Home LATEST NEWS BANGLA কলকাতায় গ া ঘেঁষ ে দাঁড়ান ো হোটেলগুলোয় আগুন থেক ে বাঁচার...

কলকাতায় গ া ঘেঁষ ে দাঁড়ান ো হোটেলগুলোয় আগুন থেক ে বাঁচার ক ী উপায় আছে?

3
0

Source : BBC NEWS

কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের সেই ভবনটি, যেখানে সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডে নয়জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন

ছবির উৎস, Asian News International

কিংবদন্ত ি উর্দ ু ও ফারস ি কব ি মির্জ া গালিবের সম্মান ে নামকরণ কর া মধ্য কলকাতার মির্জ া গালিব স্ট্রিট, যার পুরোনে া নাম ফ্র ি স্কুল স্ট্রিট।

জনবহুল এই রাস্তার একদিক ে কলকাতার বিনোদনের জন্য জনপ্রিয় পার্ক স্ট্রিট এলাকা, অন্য দিক ে ধর্মতলা । আর এই একট ি রাস্তাতেই রয়েছ ে গায় ে গায় ে গড় ে ওঠ া অজস্র দোকান, রেস্তোরা ঁ ও হোটেল।

কয়েকট ি জায়গায় বিল্ডিংগুলে া এক ে অপরের সঙ্গ ে প্রায় জোড়া । এক ফুট জায়গাও এখান ে খাল ি পড় ে আছে, এমনট া কোথাও দেখ া যাব ে না।

গভীর রাত ে মির্জ া গালিব স্ট্রিটের এমনই একট ি পুরন ো ভবন ে হক মঙ্গলবার রাত ে ভয়াবহ আগুন লাগে । মার া যান নার ী ও শিশু-সহ নয় জন।

তাদের মধ্য ে সাত জন বাংলাদেশ ি পর্যটক ছিলেন, যাদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন । এছাড় া বাক ি দুজন ছিলেন হোটেল কর্মী, ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা।

দুর্ঘটন া যেখানে, পাঁচতল া সেই ভবনের ভেতর ে ঠাসাঠাস ি কর ে রয়েছ ে অনেকগুলে া হোটেল।

প্রতিট ি হোটেলের দখল ে রয়েছ ে অতিথিদের জন্য আনুমানিক দুই থেক ে পাঁচট ি ছোট ঘর । বিল্ডিংয়ের অধিকাংশ জানাল া লোহার গ্রিল দিয় ে বন্ধ । চারপাশ জুড় ে বৈদ্যুতিক তারগুলে া ঢিলেঢালাভাব ে ঝুল ে রয়েছে।

সিঁড় ি দিয় ে বিল্ডিংয় ে ঢোকা-বেরোনোর পথও অত্যন্ত সংকীর্ণ।

রাজ্যের নগরোন্নয়ন মন্ত্র ী অগ্নিমিত্র া পাল ওই দুর্ঘটনার পরপরই সাংবাদিকদের সামন ে বলেন,” দেখত ে হবে, এই ধরনের হোটেল যার া চালাচ্ছেন, তাদের ট্রেড লাইসেন্স এব ং ফায়ার লাইসেন্স রয়েছ ে ক ি না । একট ি মাত্র তিনতল া বিল্ডিংয় ে ১০ট ি হোটেল চলছে । ঘরগুলোও অত্যন্ত ছোট । এভাব ে চলত ে পার ে না । কঠোর ব্যবস্থ া নেওয় া হবে ।”

মির্জ া গালিব স্ট্রিটের এই দুর্ঘটনার পর দমকলের তরফ ে ওই এলাকার একাধিক গেস্ট হাউস এব ং রেস্তোরাঁক ে শো-কজ নোটিশ পাঠান ো হয় । নোটিশ ে দাব ি কর া হয়েছে, আগ ে একাধিকবার নোটিশ দেওয় া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানট ি অগ্নিনিরাপত্ত া ব্যবস্থার ঘাটতিগুলে া যথাযথভাব ে পূরণ করেনি।

তাদের বল া হয়েছে, অগ্নি-নিরাপত্ত া সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের কারণ ে কেন ওই ভবন খাল ি কর ে দিয় ে সিল কর ে দেওয় া উচিত নয়, স ে বিষয় ে ২৪ ঘণ্টার মধ্য ে লিখিত ব্যাখ্য া জম া দিত ে হবে।

