Home LATEST NEWS BANGLA ইরান যুদ্ধ ব্রিকস সম্পর্ক নতুন করে তৈরি করছে, যদিও বিভেদ এখনো আছে

ইরান যুদ্ধ ব্রিকস সম্পর্ক নতুন করে তৈরি করছে, যদিও বিভেদ এখনো আছে

3
0

Source : BBC NEWS

২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে পারিবারিক আলোকচিত্রের জন্য ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

ছবির উৎস, Reuters

এই সপ্তাহেই বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর কিছু ব্যক্তি দিল্লিতে একটি বিশাল বৃত্তাকার টেবিল ঘিরে একত্রিত হয়েছিলেন।

সেই টেবিলে বসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেন, তার পাশে বসা নেতাদের উচিত প্রচলিত “নিয়মের অনুসারী” নয়, বরং “নিয়ম সৃষ্টিকারী” হয়ে ওঠা।

তার কথা শুনছিলেন ব্রিকস জোটের সদস্যরা, যার মধ্যে ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা।

তারা স্বাভাবিক অর্থে মিত্র নন।

তাদের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ, এমনকি সামরিক সংঘর্ষের ইতিহাসও রয়েছে। কয়েক বছর আগেই ২০২০ সালে ভারত ও চীন তাদের বিতর্কিত সীমান্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিপরীত অবস্থানে ছিল।

এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব যখন তৈরি করছিল, তখন তেহরান তারই এক ব্রিকস সদস্য দেশের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল।

ভারত যে এসব নেতাকে সরাসরি একত্র করতে পেরেছে, সেটা তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন এবং তার কূটনৈতিক প্রভাবের প্রমাণ হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

সপ্তাহ শেষের এই সম্মিলনে দেশগুলোর নেতাদের ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিজেদের সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের একটি সুযোগও দিয়েছে।

তবে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে সবার একমত হওয়া এবং স্পষ্ট ও বাস্তব ফল অর্জন করা অনেক বেশি কঠিন কাজ। সেই টানাপোড়েন পুরো শীর্ষ সম্মেলনজুড়ে টের পাওয়া গেছে।

Skip YouTube post

Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে ‘সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন’ বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না YouTube কনটেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post

ছবির কপিরাইট

YouTube -এ আরো দেখুনবিবিসি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য বিবিসি দায়বদ্ধ নয়।

পশ্চিমা প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য

চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো সদস্যদের জন্য ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের প্রভাব কমানোর একটি বড় সুযোগ বা মাধ্যম।

তবে ভারত ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী নয়।

শীর্ষ সম্মেলনে মোদী নিজেই বলেছেন, এই জোট “কারও বিরুদ্ধে নয়”।

দিল্লির জন্য এই পার্থক্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত পরস্পরের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে থাকা দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

“এই জোটে এমন কিছু দেশ আছে যারা এটিকে পশ্চিমবিরোধী রূপ দিতে চায়, কিন্তু এটি তা নয়,” বলেন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুনায়াত।

তার মতে, ভারত যা অর্জন করেছে তা হলো “যুদ্ধের যুগে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের” পক্ষে জোরালো অবস্থান এবং সদস্যদের মধ্যে “আরও বৃহত্তর সহযোগিতা বৃদ্ধির” উদ্যোগ।

২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে আরাস আন উয়াখতারাইন থেকে বিদায়ের সময় আইরিশ প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনোলির সঙ্গে হাঁটার সময় উপস্থিত গণমাধ্যমের দিকে হাত নাড়ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images

যৌথ ঘোষণার ভেতরে কী আছে?

সদস্যদের মধ্যে বিভাজন এত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও শীর্ষ সম্মেলনের নেতারা একটি যৌথ ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়েছেন।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে ব্রিকস মন্ত্রীদের মধ্যে দু’টি বৈঠক যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল।

এবার ঐকমত্যে পৌঁছানো গেছে, তবে সেটি হয়েছে সদস্যদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ থাকা বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে এবং খুব কম সমাধান তুলে ধরে।

“নয়াদিল্লি ঘোষণা” শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিন গৃহীত হয়।

তবে এই ঘোষণায় যা বলা হয়েছে, তার চেয়ে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এতে কী বলা হয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে ঘোষণায় “সর্বোচ্চ সংযম” প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এতে “বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার” নিন্দা জানানো হলেও কারও ওপর দায় আরোপ করা হয়নি।

এতে (ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে) দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি বা “দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়া কিংবা দীর্ঘায়িত করতে পারে” এমন পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়েছে, যা বিদ্যমান জাতিসংঘের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে।

রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো উল্লেখই এতে নেই, যা আগের ব্রিকস ঘোষণাগুলো থেকে বেশ আলাদা।

বাণিজ্য নিয়েও একই ধরনের সতর্কতা দেখা গেছে।

এতে “বাছবিচারহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়া শুল্ক” নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করা হয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি। হয়তো সেটা ওয়াশিংটনের অসন্তোষ এড়ানোর চেষ্টা হতে পারে।

ব্রিকসের বেশ কয়েকটি সদস্য দেশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করতে চায় না।

এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিকসের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে নিজস্ব লেনদেনের মাধ্যমে বাণিজ্য করার মতো ব্রিকসের কিছু প্রস্তাবকে “আমেরিকা বিরোধী” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

“মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নিন্দা করলেও কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করা ভারতের কূটনৈতিক রীতির একটি নমুনা বলা যেতে পারে,” বলেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দন্তি।

তিনি আরও বলেন, “শুল্ক নিয়ে শক্ত অবস্থানের উল্লেখ দেখে আমি কিছুটা বিস্মিত হয়েছি। কারণ ভারত হয়তো এ বিষয়ে কম সরাসরি সম্পৃক্ত হতে চাইতে পারত। কিন্তু সম্ভবত তারা এর মাধ্যমে নিজেদের অসন্তোষ জানানোর একটি সুযোগ হিসাবে নিয়েছে।”

২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

ছবির উৎস, Getty Images

শীর্ষ সম্মেলনের বাইরে

ট্রাম্পের বাণিজ্যিক হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা ব্রিকসের অনেক সদস্য দেশের জন্য জরুরি প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

শীর্ষ সম্মেলন এমন কিছু বৈঠকের সুযোগ করে দিয়েছে, যা কয়েক মাস আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।

ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির যুবরাজ একসঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি বৈঠক।

এই সপ্তাহ তেহরানের জন্য এমন একটি সুযোগ এনে দিয়েছে যার মাধ্যমে তারা দেখাতে পেরেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখেও তারা একা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, ওয়াশিংটনের “অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট” এবং ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধের চাপ মোকাবিলা করতে গিয়ে পেজেশকিয়ান ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ভারত ও ইথিওপিয়ার সঙ্গে, আরও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের পক্ষে জোর দিয়েছেন।

চীনের ক্ষেত্রে, এটি ছিল প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গত সাত বছরে প্রথম দিল্লি সফর।

২০২০ সালের সীমান্ত বিরোধের পর থেকে ভারত ও চীনের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস ছিল, তবে সেই উত্তেজনা কিছুটা কমেছে।

দুই দেশের মধ্যে বড় বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাও রয়েছে, যেখানে ঘাটতি ব্যাপকভাবে চীনের পক্ষে।

শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ করমর্দন হয়েছে, যদিও সেটি মোদীর বহুপরিচিত আলিঙ্গনের ধরন ছিল না।

শি জিনপিং ২৪ ঘণ্টারও কম সময় ভারতে অবস্থান করেন এবং শনিবার রাতে নরেন্দ্র মোদীর আয়োজন করা নৈশভোজেও অংশ নেননি।

তবু জটিল সম্পর্ক থাকা দুই দেশের জন্য এই সপ্তাহের শেষ অংশ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, দুই নেতা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও পরিবহন সংযোগ জোরদার করা এবং বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুনায়াত মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পর্কের মধ্যে যে ধীরে ধীরে উষ্ণতা তৈরি হয়েছে এটি তারই অংশ। এতে বোঝা যায় যে উভয় পক্ষের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে।

তবে তা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বয়ে আনবে কি না, তা দেখার জন্য এখনো অপেক্ষা করতে হবে।

“আমি সবসময় বলি, আগে যাচাই করুন, তারপর বিশ্বাস করুন,” তিনি বলেন।

এরপর কী?

এই শীর্ষ সম্মেলন দেখিয়েছে যে পশ্চিমা প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে ব্রিকস প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে কথা বলা ও কৌশল নির্ধারণের একটি পরিসর তৈরি করতে পারে।

কঠিন প্রশ্ন হলো, এরপর কী হবে।

সদস্যরা যে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি নতুন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু সেটির বিকল্প কী হবে এবং সেখানে কীভাবে পৌঁছানো যাবে, তার উত্তর খুঁজে পাওয়া অবশ্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।

অতিরিক্ত প্রতিবেদন: শার্লট স্কার।