Home LATEST NEWS BANGLA গোরক্ষার নামে সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জীবন যেভাবে বদলে গেছে

গোরক্ষার নামে সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জীবন যেভাবে বদলে গেছে

2
0

Source : BBC NEWS

আব্দুল শামির

ছবির উৎস, Sandeep Yadav/BBC

(সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনের কিছু অংশ আপনাকে মানসিকভাবে বিচলিত করতে পারে)

“আমার পা কাজ করে না। পায়ের আঙুলগুলো নড়াচড়া করাতে পারি না। যেনো নিষ্প্রাণ হয়ে রয়েছে। মশা কামড়ালে বুঝতে পারি… তাই সাড় তো আছে!”

তীব্র রোদ ও আর্দ্রতার মাঝে নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন দক্ষিণ ভারতের কেরালার বাসিন্দা আব্দুল শামির।

২০১৪ সালের ২৩শে অগাস্টের ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, ওই রাতে প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছিলেন তিনি। সেই সময় তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। তারপর থেকে তার শরীরের বাঁদিক কাজ করে না।

তার এলাকা থেকে প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মুম্বাইয়ের বাসিন্দা নাসির হুসেনের কাহিনীও অনেকটা একই। তার অভিযোগ, ২০২৩ সালে তথাকথিত গোরক্ষক বাহিনী তার উপর হামলা চালায়। তার বন্ধু আফ্ফানের মৃত্যু হয়েছিল ওই ঘটনায়।

এরপর চলতি বছরের মার্চ মাসে তাকে আরো একবার গোরক্ষক বাহিনীর নিশানা হতে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন মি. হুসেন। দ্বিতীয় হামলায় তার বাঁ পা ভেঙ্গে যায়।

নাসির হুসেন এবং আব্দুল শামির, দুজনেই তাদের অবস্থার জন্য গোরক্ষকদের দায়ী করেছেন।

মাংস বা গবাদি পশু এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার সময় যারা এই তথাকথিত গো রক্ষকদের শিকার হন, তাদের বেশিরভাগই মূলত দরিদ্র মানুষ।

গণপিটুনির শিকার হওয়া এই ব্যক্তিদের শুধুমাত্র গভীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতই থাকে না, এই ঘটনাগুলো তাদের আর্থিক দিক থেকেও বিধ্বস্ত করে দেয়।

একদিকে যেমন আক্রান্তের চিকিৎসা ও আইনি লড়াইয়ের জন্য বিপুল খরচ, অন্যদিকে আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়।

সরেজমিনে খোঁজখবর করে, নাসির হুসেন -আব্দুল শামির মতো ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে আর বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকেই এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, গণপিটুনির শিকার হওয়া মানুষরা কোনো মতে বেঁচে ফেরার পর কী ধরনের চিকিৎসা ও আইনি সমস্যা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন?

এর উত্তর খোঁজার জন্য আমরা দুই ভুক্তভোগী আব্দুল শামির ও নাসির হুসেনের সঙ্গে কথা বলেছি।

আব্দুল শামির

ছবির উৎস, Sandeep Yadav/BBC

জীবন থমকে গেছে

ওয়াকারের উপর ভর দিয়ে ধীরে হেঁটে এসে আমাদের দেখে হেসে নমস্কার করলেন আব্দুল শামির।

কেরালার কাসারগড় জেলার উপ্পালা গ্রামের এক বস্তিতে থাকেন তিনি। এই পুরো বস্তির দেয়ালগুলোই গোলাপি রঙে রাঙানো। তার সঙ্গে এখানেই আমাদের দেখা হয়েছিল।

বড়ো বড়ো দুটো বাদামী চোখ তার। ঘটনার কথা বলতে গিয়ে মি. শামির এক অদ্ভুত হাসি হাসেন। ওই হাসিতে একটা ক্রোধের ঝলক ছিল, যা সাধারণত চোখের জলেও দেখা যায় না।

