আসসালামু আলাইকুম’-‘ইনশাআল্লাহ’ বলা ঘিরে বিতর্কের জেরে পশ্চিমবঙ্গে নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলির অভিযোগ

‘আসসালামু আলাইকুম’-‘ইনশাআল্লাহ’ বলা ঘিরে বিতর্কের জেরে পশ্চিমবঙ্গে নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলির অভিযোগ

4
0

Source : BBC NEWS

২০২১ সালের আইপিএস (ভারতীয় পুলিশ সার্ভিস) কর্মকর্তা বুশরা বানো - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Bushara Bano’s Facebook page

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ এবং ‘জাযাকাল্লাহ’-র মতো ইসলামি অভিবাদন ও শব্দ ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের মধ্যে বদলি করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ কর্মকর্তা বুশরা বানোকে।

সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখের সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২১ সালের আইপিএস (ভারতীয় পুলিশ সার্ভিস) কর্মকর্তা মিজ. বানোকে পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের পদ থেকে সরিয়ে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের চতুর্থ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমান্ডান্ট করা হয়েছে।

একই বিজ্ঞপ্তিতে আরও দু’জন পুলিশ কর্মকর্তার বদলির কথা বলা হয়েছে। সরকারি আদেশে এই রদবদলকে ‘জনস্বার্থে’ করা একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তারা এই বিজ্ঞপ্তি ‘রুটিন ট্রান্সফার’ বললেও, ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর দাবি, মিজ. বানোকে অন্যায়ভাবে ‘গ্যারেজ পোস্টিং’ দেওয়া হয়েছে; অর্থাৎ এমন একটি পদে পাঠানো হয়েছে, যা তার আগের দায়িত্বের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ।

কয়েকদিন আগে মিজ. বানোর একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে তাকে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়।

তিনি বলেন, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক কোচিং একাডেমি সংখ্যালঘু, নারী এবং তফশিলি জাতি ও উপজাতিদের সহায়তা দেয়। একজন প্রাক্তনী হিসেবে তিনি আরও জানান, তার পড়াশোনা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এই কোচিং একাডেমি অনেক সহায়তা করেছে।

ওই ভিডিওতে তার বক্তব্যকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হয়। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, একজন ইউনিফর্ম পরা সরকারি কর্মকর্তা প্রকাশ্য বক্তব্যে ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ এবং ‘জাযাকাল্লাহ’-র মতো ধর্মীয় অভিব্যক্তি ব্যবহার করতে পারেন কি না এবং ‘জয় হিন্দ’ বা ‘বন্দে মাতরম’-এর মতো অভিবাদন কেন ব্যবহার করেননি।

'হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড' নামে একটি সংগঠন পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে বুশরা বানোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে

ছবির উৎস, Bushara Bano’s Facebook page

‘আসসালামু আলাইকুম বা ইনশাআল্লাহ কেন, জয় হিন্দ বা বন্দে মাতরম কেন নয়?’

এই ভিডিওর সত্যতা যাচাই না করা গেলেও, বুশরা বানোর নিজের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট হিসেবে ভিডিওটির উল্লেখ রয়েছে নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রের একটি প্রতিবেদনে। এখন মিজ. বানোর সামাজিক মাধ্যমে এই ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে না।

সুদর্শন নিউজ, জয়পুর ডায়ালগস-সহ কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী প্ল্যাটফর্মেও ভিডিওটি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়।

‘হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড’ নামে একটি সংগঠন ১৩ই সেপ্টেম্বর এক্স-এ জানায়, তারা পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে বুশরা বানোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দাবি করছে।

চলতি মাসের ১৩ তারিখ হিন্দু লিগ্যাল ফান্ডের এক্স হ্যান্ডেলে লেখা হয় – “তিনি তার বক্তব্য ‘আসসালামু আলাইকুম’ দিয়ে শুরু করেন, ‘ইনশাআল্লাহ’ ব্যবহার করেন এবং ‘জাযাকআল্লাহ’ বলে শেষ করেন, কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘জয় হিন্দ’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেননি।

“ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী একজন চাকরিরত কর্মকর্তার উচিত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং জনসমক্ষে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জাতীয় ভাবনার প্রতিফলন ঘটায় এমন শব্দ ব্যবহার করা। এ বিষয়ে যথাযথ পর্যালোচনা ও পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হচ্ছে,” লেখা হয় ওই পোস্টে।

এর পরদিনই, ১৪ই সেপ্টেম্বর, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে বুশরা বানোর বদলির বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। এই সময়ের ব্যবধানের কারণে বদলির সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অভিযোগের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে এই ট্রান্সফার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বিবিসিকে বলেন, “এই ধরনের রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং তা যে-কোনো সময়েই করা হয়ে থাকে। এই বদলির আদেশের সঙ্গে কোনো সাম্প্রতিক বিতর্কের কোনো যোগসূত্র আছে কি না- সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না।”

ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Asian News International

একজন মুসলিম নারী বলে এই পদক্ষেপ- দাবি বিরোধীদের

একদিকে যেমন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সামাজিক মাধ্যমে মিজ. বানোর বক্তৃতা নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করছে, অন্যদিকে অনলাইনে একাধিক মুসলিম গোষ্ঠী তার ট্রান্সফার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

মিজ. বানোর ভাইরাল ভিডিওর পাশাপাশি এখন অন্যান্য রাজ্যের একাধিক পুলিশ অফিসারদের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছে যেখানে ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় তাদের পূজার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। সেগুলো নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক। যদিও এই ভিডিওগুলোর সততা যাচাই করেনি বিবিসি।

পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী বিধায়ক মি. সিদ্দিকী প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে বিজেপি সরকার এক দিকে মুসলিম নারীদের অধিকারের কথা তুলে রাজ্যে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের প্রস্তাব তুলছে, যখন একজন ‘শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত সম্মানের সঙ্গে চাকরি করছেন’ এমন মুসলিম নারীর ‘অন্যায়ভাবে’ ট্রান্সফার হচ্ছে।

তার দাবি, “তিনি শুধু তিনটি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যে শব্দে অন্য কোনো ধর্মের মানুষের আঘাত লাগবে না, যে শব্দ দেশবিরোধী নয়।”

রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম বা মিম) -এর মুখপাত্র এবং প্রাক্তন বিধায়ক ওয়ারিশ পাঠান সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তায় ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলছেন, “উনি একজন মুসলিম আইপিএস অফিসার বলে, একজন নারী বলে, আপনারা ওনাকে ট্রান্সফার করে দিয়েছেন?”

তিনি আরো বলছেন, “আমরা দেখেছি ইউনিফর্ম পরে কত ব্যক্তি পুজো-আরতি করেছেন। কতজনকে দেখা গেছে ইউনিফর্ম পরে কাঁওয়াড়িয়াদের উপর ফুলবৃষ্টির আয়োজন করতে। তখন কারুর আপত্তি হয়নি?”

তার দাবি, ভারতের সংবিধানে মানুষের যেমন ‘জয় হিন্দ’ বলার অধিকার আছে, তেমনই ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলার অধিকার আছে।

মিজ. বানোর ট্রান্সফার নিয়ে মমতা ব্যানার্জি নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “একদিকে ব্রিকস সম্মেলনে ‘প্রার্থনা কক্ষ’ তৈরি করে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি তুলে ধরছে বিজেপি সরকার; অন্যদিকে, কেবল ‘আসসালামু আলাইকুম’ ও ‘জাযাকাল্লাহ’ বলার কারণে মুসলিম নারী আইপিএস অফিসার ড. বুশরা বানোকে কোণঠাসা করা হচ্ছে – যা ‘গোদি মিডিয়া’র ছড়ানো বিদ্বেষকেই আরও উসকে দিচ্ছে।”

এদিকে, ইউনিফর্মে থাকাকালীন নিয়মকানুন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস কর্মকর্তা জগমোহন ভাট বিবিসিকে বলেন, তার দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অফিসারদের মুখে ‘জয় হিন্দ’ ছাড়া অন্য কোনো অভিবাদন কখনও শোনেননি।

তিনি বলেন, “রাজ্য পুলিশ হোক, বা সেনাবাহিনী বা সীমান্তরক্ষা বাহিনী, যে কোনো রাষ্ট্রীয় এজেন্সি বা ফোর্সে ইউনিফর্ম পরা কর্মকর্তারা সাধারণত ‘জয় হিন্দ’ বলেন। ইউনিফর্ম পরে থাকা অবস্থায় এটাই সবচেয়ে প্রচলিত স্যালুটেশন। কর্মরত থাকাকালীন আমরা সব সময়েই খেয়াল রাখতাম, যাতে আমরা কোনো ধর্মীয় কথা, যেমন ‘জয় শ্রী রাম’ বা ‘রাধে রাধে’, বা ধর্মীয় পতাকা কিংবা চিহ্ন ব্যবহার না করি।”

বুশরা বানো শাড়ি পরে বসে আছেন

ছবির উৎস, Bushara Bano’s Facebook page

কে এই বুশরা বানো?

মিজ. বানোর লিংকডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। পুলিশ প্রশাসনে যোগ দেওয়ার আগে তিনি উত্তরপ্রদেশ সরকারের ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন।

তিনি ভারতের প্রতিযোগিতামূলক ‘ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষা’ দু’বার পাশ করেছেন। প্রথমবার পাশ করে তিনি ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ট্র্যাফিক সার্ভিসে কাজ করেন। দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।