রাজ্যের অগ্নিনির্বাপণ দফতর শুক্রবার মারকুইস স্ট্রিট, মির্জ া গালিব স্ট্রিট এব ং সংলগ্ন এস এন ব্যানার্জ ি রোড ে অবস্থিত ১৭ট ি হোটেলের অগ্নি-নিরাপত্ত া সংক্রান্ত শুনান ি করেছে।

এই এলাকার হোটেলগুলে া প্রায়শই বাংলাদেশ ি পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় থাকে।

এছাড়া, শহরের হোটেল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ে অগ্নিসুরক্ষ া বিধ ি এব ং অন্যান্য নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়গুল ি খতিয় ে দেখত ে ও অডিট করত ে বোরো-ভিত্তিক কমিটিও গঠন করেছ ে কলকাত া পৌরসংস্থা।

যে ভবনে আগুন লেগেছিল, সেখানে অনেকগুলো হোটেল ছিল। ভবনটির কলাপসিবল গ্রিল লাগানো গেটে দাঁড়িয়ে আছেন চারজন পুলিশ সদস্য

Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

‘ কলকাতার পুরোন ো বহুতলগুলোর চরিত্রই এমন ‘

রাজ্যের অগ্নিনির্বাপণ দফতরের প্রাক্তন মহানির্দেশক জগৎমোহন ভগৎ বিবিসিক ে বলেন,” প্রায় সব পুরোন ো বহুতলেই একট ি মাত্র সিঁড় ি থাকে । সেট ি যদ ি কোনোভাব ে বন্ধ থাকে, তাহল ে অনেক সমস্য া তৈর ি হয় । তখন মানুষ ছাদেও যেত ে পারেন না । কখনও পুরোন ো জিনিসপত্র ব া আসবাবও সেখান ে রাখ া থাকে, য া বেরোনোর পথ আটক ে দেয় ।”

” কলকাতার অনেক বাড় ি ৭০ থেক ে ৮০ বছরের পুরোনো । এগুলে া এমন সময় ে তৈর ি হয়েছিল, যখন ওয়েস্ট বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিসেস অ্যাক্ট, ১৯৫০, প্রযোজ্য হয়নি । বড়বাজার ব া নিউ মার্কেটের মত ো জায়গার পুরোন ো ভবনগুলে া অগ্নিনিরাপত্তার জন্য উপযুক্তভাব ে তৈর ি নয় । কলকাতার পুরোন ো বহুতলগুলোর চরিত্রই এমন । ওগুলোত ে এখন সম্পূর্ণ অগ্নিনিরাপত্ত া বিধ ি মানত ে গেল ে মানুষেরও সমস্য া তৈর ি হত ে পারে ।”

তিন ি আরও বলেন, কলকাতার ঘিঞ্জ ি এলাকাগুলোত ে বহুতলের পাশ ে পর্যাপ্ত খোল া জায়গ া ন া থাকায় ফায়ার সার্ভিসের সরঞ্জাম নিয় ে কাজ কর া ব া বাড়িত ে ঢোক া কঠিন হয় । একটিমাত্র প্রবেশপথ থাকলে, অথব া ত া বন্ধ ব া অতিসংকীর্ণ হলে, আগুন নেভানোর কাজও কঠিন হয় ে পড়ে।

তার বক্তব্য, বিশেষ কর ে এ ধরনের ভবন ে গড় ে ওঠ া হোটেলের ক্ষেত্র ে অনেক সময় গভীর রাত ে আগুন লাগল ে সেখান ে থাক া মানুষ অনেক দেরিত ে আগুনের খবর পান । ততক্ষণ ে আগুন ছড়িয় ে পড় ে এব ং অনেকের শরীরেই বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যম ে প্রবেশ কর ে ফেলে । তখন তাদের পক্ষ ে বেরিয় ে আস া খুব কঠিন হয় ে পড়ে।

” অনেক বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্র ে হয়ত ো দেখ া যাবে, তার া কখনও ফায়ার লাইসেন্সের জন্য আবেদনই করেন ি”, বলেন মি. ভগৎ ।

তিন ি আরও প্রশ্ন তোলেন, কোনে া বাড় ি যদ ি ফায়ার লাইসেন্স পাওয়ার পরেও নিয়ম মেন ে চল া বন্ধ কর ে দেয়, তখন ক ী কর া হবে?