আব্দুল শামির অভিযোগ করেন, তিনি ও তার দুই সঙ্গী কর্ণাটকের উপ্পিনাঙ্গাড়ি থেকে গরু নিয়ে যাওয়ার সময় ম্যাঙ্গালোরের পাম্পওয়েল জংশনে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

মি. শামিরের দাবি, “প্রায় ৫০ জন লোক এসে শ্রীরাম সেনে-র জয় বলে স্লোগান দিতে থাকে। আমিও আল্লাহু আকবর বলি। এরপর তারা আমাকে নির্মমভাবে মারে।”

তিনি অভিযোগ করেন , “ওরা আমার গলায় একটা ত্রিশূল ঢুকিয়ে দেয়, আমাকে উপরে তুলে ধরে আমার মাথাটা সামনের একটা বিদ্যুতের খুঁটিতে সজোরে ঠুকে দেয়.. এরপর আমি জ্ঞান হারাই। আমি কোমায় থাকা অবস্থায় পাঁচ মাস হাসপাতালে কাটিয়েছি।”

বিবিসি স্বাধীনভাবে তার এই দাবিগুলো যাচাই করেনি।

ওই মামলায় দায়ের হওয়া এফআইআর-এ আব্দুল শামিরের বয়ান বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এফআইআর অনুযায়ী, ২৩শে আগস্ট রাত সাড়ে দশটা নাগাদ মি. শামির ও তার দুই সঙ্গীকে গাড়িতে সওয়ার কিছু লোক ধাওয়া করে।

মি. শামিরের গাড়ি থামিয়ে কাচ ভাঙা হয়। তাদের গালিগালাজ করা হয়। এরপর আব্দুল শামির ও তার সঙ্গী মি. ফায়াজের উপর পাথর এবং লাঠি দিয়ে হামলা করা হয়।

এই ঘটনায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারা (হত্যার চেষ্টা) এবং অন্যান্য ধারা অনুযায়ী একটা মামলা দায়ের করা হয়।

গরুপাচার সন্দেহে একটা ট্রাক তল্লাশি নেওয়ার চিত্র - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, UGC

‘শ্রীরাম সেনে’ কর্ণাটক ভিত্তিক হিন্দু সংগঠন। পুলিশের এফআইআর বা আদালতের নথিপত্রে কোথাও তাদের উল্লেখ নেই। সুন্দরেশ নারগাল শ্রীরাম সেনের সাউথ ডিভিশনের কার্যনির্বাহী সভাপতি। তার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেছিলাম আমরা।

তিনি আমাদের বলেন, “আমাদের সংগঠনে গোসুরক্ষার দায়ত্বে থাকা কর্মকর্তা আছেন। তবে আমরা শুধুমাত্র পাচারকারীদের সম্পর্কে পুলিশকে জানাই। তাদের কখনো মারধর করি না। ২০১৪ সালের মি. শামিরের মামলার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।”

এই হামলায় আব্দুল শামির প্রাণে বেঁচে গেলেও তার জীবন যেন থমকে গেছে। শরীরের বাঁ দিকটা এখন অসাড়। বাঁ চোখ দিয়ে দেখতেও পান না তিনি। কাসারগড়ের উপ্পালা গ্রামে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে বাস করেন। এই ঘটনার আগে অটোচালক হিসেবে কাজ করতেন তিনি।

এখন অবশ্য বেশিরভাগ সময় সোজা হয়ে বসতে পারেন না। সোফায় শুয়ে, লুডো খেলে দিন কাটে তার। বাড়ির কাজে সাহায্য করতে পারেন না। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকদেরকে ফ্ল্যাট বা জমির মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার কাজ করেন। এতে সামান্য আয় হয়।

তবে তার স্বপ্নগুলো এখনো বেঁচে আছে। তিনি নিজের ভিডিও তৈরি করতে এআই ব্যবহার করেন। এইভাবে নিজের জন্য এক অনন্য জগৎ তৈরি করে ফেলেছেন তিনি। সেখানে নিজেকে হাসতে দেখেন, হাঁটা-চলা করতে দেখেন এবং নাচতেও দেখেন।

