Home LATEST NEWS BANGLA ইসরায়েলগামী বিমানে পাইলটদের মারামারি-ছুরিকাঘাত ও সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ, কী জানা যাচ্ছে?

ইসরায়েলগামী বিমানে পাইলটদের মারামারি-ছুরিকাঘাত ও সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ, কী জানা যাচ্ছে?

2
0

Source : BBC NEWS

মাটিতে থাকা ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান

দুবাই থেকে তেল আভিভগামী একটি ফ্লাইট অপ্রত্যাশিতভাবে সৌদি আরবে অবতরণ করানো হয়। কারণ বলা হয়, দুই পাইলটের একজন অন্যজনকে ছুরিকাঘাত করেন এবং “স্পষ্টতই বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেন”। এমনটাই বলেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানটি বুধবার ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, উড্ডয়নের প্রায় দুই ঘণ্টা পর জরুরি সংকেত পাঠায় এটি।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্যেও বিমানটির উচ্চতায় হঠাৎ পতনের বিষয়টি দেখা যায়।

ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ ইসরায়েলের বেন-গুরিয়ন বিমানবন্দরে যাওয়ার নির্ধারিত পথ থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং এর পরিবর্তে সৌদি আরবের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

অবতরণের পর, স্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া যাত্রীদের বিবরণে বিমানের ককপিটে ছুরিকাঘাতের ঘটনার কথা উঠে আসে।

ঘটনার পর দেওয়া এক ভাষণে নেতানিয়াহু ছুরিকাঘাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং বলেন, একজন যাত্রী ও একজন ক্রু সদস্য ককপিটে প্রবেশ করে “যে পাইলট ছুরিকাঘাত করেছিল” তাকে কাবু করেন। ওই পাইলটকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

তাবুক বিমানবন্দরের মালিক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বিমানের ক্যাপ্টেন এবং ফার্স্ট অফিসার আহত হন এবং তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে তাদের আঘাতের কারণ কী ছিল, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি কিছু জানায়নি।

ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, ফ্লাইটির ডেকে “একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল” এবং সব যাত্রী নিরাপদ রয়েছেন।

ফ্লাইটটিতে অন্তত ১৫০ জন আরোহী ছিলেন। যাত্রীদের “প্রায় সবাই” ইসরায়েলি নাগরিক বলে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন।

ঘটনা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমরা যা জানি তা এখানে তুলে ধরা হলো।

ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানটি সৌদি আরব নামার পর যাত্রীরা নেমে আসেন

ফ্লাইটটিতে কী ঘটেছিল?

ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় বা জিএমটি ৩টা ৫ মিনিট) দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর সৌদি আরবের আকাশসীমার ওপর বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে।

৯টা ২১ মিনিটের দিকে, দুই মিনিটেরও কম সময়ে এটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি (৫০০০ মিটারেরও বেশি) নিচে নেমে আসে।

কয়েক মিনিট পর বিমানটি জরুরি কোড, স্কোয়াক ৭৭০০, পাঠায় এবং পরে সেটি পরিবর্তন করে ছিনতাইয়ের সংকেত নির্দেশক স্কোয়াক ৭৫০০ পাঠায়।

৯টা ৪০ মিনিটে বিমানটি, যা অল্প সময়ের জন্য জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল, ঘুরে আবার সৌদি আরবে ফিরে আসে। এরপর সেটি অবতরণের জন্য ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে নিচে নামতে শুরু করে।

এক ঘণ্টারও কম সময় পরে বিমানটি আবার ৭৭০০ স্কোয়াক সংকেত পাঠায়।

প্রাথমিকভাবে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, দুই পাইলটের মধ্যে মারামারি বেঁধে গিয়েছিল।

তবে বুধবার ঘটনাটির পর বক্তব্য দিতে গিয়ে নেতানিয়াহু পরবর্তী প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য নিশ্চিত করেন যে, এক পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন এবং এরপর “স্পষ্টতই বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন”।

তিনি আরও বলেন, একজন ইসরায়েলি যাত্রী তাকে জানিয়েছেন যে, “বিমানটি ঘুরপাক খেতে শুরু করে এবং নিচের দিকে নামতে থাকে”। এরপর ওই যাত্রী ও এক ক্রু সদস্য ককপিটে প্রবেশ করে “যে পাইলট ছুরিকাঘাত করেছিল” তাকে কাবু করেন।

অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি ১০টা ৫৮ মিনিটে সৌদি আরবের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ঘটনাটিকে “জিহাদি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা” বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশ, জরুরি সেবা বিভাগ বা তদন্তকারীদের কাছ থেকে বিবিসি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পায়নি।

