Home LATEST NEWS BANGLA ‘কাশ্মীরকে রক্ষা করছে পাকিস্তান’- ফারুক আবদুল্লাহর মন্তব্য নিয়ে ভারতে বিতর্ক

‘কাশ্মীরকে রক্ষা করছে পাকিস্তান’- ফারুক আবদুল্লাহর মন্তব্য নিয়ে ভারতে বিতর্ক

2
0

Source : BBC NEWS

বারামুল্লার অনুষ্ঠানে ফারুক আবদুল্লাহ (মাইক হাতে)

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহর সাম্প্রতিক বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তার দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের দিকে ইঙ্গিত করে ফারুক আবদুল্লাহ দাবি করেন, ভারতশাসিত কাশ্মীর সম্পর্কে প্রতিবেশী দেশ সর্বত্র সরব থেকেছে।

নাম উল্লেখ না করে ভারতশাসিত কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের ভূমিকা সম্পর্কে কার্যত প্রশংসাই করেছেন তিনি। তিনি এ-ও বলেছেন, “ওরা আমাদের রক্ষা করছে।”

তার এই মন্তব্যকে ঘিরে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

একদিকে যেমন বিজেপি তার এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং এমন মন্তব্যকে ‘ভারত বিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছে, তেমনই কংগ্রেসও বলেছে, ফারুক আবদুল্লাহর এই ধরনের মন্তব্য করা উচিত হয়নি।

তার এই মন্তব্যের নিন্দা করেছেন অনেক আলেমও।

মি আবদুল্লাহ

কী বলেছেন ফারুক আবদুল্লাহ?

জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ শনিবার (২৪ অক্টোবর) কাশ্মীর উপত্যকার উত্তরে অবস্থিত বারামুল্লায় একটা অনুষ্ঠানে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন। সেই সময় তিনি তার ভাষণে অনুচ্ছেদ ৩৭০ অধীনে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রসঙ্গ টেনেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে, বিজেপি মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে।

প্রসঙ্গত, ভারতের সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৩৭০-এর অধীনে জম্মু ও কাশ্মীরকে স্বায়ত্বশাসনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের পাঁচই অগাস্ট অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করে দেয় নরেন্দ্র মোদীর সরকার। এর ফলে জম্মু ও কাশ্মীরের সেই সাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদা লোপ পায়। ফারুক আব্দুল্লাহ-সহ একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এসেছেন।

সেই প্রসঙ্গই টেনে আনেন ফারুক আবদুল্লাহ।

তাকে বলতে শোনা যায়, “দিল্লির কাছ থেকে আপনি কী আশা করতে পারেন? ওরা ন্যায়বিচার করবে? আরে, ওদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস রাখুন। আর যদি আপনি তা না করেন তাহলে (অস্তিত্বকে ইঙ্গিত করে) মুছে ফেলা হবে। আপনার নাম মুছে ফেলা হবে।”

এরপরই সরাসরি পাকিস্তানের নাম না উল্লেখ করে বলেন, “ওরা (দিল্লি) আজ চুপ করে আছে কারণ এই নিয়ে বিশ্বে শোরগোল হচ্ছে এবং আমাদের প্রতিবেশী ওদের (কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন সরকারের) পিছনে পড়ে আছে। যেখানেই যায় সেখানেই তারা (পাকিস্তান) বলে, কাশ্মীর নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তারা আমাদের রক্ষা করছে।”

“ওদের (বিজেপিকে ইঙ্গিত করে) উদ্দেশ্য ভালো নয়। এরা একটা কথা বলে আর (বাস্তবে) করে ঠিক তার উল্টো। যাতে সত্যকে আঁকড়ে ধরতে পারো, তার জন্য শক্তি রাখো। সত্য কথা বলা সহজ নয়।”

শনিবার বারামুল্লায় আয়োজিত অনুষ্ঠানের ছবি

কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তোলেন তিনি। মি. আবদুল্লাহ বলেন, “জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষের জন্য সমস্ত রকমভাবে সমস্যা তৈরি করা হচ্ছে। যাতে তারা (কাশ্মীরের বাসিন্দাদের ইঙ্গিত করে) উঠে দাঁড়াতে না পারে, কোনো ক্রমে টেনে- হিঁচড়ে চলে আর আমরা তাদের কাছে ভিক্ষা করতে থাকি।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিতদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আপনি যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারেন, তবে আপনি কখনই নিজের সম্মান ফিরে পাবেন না। আমি যা বলছি, সেটা মনে রাখবেন।”

আবদুল্লাহ তার ভাষণে জানিয়েছেন, তিনি কখনো একথা বলেননি যে তিনি ভারতীয় নন। বারবার বলে এসেছেন যে তিনি মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু এবং মৌলানা আজাদ যে ভারতের কথা বলেছিলেন, তার অংশ।

দেশের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ এনে তিনি বলেন, “তারা (মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু এবং মৌলানা আজাদের মতো ব্যক্তিত্বরা) কখনো আশা করেননি যে এমন একটা সময় আসবে যখন মুসলিম এবং হিন্দুরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। শুধুমাত্র এই চেয়ারের (ক্ষমতায় আসাকে ইঙ্গিত করে) জন্য, ভারতের অবস্থা খারাপ করে দিয়েছে।”

আলতাফ ঠাকুর

‘ভারত-বিরোধী মন্তব্য’ আখ্যা বিজেপির

জম্মু ও কাশ্মীর বিজেপির মুখপাত্র আলতাফ ঠাকুর, ফারুক আবদুল্লাহর বক্তব্যকে ভারত-বিরোধী বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন মি. আবদুল্লাহের দল ‘জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স’ ভারত-বিরোধী মনোভাব পোষণ করে।