মায়ের সঙ্গে মি. শামির

ছবির উৎস, Sandeep Yadav/BBC

‘ভেবেছিলাম নাতি-নাতনির সঙ্গে খেলে দিন কাটাব’

হামলার পর পরিবারের নারীদের বড় দায়িত্বগুলো নিতে হয়েছে। অবসর গ্রহণের বয়সে কাজ শুরু করতে হয়েছে তার মা মিসেস ফাতিমাকে। কালো বোরখা পরে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন মিসেস ফাতিমা। আজকাল যদিও বয়সের ভার অনুভব করতে পারেন তিনি।

মিসেস ফাতিমা হেসে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম বুড়ো বয়সে বাড়িতে বসে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে খেলব। কিন্তু এখন শান্তি নেই।”

সংসার চালানোর জন্য, তিনি প্রথমে স্কুল বাস চালানোর কাজ শুরু করেছিলেন। এখন ড্রাইভিং প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করছেন। একতলায় এই দুই কামরার ঘর তিনি ভাড়ায় নিয়েছেন, কারণ তার ছেলে আব্দুল শামির সিঁড়ি ভাঙতে অক্ষম।

এর আগে আব্দুল শামিরকে দেখাশোনা করতেন তার স্ত্রী। কিন্তু তিনি এখন তালাক চান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার স্ত্রী বলেন, “উনি খুব রেগে যেতেন। সমস্ত হতাশা-বিরক্তি আমার উপর বের করতেন। অপমান করতেন। উনি আমাকে কখনো মারধর করেননি কিন্তু প্রতিটা ছোট-খাটো জিনিস নিয়ে চিৎকার করতেন।”

চিকিৎসা ও আইনি খরচ চালাতে গিয়ে তীব্র আর্থিক সমস্যায় রয়েছে এই পরিবার।

মা মিসেস ফাতিমা বলেন, “কর্নাটকে আমাদের একটা বাড়ি ছিল। সেটা বিক্রি করতে হয়েছে। ঘরের সোনা-দানাও বিক্রি করতে হয়েছে। ওষুধের জন্য খরচ করতে করতে সব শেষ হয়ে গেছে। আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই।”

ঘটনার ক্ষত তার আব্দুল শামিরের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে

ছবির উৎস, SandeepYadav/BBC

শামিরের ঘটনায় কে দায়ী?

পাম্পওয়েল জংশনে মি. শামির এবং তার দুই সহযোগীর উপর হামলার ঘটনা ম্যাঙ্গালোর গ্রামীণ পুলিশ তদন্ত করেছিল। তদন্তের সময় এই ঘটনায় ছয় থেকে সাতজনের নাম প্রকাশ্যে এসেছিল এবং পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়।

কিন্তু আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি কারণ সাক্ষীরা বেঁকে বসেছিল। তাই আদালত সমস্ত অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করে দেয়। পাঁচ অভিযুক্তের মধ্যে চারজনের পক্ষে আইনজীবী হিসাবে লড়েছিলেন কেএস শর্মা।

তার কথায়, “আদালতে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করার জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেশ করতে পারেনি তারা। আর যে গল্প ফাঁদা হয়েছিল সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং মনগড়া। আমি যখন তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করি, তখন আমি প্রমাণ করতে পেরেছিলাম যে তাদের কেউই অভিযুক্তদের ওই ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে দেখেনি।”

আব্দুল শামির এবং তার দুই সঙ্গীর বিরুদ্ধে কর্ণাটক গোহত্যা প্রতিরোধ আইন (১৯৬৪) এবং প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধক আইনের আওতায় মামলা করা হয়। আদালতের নথি অনুসারে, মি. শামিরের এক সহযোগী এই মামলায় অপরাধ স্বীকার করেছেন। মামলার শুনানি এখনো আদালতে চলছে।

আদালত কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করলেও হামলার পর আব্দুল শামিরের পরিবার ভেঙে গিয়েছে।