ইসরায়েল ওহায়োন

‘চারদিকে রক্ত’- বিমানের ভেতরের আতঙ্কের বর্ণনা যাত্রীদের

ফ্লাইটটির যাত্রীরা বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিবিসি নিউজ তাদের বর্ণনা যাচাই করতে পারেনি।

ইয়াসমিন আবুকাসিস রয়টার্সকে বলেন, তার মেয়ে, যিনি ওই ফ্লাইটে ছিলেন, তাকে জানিয়েছেন যে ছুরি হাতে একজন ব্যক্তি একজন পাইলটকে মেঝেতে ফেলে দিয়েছিলেন এবং চারদিকে রক্ত ছিল।

ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর থেকে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তার মেয়ে ফোন করে জানান যে তিনি বিমানে চিৎকার শুনেছেন, যখন একজন পাইলট সাহায্যের জন্য ডাকছিলেন। তিনি আরও বলেন, অন্য দুই পাইলট বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেন এবং অন্য যাত্রীরা ছুরি হাতে থাকা ব্যক্তির দিকে ছুটে যান।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে আবুকাসিস বলেন, “বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে। তখন সবাই চিৎকার করতে থাকে, তারা ভেবেছিল তাদের মৃত্যু হতে যাচ্ছে।”

একজন নারী যাত্রী ইসরায়েলি পত্রিকা ইসরায়েল হায়োম-কে বলেন, বিমানটি নিচে নামছে বুঝতে পেরে “খুবই চাপের” পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলেন, “আমরা বুঝতে পেরেছিলাম পাইলটরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।”

“এখানে এমন মানুষ আছেন যাদের শার্ট রক্তে ভরা,” তিনি বলেন এবং যোগ করেন, “এখন আমরা ভালো আছি এবং বাড়ি ফিরতে চাই।”

আরেকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যাত্রী জেরুজালেম পোস্ট-কে বলেন, বিমানের সামনের দিকে থাকা যাত্রীরা সহ-পাইলটকে ছুরিকাঘাত করার পর হামলাকারীকে ককপিট থেকে বের করে দেন, আর বিমানের পেছনে থাকা দুই পাইলট বিমানটি অবতরণে সহায়তা করেন।

ফ্লাইটটিতে থাকা আলমগ ইতালি বলেন, বিমানটি অবতরণ করানো পাইলটদের একজন ছিলেন ব্রিটিশ।

অন্য পাইলট ইউরোপীয় ছিলেন বলে ইতালি জানান, যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো জাতীয়তার কথা বলেননি।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

এখন পর্যন্ত কী প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে?

ঘটনার পরপরই ইসরায়েল ও সৌদি আরবের বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমান পাঠায়, আর নেতানিয়াহু জরুরি বৈঠক করেন।

বুধবার পরে কথা বলতে গিয়ে নেতানিয়াহু পরিস্থিতিটিকে “নিরাপত্তা সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুতর একটি ঘটনা” বলে বর্ণনা করেন।

তিনি আরও বলেন, যাত্রীদের অব্যাহত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের নিরাপদে ইসরায়েলে ফিরিয়ে আনার জন্য ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী “সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখছে”।

তিনি বলেন, “আমি এসব বীরকে অভিনন্দন জানাই, যারা অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন”।

“তারা বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন এবং একটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকিয়েছেন”।

এদিকে ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, ফ্লাইটটি “ফ্লাইটে যাত্রী হিসেবে ভ্রমণরত দায়িত্বে থাকা ফ্লাইদুবাই ক্রুরা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং বিমানটিকে নিরাপদে তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণ করান”।

এয়ারলাইনটি নিশ্চিত করেছে যে যাত্রী ও ক্রুদের সহায়তার জন্য তাবুক বিমানবন্দরে দুটি বিকল্প বিমান পাঠানো হয়েছে এবং এ ঘটনার কারণে তাদের অন্য নির্ধারিত ফ্লাইট পরিচালনায় কোনো প্রভাব পড়েনি।

সংস্থাটির মুখপাত্র আরও বলেন, “এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব যাত্রী ও ক্রু সদস্যের চলমান নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সরকারি তদন্তে সহায়তা করাই বর্তমানে আমাদের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার”।

এদিকে, আজকের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ফ্লাইদুবাই বিমানের সব যাত্রী ইতোমধ্যে সৌদি আরব ত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছে বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ক্লাস্টার২।

সৌদি প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, তারা স্থানীয় সময় ৫টা ৪০ মিনিটে (১৪:৪০ জিএমটি) তাবুক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন।