Home LATEST NEWS BANGLA কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শুনল বিবিসি

কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শুনল বিবিসি

3
0

Source : BBC NEWS

কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের কাছে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল এই ভবনে

ছবির উৎস, Dibyangshu SARKAR / AFP via Getty Images

“এখান থেকে যখন আমি ব্যাগ নিয়ে বের হচ্ছি, তখন দেখি চার তলা থেকে একজন টর্চ জ্বালিয়ে চিৎকার করছে, দাদা হেল্প!” আগুনের কবল থেকে বেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতা শোনানোর সময় একথা বলছিলেন একজন বাংলাদেশি পর্যটক।

ভারতীয় সময় রাত আড়াইটা নাগাদ যখন কলকাতার ফ্রি স্কুল স্ট্রিট বা মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে আগুন লাগে, তখন তিনি কোনোমতে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন।

কিন্তু তার দিকে টর্চ জ্বালিয়ে সাহায্য চাওয়া ব্যক্তিকে কোনো সাহায্য তিনি করতে পারেননি। এই নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে তার হতাশার কথাও বলছিলেন তিনি। অবশ্য তিনি পরে জানতে পারেন যে দমকল কর্মীরা সাহায্য চেয়ে চিৎকার করা ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছেন।

কলকাতায় বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে অতি পরিচিত এলাকা মারকুইস স্ট্রিটের কাছে অবস্থিত এই হোটেলে যারা রাত কাটাচ্ছিলেন, তাদের সবার ভাগ্য এতটা ভালো ছিল না।

জানা গেছে এই অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের মধ্যে একজন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের বাসিন্দা ও হোটেলের কর্মচারী। যোগনারায়ণ আগরওয়াল নামে শিলিগুড়ির বাসিন্দা এক ৬৮ বছরের প্রৌঢ়ও এই ঘটনায় মারা গিয়েছেন।

মৃতদের মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশের নাগরিক ও মূলত কলকাতায় এসেছিলেন চিকিৎসার কাজে।

বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঁচ জন বাংলাদেশি নাগরিকের দেহ শনাক্ত করা গিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী, আড়াই বছর বয়সী শিশু ও শ্বশুর। আরেকজন ঢাকার কাছে সাভারের বাসিন্দা।

আরও দুটি দেহ শনাক্ত করার কাজ চালাচ্ছে কলকাতা পুলিশ।

ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল

ছবির উৎস, Uttarayan Chakraborty

‘রাতে হঠাৎ দমবন্ধ হয়ে এলো, ঘর ধোঁয়ায় ভর্তি’

বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার উদ্দেশে ভারতে আসা বহু পর্যটক কলকাতার এই এলাকাটিতে একাধিক সস্তা হোটেলে ওঠেন। ঘটনাস্থলে পৌছতেই দেখা গেল, যে ভবনটিতে আগুন লেগেছিল, এর এক তলায় কিছু রেস্তোরা ও মুদিখানার দোকান রয়েছে।

উপরের চারটি ফ্লোরে বিভিন্ন মালিকানাধীন হোটেল চলছিল রমরমিয়ে। বেলা গড়াতেই পশ্চিমবঙ্গের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ওই স্থানে পৌঁছান। তিনি অভিযোগ করেন যে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই হোটেলগুলো চলছিল।

এসব হোটেলে সুরক্ষার যথাযথ বন্দোবস্ত সুনিশ্চিত না করে ‘ট্রেড লাইসেন্স’ বা বাণিজ্যিক ছাড়পত্র দেওয়ার অভিযোগ তিনি তুলেছেন সাবেক তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে।

যে ভবনটিতে আগুন লাগে, সেই ভবনে ওঠা ও নামার সিঁড়িটি অত্যন্ত সংকীর্ণ। আগুন লাগলে সেই সিঁড়ি ব্যবহার অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

বিবিসি বাংলাকে ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন, হঠাৎ তারা অনুভব করেন যে তাদের দমবন্ধ হয়ে আসছে। তখন মাঝরাত। চোখ খুলে তারা দেখতে পান ঘর ভরে গেছে ধোঁয়ায়। চারিদিক থেকে বহু মানুষের আর্তনাদের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন তারা।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে আসা এক যুগল – নাজিমুল ইসলাম ও তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “তখন রাত ১টা ৪০ বা ৫০। হঠাৎ একজন এসে দরজায় নক করে জানালেন যে আগুন লেগেছে।”