নাসির হুসেন

ছবির উৎস, SandeepYadav/BBC

নাসিরের দমবন্ধ অবস্থা

বছর ২৪-এর নাসির হুসেন জানিয়েছেন, তিনি বেঁচে আছেন বটে, কিন্তু তার দম যেন বন্ধ হয়ে আসে। দম বন্ধ বোধ হওয়ার কারণ মুম্বাইয়ের তাপমাত্রা বা ‘চাওলে’র সরু গলি নয়। এই গলিতেই এক সময় বন্ধু আফানের কণ্ঠস্বর শোনা যেত। সেই গলা এখন আর শুনতে না পেয়েই যেন তার দম বন্ধ হয়ে আসে।

চাওল হল মুম্বাইয়ে সারি দেওয়া ঘরের বাসা বাড়ি।

মুম্বইয়ের কুরলা এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ এমনই এক চাওলে থাকেন নাসির হুসেন। এখানেই তার সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল।

এখানকার গলিগুলো এতটাই সরু যে সেটা দিয়ে একজন ব্যক্তিই যেতে পারে। বাইরের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে এই সংকীর্ণ গলিতে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে যায়।

চাওলের পাশ দিয়েই একটা রেললাইন গেছে। তার চারপাশে রয়েছে অনেক কাঁচা টিনের ছাদের নীচে ঘরগুলো গরমে চুল্লির মতো মনে হয়। শিশুরা নির্ভয়ে রেললাইনে খেলাধুলা করে।

কখনো পাশ দিয়ে যাওয়া ট্রেনও তাদের ভয় দেখাতে পারে না।

নাসির হুসেন তার বন্ধু মি. আফ্ফানকে ২০২৩ সালে হারান। যে ঘটনায় বন্ধুর মৃত্যু হয়েছিল, সেটাও ছিল একটা গণপিটুনির ঘটনা।

ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া এফআইআর অনুযায়ী নাসির হুসেন এবং মি. আফ্ফান ২০২৩ সালের ২৩শে জুন ৪৫০ কেজি মাংস সঙ্গে নিয়ে একটা গাড়িতে চেপে আহমেদনগর থেকে মুম্বাইতে আসছিলেন। সেই সময় ‘সমৃদ্ধি হাইওয়ে’তে ১০-১৫জন লোক তাদের দাঁড় করায়। এরপর মি. নাসির ও মি. আফ্ফানকে লাঠি দিয়ে ব্যাপক মারধর করা হয়।

সেই ঘটনার কথা স্মরণ করে এই যুবক বলেন, “আমরা কালো মাল (স্থানীয় ভাষায় মহিষের মাংস) নিয়ে যাচ্ছিলাম। সেই সময় কিছু লোক রাস্তায় পেরেক ছড়িয়ে দিয়ে গাড়ি থামাতে বাধ্য করে।”

“ওরা আমাদের দুজনকেই মারধর করে। চোখের সামনে আফফানকে নির্মমভাবে মেরেছিল,” তিনি অভিযোগ করেন।

নাসিরের মা ও স্ত্রী

ছবির উৎস, SandeepYadav/BBC

তার কথায়, “সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা-আটটার দিকে পুলিশ এসে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর আমি জিজ্ঞাসা করি আফ্ফান কোথায়। তারা জানায় ও আর নেই।”

ঘটনার কথা মনে করে তিনি মাথা নিচু করে তাকিয়ে থাকেন, চোখে হেরে যাওয়ার দৃষ্টি।

নাসির হুসেনের কথায়, “আফ্ফান আমার ছোটবেলার বন্ধু ছিল। আমার ছেলেবেলা বলতে ও-ই ছিল। আমরা একসঙ্গে টিউশন পড়তাম। আমরা ছোটবেলা থেকে সবসময় একসঙ্গে থাকতাম… যাওয়ার সময়েও ও আমার সঙ্গেই ছিল…আর কী বলব।”

মহারাষ্ট্র প্রাণী সংরক্ষণ সংশোধনী আইন (১৯৯৫) এবং মোটরযান আইন (১৯৮৮)-এর আওতায় নাসির হুসেন ও মি. আফ্ফানের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছিল।