” আরও একট ি বিষয় হলো, ফায়ার ডিপার্টমেন্টও যথেষ্ট কর্মী-সংকট ে ভুগছে । যেমন, দুই-তিনট ি পাম্প থাকলেও হয়ত ো তার মধ্য ে মাত্র একট ি সচল থাকে । অর্থাৎ, সেখান ে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে ।”

আগুনের প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস, Asian News International

‘ অবৈধভাব ে ন ো অবজেকশন পেয়েছ ে অনেকেই ‘

প্রায় ৩০ বছর ধর ে শহরের বিভিন্ন বিল্ডিংয় ে অগ্নিসুরক্ষ া সরঞ্জাম বসানোর কাজ ে যুক্ত এক বিশেষজ্ঞ দাব ি করেছেন, পুরোন ো ও নতুন, শহর ে দুই ধরনের বাড়িতেই খরচ কমানোর জন্য যথাযথ সুরক্ষ া বিধ ি মান া হয় না।

তিন ি বলেন,” তৃণমূল কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় ছিল, বাড়ির মালিকর া দমকল বিভাগের নিচ ু স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গ ে সমঝোত া কর ে নিত । অগ্নি-সুরক্ষার বিধিনিষেধ ন া মেনেই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য ‘ ন ো অবজেকশন সার্টিফিকেট ‘ পেয় ে যেতেন তারা । বেশিরভাগ বাড়িতেই অগ্নিনির্গমন পথ, স্মোক অ্যালার্ম, স্প্রিংকলার ব্যবস্থ া নেই । এমনক ি কোনে া কোনে া বাড়িত ে একট ি ফায়ার এক্সটিংগুইশারও থাক ে না ।”

তার মতে, এই সমস্য া উত্তর ও মধ্য কলকাতায় আরও গুরুতর আকার নিয়েছে । সেখান ে ভাড়াটের া এত কম খরচ ে জায়গ া ভাড় া নেন যে, মালিকর া বাড়ির পেছন ে খরচ কমাত ে গিয় ে অনেক সময় অগ্নি-সুরক্ষার ক্ষেত্র ে গাফিলত ি করেন বল ে তার অভিযোগ।

তার আরও অভিযোগ, অগ্নি-নিরাপত্ত া সরঞ্জাম থাকলেও পুরন ো বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্র ে কালজীর্ণ বৈদ্যুতিক তার, অতিরিক্ত ভারবহনকার ী সার্কিট এব ং একট ি বাড়ির সার্বিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণের অভাব নিয়মিত উদ্বেগের কারণ হয় ে দাঁড়ায়।

গত কয়েক বছর ে পশ্চিমবঙ্গ ে অগ্নিকাণ্ড ে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক মানুষ।

কলকাতার হোটেলটিত ে আগুন লাগার কয়েকদিন আগেই পশ্চিমবঙ্গের তারাপীঠের একট ি হোটেল ে আগুন লেগ ে অন্তত নয় জন প্রাণ হারান।

চলত ি বছরের শুরুর দিক ে কলকাতার আনন্দপুর এলাকায় একট ি ফাস্ট-ফুড দোকানের গুদাম ে আগুন লেগ ে অন্তত ২৭ জন মার া যান । গত বছর বড়বাজারের ঋতুরাজ হোটেল ে এরকমই একট ি অগ্নিকাণ্ড ে দ ু’ট ি শিশ ু ও এক বৃদ্ধ-সহ মার া যান ১৪ জন।

তাদের বেশিরভাগই অন্যান্য রাজ্য থেক ে আস া পর্যটক ছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গ ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্স ি সার্ভিসেসের ২০২৫ সালের একট ি নির্দেশিক া অনুযায়ী, হোটেল ভবনক ে অনুমোদিত নকশ া ও নির্দিষ্ট অগ্নি-নিরাপত্ত া বিধ ি মেন ে তৈর ি করত ে হবে।