এই খবর শোনার পরেই দরজার দিকে না গিয়ে জানালা দিয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন তারা।

সুমাইয়া আক্তার জানান, তারা ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে পথচারীদের বিপদের আভাস দিতে থাকেন। এর পরেই এক পথচারী দমকলকে খবর দেয় এবং দমকলকর্মীরা ওই দম্পতিকে উদ্ধার করেন।

দমকলের তরফে জানানো হয়েছে যে এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ কী – সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল।

চলতি সপ্তাহের সোমবার পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠেও একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যেখানে মৃত্যু হয়েছিল কমপক্ষে সাত জন মানুষের। ঘটনার দুই দিনের মাথায় কলকাতায় এই অগ্নিকাণ্ড ঘটার ফলে পশ্চিমবঙ্গের হোটেলগুলিতে অগ্নি নির্বাপণ ও সুরক্ষা সম্পর্কিত একাধিক প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

অগ্নি ও জরুরি সেবা সংক্রান্ত প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, দমকল আগুনের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। মর্গ ও কলকাতা পুলিশ দেহগুলো শনাক্ত করার কাজে নিযুক্ত আছে।

একটি বহুতল ভবনের একটি পাশ দেখা যাচ্ছে যেখানে বেশ কয়েকটি জানালা রয়েছে

ছবির উৎস, Uttarayan Chakraborty

মর্গে ছুটে আসেন মৃত সাংবাদিকের আত্মীয়

মৃতদেহগুলো শনাক্ত করতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নিকটবর্তী মর্গে।

সেই মর্গে উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের মৃত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের আত্মীয় কৃষ্ণ নন্দী। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন দেবাশীষ এবং প্রথমে ব্যাঙ্গালোরে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

তিনি জানালেন, দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুরের এই ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। তারা সবাই কুষ্টিয়ার বাসিন্দা।

“তিন তারিখ ফ্লাইট ধরে তিনি কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর গিয়েছিলেন, তখন তিনি ফেসবুকে ছবি দিয়েছিলেন। দুই-একদিন আগে তিনি কলকাতায় ফেরেন ও এই হোটেলে তিনি থাকছিলেন।”

মি. নন্দী জানালেন তার বাড়ি মালদায় ও তিনি বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশন থেকে মৃত্যুর খবর পান। তিনি তখন কলকাতাতেই ছিলেন কাজের সূত্রে। খবর পেয়ে তিনি মর্গে ছুটে আসেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৫ দিন আগে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন নিহত দেবাশীষ দত্ত এবং তার পরিবার। বুধবারই তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সবশেষ যখন তাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল তখন বুধবার সকালেই দেশে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন মি. দত্ত।

নিহত দেবাশীষ দত্ত একটি পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মৃত্যুর খবরে বুধবার দুপুর থেকেই তার কুষ্টিয়ার বাসায় ভিড় করেন স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের অনেকে।

বাংলাদেশ হাই কমিশনের পক্ষ থেকে ওমর ফারুক আকন্দ জানিয়েছেন, “মৃতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত নথিপত্র ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের শনাক্ত করা হবে।”

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

শোকবার্তা মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর

এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “এই মর্মান্তিক ঘটনাটি পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অবহেলার এক কঠিন স্মারক।”

“বছরের পর বছর ধরে শহর ও রাজ্যের অবকাঠামো কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই গড়ে উঠতে দেওয়া হয়েছে। সেসব জায়গায় বাধ্যতামূলক অগ্নি-সুরক্ষা বিধিমালা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ ও হোটেল বা অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।”

শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় যারা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা রইল। আহতরা যাতে সর্বোত্তম চিকিৎসা ও সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করার জন্য আমি প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি।”

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, “কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির খবর শুনে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। এই দুর্ঘটনায় যারা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমি সমবেদনা জানাচ্ছি। আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন। স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় নিযুক্ত।”