এই বিষয়ে আমরা মহারাষ্ট্রের নাসিক গ্রামীণ এলাকার পুলিশ সুপার ডিএস স্বামীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিলাম। কথা বলতে তার দফতরেও গিয়েছিলাম কিন্তু তিনি এড়িয়ে যান। বারবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও ফোন কল, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ এবং ইমেল- কোনো কিছুরই জবাব দেননি।

হেমন্ত পরদেশী

ছবির উৎস, Sandeep Yadav/BBC

‘গোরক্ষক’দের বক্তব্য

নাসিক শহরে ঢোকার আগে একটা পশু হাসপাতাল এবং গোশালা রয়েছে। সেখানে রাস্তার কুকুর, একটা বিড়াল ও কয়েক ডজন গরু রাখা ছিল।

এখানেই আমাদের সঙ্গে হেমন্ত পরদেশী নামে এক যুবকের দেখা হয়। নাসির হুসেন এবং আফ্ফানের মামলায় যে ১৪জনের নামে অভিযোগ ছিল, মি. পরদেশী তাদের মধ্যে অন্যতম।

হেমন্ত পরদেশীর দাবি, গোশালায় উপস্থিত গরুদের বেশিরভাগই হয় মহাসড়কে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল বা তাদের কসাইদের হাত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমি এক গো-রক্ষকের কাছ থেকে ফোন পাই, সমৃদ্ধি হাইওয়েতে যে টোল প্লাজা রয়েছে সেখানে গরুর মাংস আছে। আমরা ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে গ্রামের গোসুরক্ষা দলকে ফোন করে জানাই যে এমন একটা গাড়ি আছে যেখান থেকে রক্ত পড়ছে।”

“তারা গাড়ি থামিয়ে ১১২ নম্বরে (ইমার্জেন্সি নম্বর) কল করে। রাস্তায় উপস্থিত লোকজন ওদের মারধর করে এবং একজনের মৃত্যু হয়। আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না, আমি শুধুমাত্র আমাদের দলকে জানিয়েছিলাম মাত্র।”

মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মন্দার

ছবির উৎস, karwanemohabbat.in

আবার হামলা?

এই হামলার পর নাসির হুসেন গাড়ি চালানোর কাজ ছেড়ে দেন। এরপর তিনি একটা আবাসিক সোসাইটিতে মালির কাজ করতেন। পরে দেওনারে কসাইখানায় ভেড়া চরানোর কাজ শুরু করেন।

মামলার তিন বছর পর রমজানের সময় কিছু অর্থ আয় করার জন্য আবার গাড়ি চালানোর কাজ শুরু করেন। তার অভিযোগ, চলতি বছরের ছয়ই মার্চ ‘সমৃদ্ধি হাইওয়ে’তে চারজন তার উপর হামলা চালায়। তার হাতে-পায়ে আঘাত লাগে এবং পায়ের হাড় ভেঙে যায়।

তারপর থেকে আতঙ্কে রয়েছে তার পরিবার। তিনি যে এলাকায় থাকেন, সেখানেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

দেওনার মাণ্ডির কাছে এই চাওলে বসবাসকারী তরুণরা প্রায়শই মাংস পরিবহনকারীর কাজ করেন। ওই এলাকার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের তরফে ভোলা শাহ জানান, প্রায়শই গাড়ির চালকের উপর হামলা হয়। তার দাবি, গত কয়েক বছরে গোরক্ষকদের হাতে তার চারজন গাড়ি চালকের মৃত্যু হয়েছে।

ভোলা শাহ বলেন, “প্রতিটা ট্রিপে ড্রাইভাররা এই কথা ভাবতে ভাবতে যান যে আমরা ফিরে আসতে পারব কি? (এর উত্তর) একমাত্র আল্লাহই জানেন।”

আইন হাতে তুলে নেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, “প্রয়োজনে গাড়ি পরীক্ষা করুন, যদি সেটা অবৈধ হয় তবে পুলিশকে ডাকুন। পুলিশই ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমরাই বিচারক, আমরাই আইন, আমরাই রাস্তার সব কিছু…এই ভাবনার ফলে চালকরা এইভাবে মার খাচ্ছেন। তারা আতঙ্কিত।”

