ইরান কাতারের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি পারমাণবিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনায় বসার আগে ওয়াশিংটনকে সাতটি কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ইরান এই পরিকল্পনা পাঠিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আলোচনায় বসা বা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আগে তেহরানের সব শর্ত পুরোপুরি পূরণ করতে হবে।
—
### ইরান কী দাবি করছে
ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ না করলেও, তেহরানের সাতটি শর্তের মধ্যে সম্ভবত রয়েছে:
– লেবাননসহ সব ধরনের শত্রুতা সম্পূর্ণ বন্ধ করা
– ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার
– ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিশেষ করে ইরানের তেলশিল্পকে লক্ষ্য করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা
– হিমায়িত ইরানি আর্থিক সম্পদ মুক্ত করা
– ইরানের চারপাশে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার
– যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান
– যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ হুমকি বন্ধ করবে—এমন নিশ্চয়তা
রাশিয়া সফরের সময় ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মোহসেন রেজায়ি বলেন: “কূটনীতির বিষয়ে আমরা আমেরিকানদের কাছে সাতটি শর্ত ঘোষণা করেছি। তারা আমাদের সাতটি শর্ত বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত আমরা হরমুজ প্রণালি খুলব না এবং আলোচনাতেও বসব না।”
—
### কৌশলগত সময় ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি
ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই তেহরান এই প্রস্তাব জমা দিয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাত অব্যাহত থাকলে ইরানকে “ধ্বংস” করার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এদিকে কাতারসহ কূটনীতিক ও মধ্যস্থতাকারীরা শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা জোরদার করেছেন। বিশেষ করে আশঙ্কা রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যুদ্ধ আবার তীব্র হতে পারে।
সময়ক্রম অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর যুদ্ধ আরও তীব্র হয়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তু এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়। সংঘাত ইয়েমেনেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। পাশাপাশি লেবাননেও সংঘাত ছড়িয়েছে, যেখানে হিজবুল্লাহ জড়িত। সব ফ্রন্টেই পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল রয়েছে।
—
### আলোচনার আগে তেহরানের জোরালো শর্ত
ইরানের শর্তগুলোকে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য একেবারে অপরিহার্য পূর্বশর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া পুরোপুরি নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের সাতটি দাবি পূরণের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, তারা ইরানের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছেন। তবে এখন পর্যন্ত সব বা কোনো একটি দাবি পূরণে সম্মতি দেয়নি ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, যেকোনো প্রাথমিক আলোচনা প্যাকেজে পারমাণবিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
—
### হরমুজ প্রশ্ন
হরমুজ প্রণালি তেহরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চাপপ্রয়োগের ক্ষেত্র। চলমান শত্রুতার সময় জাহাজ চলাচল বন্ধ করা এবং তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছে। রেজায়ি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই জলপথ বন্ধ থাকবে।
ইরানের কৌশলে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণকে শুধু নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হিমায়িত সম্পদ মুক্ত করার দাবি জানিয়ে ইরান তার অর্থনৈতিক টিকে থাকার বিষয়টিকে সরাসরি ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।
—
### যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও অনিষ্পন্ন প্রশ্ন
কাতারের মধ্যস্থতায় পর্যালোচনার জন্য প্রস্তাবটি পাওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে। তবে তেহরানের সব দাবিতে একযোগে সম্মতি দেয়নি ওয়াশিংটন। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে, প্রাথমিক যেকোনো আলোচনায় পারমাণবিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
অনিষ্পন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—শত্রুতার সংজ্ঞা কী হবে, অর্থাৎ কোন কোন সংঘাত বন্ধ করতে হবে; মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের পরিধি ও শর্ত; এবং ক্ষতিপূরণ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে। হস্তক্ষেপ, হুমকি বা ভবিষ্যৎ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিশ্চয়তার বিষয়ে ওয়াশিংটন আদৌ কতটা এবং কীভাবে আলোচনা করতে রাজি হবে, তাও এখনও স্পষ্ট নয়।
—
### বৃহত্তর প্রভাব
ইরানের সাতটি দাবি পূরণ করা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সেনা প্রত্যাহার এবং অবরোধ বন্ধ করা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ককেই নতুনভাবে গঠন করবে না, ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়বে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে গেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্থিতিশীল হতে পারে। এর ফলে জাহাজ চলাচলের পথ ও জ্বালানির দামের ওপর চাপ কমতে পারে। বিপরীতে, তেহরানের দাবির বিরোধিতা করলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও গভীর হতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়তে পারে।
—
কাতারের মাধ্যমে পাঠানো ইরানের এই প্রস্তাব তার নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি উচ্চঝুঁকির প্রস্তাব। যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের সাতটি শর্তের সব বা কোনো একটি গ্রহণ করবে কি না এবং করলে কোন শর্তে করবে, তা এখনও অনিশ্চিত। এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে—কারণ পরবর্তী যেকোনো পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
This article is AI-generated content. Please verify the information independently before taking any action based on this article.