ভবন ে আগুন প্রতিরোধ ী দেয়াল ও সিঁড়ি, পর্যাপ্ত জরুর ি বেরোনোর পথ, ফায়ার ইঞ্জিন ঢোকার মত ো রাস্ত া ও জায়গা, নির্দিষ্ট ক্ষমতার জলাধার ও হাইড্রান্ট ব্যবস্থা, ফায়ার ও স্মোক অ্যালার্ম, জরুর ি বিদ্যুৎ ব্যবস্থ া এব ং বিভিন্ন জায়গায় ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখত ে হবে।

কর্ম ী ও নিরাপত্তারক্ষীদের আগুন নেভানোর সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিত ে হব ে এব ং নিয়মিত মক ড্রিল, সরঞ্জাম পরীক্ষ া ও রক্ষণাবেক্ষণ করত ে হবে।

হোটেল ে এলপিজ ি ব া অন্য দাহ্য পদার্থ রাখল ে প্রয়োজনীয় ফায়ার লাইসেন্স নিত ে হবে । এছাড়া, ভবনের অগ্ন ি ও জীবনরক্ষার ব্যবস্থ া ঠিকঠাক রয়েছ ে ক ি না, ত া নিশ্চিত কর ে প্রত ি বছর শংসাপত্র নেওয়ার কথাও বল া হয়েছে । সব শর্ত পূরণ হওয়ার পরই চূড়ান্ত ‘ ফায়ার ন ো অবজেকশন সার্টিফিকেট ‘ দেওয় া হবে।

অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের আগুন নেভানোর প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস, Asian News International

কলকাতার ব্যবসায়ীর া ক ী বলছেন?

মির্জ া গালিব স্ট্রিটের একজন ব্যবসায় ী এব ং ওষুধের দোকানের মালিক মি. বিনোদ বলেন,” এখানকার বেশিরভাগ বাড় ি পুরোনো । অগ্নিনিরাপত্তার কোনে া নিয়ম মেন ে এগুলে া তৈর ি কর া হয়নি । কোথাও কোনে া অগ্নিনির্গমন পথ নেই । অধিকাংশ বাড়ির বিভিন্ন তলায় পর্যাপ্ত জায়গ া ন া রেখেই একাধিক হোটেল রুম তৈর ি কর া হয়েছে ।”

” এস ি এব ং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও ঠিকমত ো রক্ষণাবেক্ষণ কর া হয় না । সরকার ি কর্তৃপক্ষের তরফ ে নিয়মিত ও যথাযথ পরিদর্শনেরও অভাব রয়েছে ।”

তার মতে, খাস কলকাতায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল বেছ ে নেওয়ার আগ ে কলকাতায় আস া পর্যটকদের মন ে হয়ত ো এবার অগ্নি-নিরাপত্তার ব্যবস্থ া নিয় ে প্রশ্ন উঠবে।

নাম প্রকাশ ে অনিচ্ছুক মারকুইস স্ট্রিটের এক হোটেলকর্ম ী বলেন,” আরও আগেই এই ধরনের পরিদর্শন হওয় া উচিত ছিল । গ া ঘেঁষ ে একের পর এক হোটেল গড় ে উঠেছে, অথচ অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ ফায়ার লাইসেন্স নেই । আগুন লাগার পরই পরিদর্শন শুর ু হয়, কড়াকড় ি কর া হয়, কিন্ত ু কিছুদিন পর আবার সব আগের মত ো হয় ে যায় ।”

ওই এলাকার একজন বস্ত্র ব্যবসায় ী বলেন,” মুনাফার জন্যই এভাব ে একের পর এক হোটেল গড় ে উঠেছে । কিন্ত ু রাতারাত ি ত ো এই হোটেলগুলে া তৈর ি হয়নি । যখন এগুলে া গড় ে উঠছিল, তখন য ে সরকার ক্ষমতায় ছিল, তাদের তরফ ে যথাযথভাব ে কোনে া নজরদার ি হয়নি ।”

নিউ মার্কেট এলাকার একজন পর্যটন ব্যবসায় ী এমড ি আসিফ রাজ া দাব ি করেন, তিন ি পর্যটকদের পরামর্শ দেন যেন কোনে া হোটেল ে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ ে তার া সেখানকার নিরাপত্ত া ব্যবস্থ া সম্পর্ক ে খোঁজখবর নেন।