“গাড়ির চালকরা ভিতরে ভিতরে ভয় পাচ্ছেন যদিও যে কাজ তারা করছেন সেটা আইন মেনেই করছেন।।”

চিকিৎসার খরচের কারণে নাসির হুসেনের পরিবার এখন চরম ধারদেনায় জর্জরিত। বাড়ির নারীদের গয়না বিক্রি করতে হয়েছে। তার ছোট ভাইও কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

নাসির হুসেন ও তার বন্ধুর উপর হামলার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বিচার শুরু হয়নি।

হিন্দু ধর্মে গরুকে পবিত্র বলে মনে করা হয় এবং ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে গরু হত্যা ও চোরাচালান নিষিদ্ধ।

দেশে বেশ কয়েকটা গণপিটুনির ঘটনায় তথাকথিত গোরক্ষক বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

রাজস্থানের পেহলু খান, ঝাড়খন্ডের আলিমুদ্দিন আনসারি ও উত্তরপ্রদেশের মুহাম্মদ আখলাখের ঘটনাগুলি এধরণের গণপিটুনির সবথেকে আলোচিত ঘটনা।

ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস), ২০২৩-এর ১০৩ (২) ধারা প্রথমবারের মতো গণপিটুনিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে আখ্যা দিয়েছে। ২০২৪ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ভারতে এধরণের ১১২টা অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে।

নাসির হুসেন

ছবির উৎস, SandeepYadav/BBC

গণপিটুনির শিকার হওয়া ব্যক্তি ও তার পরিবারদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালে শুরু হয়েছিল ‘কারওয়ায়েঁ মোহাব্বত’ নামক এক প্রচারাভিযান অভিযান।

এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মন্দার এমন বহু ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন যারা গণপিটুনির শিকার।

তাই ধরণের ঘটনার পর ভুক্তভোগীদের উপর কী ধরনের সামাজিক প্রভাব পড়তে পারে সে সম্পর্কে তার সম্যক ধারণা রয়েছে।

হর্ষ মন্দারের অভিযোগ, ভিড়কে চালিত করে হত্যার মাধ্যমে কিছু গোষ্ঠী মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে চায়।

তিনি বলেন, “যখন দাঙ্গা হয়, সেই সময়েও ভুক্তভোগীদেরও একটা কমিউনিটি থাকে। হয়তো গ্রামের ৫০জন ভুক্তভোগী আছেন যারা একে অপরের সমর্থন পেতে পারেন। কিন্তু গণপিটুনির ক্ষেত্রে ব্যাপক একাকীত্ব কাজ করে। ভয় কাজ করে।”

এই মানবাধিকার কর্মীর অভিযোগ, গণপিটুনির ক্ষেত্রে সাধারণত এফআইআর খুব দুর্বল হয়।

তার কথায়, “আদালতের ভেতরে খুব অদ্ভুত পরিস্থিতি থাকে। ভুক্তভোগীরা ভয়ে ভয়ে থাকেন আর যারা মারধর করেছে, তারা অভিযুক্ত হয়েও বুক ফুলিয়ে প্রবেশ করে।”

মি. মন্দারের অভিযোগ, “তারা বিশ্বাস করে যে এটা একটা হিন্দু রাষ্ট্র। আদালত এবং পুলিশের সমর্থনও তারা পায়।”

নাসির হুসেন ও আব্দুল শামির তাদের উপর হওয়া হামলার ক্ষত নিয়েই বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন।

২০২৩ সালে, দক্ষিণ কন্নড় লিগ্যাল সার্ভিসেস মি. শামিরের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসাবে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে একটা চিঠি পাঠিয়েছিল। অন্যদিকে, নাসির হুসেনের আশঙ্কা তিনি আর কখনো গাড়ি চালাতে পারবেন না, কারণ তার বাঁ পা ভেঙে গেছে।