মি. ঠাকুর বলেছেন, “দেশের কাছে এটা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ। তার বক্তব্য দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতার পরিপন্থী। ন্যাশনাল কনফারেন্স বরাবরই দেশ-বিরোধী। ফারুক আবদুল্লাহর বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে দেশ-বিরোধী। তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”

বিজেপির মুখপাত্র আরপি সিং বলেন, “ফারুক আবদুল্লাহ সাহেব যে পাকিস্তানের প্রশংসা করছেন, সেই পাকিস্তান কাশ্মীরের এই অঞ্চলকে যেটা দিয়েছে সেটা হলো- সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, পাথর ছোঁড়ার মতো ঘটনা।”

মি. সিং দাবি করেছেন, কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কাশ্মীর মূলস্রোতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং এই অঞ্চলে বিনিয়োগও করা হচ্ছে। পর্যটকের সংখ্যাও বেড়েছে।

বিজেপি নেতা রবীন্দ্র রায়নার কথায়, “কাশ্মীর ও পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে ফারুক আবদুল্লাহ যে মন্তব্য করেছেন তা ভীষণভাবে নিন্দনীয় এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন। তিনি আবারও রাষ্ট্রদ্রোহ করেছেন, পাকিস্তান কীভাবে জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষের উপকারী হতে পারে? এটা কখনোই সম্ভব নয়।”

ইমরান মাসুদ- ফাইল ছবি

কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির বক্তব্য

শুধু বিজেপিই নয়, কংগ্রেসও জম্মু ও কাশ্মীরের এই সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।

সাহারানপুরের কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদ বলেন, “পাকিস্তান নিজেকেই রক্ষা করতে পারে না। পাকিস্তান যদি নিজে ভাল থাকত, তাহলে পাকিস্তান-অধিকৃত (পাকিস্তান শাসিত) কাশ্মীরে, কাশ্মীরিদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা হতো। পাকিস্তান একটা ধূর্ত দেশ, পাকিস্তানের কাছ থেকে কিছু আশা করবেন না।”

“আমি বুঝতে পারছি না কেন ফারুক আবদুল্লাহ এমন মন্তব্য করলেন। শেখ আবদুল্লাহ, ফারুক আবদুল্লা থেকে শুরু করে ওমর আবদুল্লাহ পর্যন্ত- এদের সকলের নীতি বরাবরই ভারতের পক্ষে থেকেছে।”

ইমরান মাসুদ জানিয়েছেন, কোন প্রেক্ষাপটে মি. আবদুল্লাহ এই মন্তব্য করেছেন তা তারা জানা নেই, তবে তিনি (ফারুক আব্দুল্লাহ) একথা বলে থাকলে তা সমর্থনযোগ্য নয়।

কংগ্রেস নেতা উদিত রাজ বলেন, “আজ পর্যন্ত আমি ফারুক আবদুল্লাহর কাছ থেকে এমন কথা শুনিনি। তিনি কখনো এ ধরনের মন্তব্য করেননি। পাকিস্তান-অধিকৃত (পাকিস্তান শাসিত) কাশ্মীরের কাশ্মীরিরা কতটা বিরক্ত বলুন তো? তারা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। যদি তারা পাকিস্তানে সুখে থাকত, তাহলে কি তারা ভারতে অংশ হওয়ার জন্য লড়াই চালাত?”

সমাজবাদী পার্টির সাংসদ মহিবুল্লাহ নদভি বলেন, “কাশ্মীর আমাদের এবং কাশ্মীরিরাও আমাদের। আমরা সমাজতন্ত্র মেনে চলা মানুষেরা সকলকে সম্মান করার কথা বলি। কাশ্মীরে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, পাকিস্তানের হস্তক্ষেপের কারণে, তার ভুল নীতির কারণে, কাশ্মীরিয়তেরও ক্ষতি হয়েছে। এটা কাশ্মীরি মুসলমানদেরও ক্ষতি করেছে, পণ্ডিত এবং শিখদেরও ক্ষতি করেছে।”

ফারুক আবদুল্লাহ কেন এমন মন্তব্য করেছেন, তা তার অজ্ঞাত বলেও মন্তব্য করেছেন মি. নদভি।

দেওবন্দি ওলামা ক্বারী ইসহাক গোরার মতে মি. আবদুল্লাহের ক্ষমা চাওয়া উচিত। তিনি বলেছেন, “ফারুক আবদুল্লাহর বক্তব্য নিন্দনীয়। তার উচিত ভারতের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া।”

অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের নির্বাহী সদস্য মাওলানা খালিদ রশিদ ফিরাঙ্গি মাহালি বলেন, “এতে কোনো সন্দেহ নেই যে জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এই পুরো অঞ্চলের সুরক্ষা আমাদের সেনাবাহিনী সর্বদা নিশ্চিত করে এসেছে। এই কারণেই জম্মু ও কাশ্মীরের নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা বাহিনী, সিআরপিএফ এবং জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ-সহ বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা কর্মী সেখানে মোতায়েন রয়েছেন।”

তিনি বলেন, “এতে কোনো সন্দেহ নেই যে সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা কর্মী তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাই অন্য কোনো দেশ জম্মু ও কাশ্মীরকে রক্ষা করছে এটা বলা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা আপত্তিকর ও নিন্দনীয়। যিনিই এমন মন্তব্য করে থাকুন তার উচিত এর ব্যাখ্যা দেওয়া।”