Home LATEST NEWS BANGLA চাষের মাছে গন্ধ হয় কেন, কী করলে গন্ধ থাকবে না?

চাষের মাছে গন্ধ হয় কেন, কী করলে গন্ধ থাকবে না?

4
0

Source : BBC NEWS

মাছ উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

বহুল প্রচলিত প্রবাদ ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ বাঙালি জাতিসত্তার এক অবশ্যম্ভাবী পরিচয় বহন করে আসছে বহু বছর ধরে। ফলে বাঙালির পাতে নানা রেসিপিতে মাছ ঘুরেফিরে থাকেই।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশে মাছ চাষের পরিসর বেড়েছে। ফলে মাছ উৎপাদন এবং এর রপ্তানিও বাড়ছে।

কিন্তু খেতে বসে অনেকেই অভিযোগ করেন চাষের মাছে গন্ধ পান তারা – এক ধরনের কাদা-কাদা কিংবা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।

এমনকি তাজা দেখে বাজার থেকে মাছ কেনার পর ধুয়ে-কেটে, রান্নার সময় নাকে লাগে গন্ধ, যা লেবু, লবন, হলুদ, আদা-রসুন দিয়ে ধুয়েও পুরোপুরি দূর হয় না।

জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন বা এফএও এর ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাছসহ জলজ প্রাণী উৎপাদন বা চাষে বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

আর অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে মাছ চাষে বড়ো ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান আড়াই শতাংশের বেশি।

কিন্তু ভোক্তার প্লেটে গিয়ে মাছের স্বাদ আর তৃপ্তি নিয়ে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।

এই গন্ধ আসলে কেন হয়? কী বলছেন মৎস্য বিজ্ঞানীরা? আর এর সমাধানই বা কী? চাষ করা মাছ নিয়ে এসব প্রশ্ন ঘুরেফিরেই সামনে আসছে।

মাছের খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ গবেষকদের

ছবির উৎস, Getty Images

গন্ধের কারণ কী?

বাংলাদেশে চাষ করা বিভিন্ন মাছে গন্ধের কারণ অনুসন্ধান এবং এ থেকে প্রতিকার পেতে বিভিন্ন গবেষণা করছেন মৎস্য বিজ্ঞানীরা।

গবেষকরা বলছেন, দুটি জৈব যৌগ মাছের শরীরে চর্বি ও চামড়ার নিচের লাল মাংসে গিয়ে জমা হয়। ফলে বারবার ধুলে বা রান্না করলেও গন্ধ পুরোপুরি যায় না।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল হক এ গন্ধের কারণ হিসেবে কয়েকটি ব্যাকটেরিয়া থেকে নিঃসৃত উপাদানকে দায়ী করেছেন।

তিনি বলছেন, “বদ্ধ পানি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় একজিনো ব্যাকটেরিয়া, মিকজো ব্যাকটেরিয়া এবং সায়ানো ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো থেকে দুই ধরনের কম্পাউন্ড – জিয়োসমিন এবং ২-মিথাইলআইসোবোর্নিওল নামে জৈব যৌগ নিঃসৃত হয়,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মূলতঃ পুকুরে মাছ চাষের জন্য মাছের ঘনত্ব, খাদ্য সরবরাহের পরিমাণ এবং পানি বদল করাসহ বেশকিছু নিয়ম রয়েছে। যা মাছ চাষীরা ঠিকভাবে মানছেন না বলে মনে করেন এ গবেষক।

তিনি বলছেন, “মাছের শরীরে চর্বি যেখানে থাকে অথবা মাছের দেহের উপরের যে চামড়া, যেখানে রেড মাসেল আছে সেসব জায়গায় জমে দুর্গন্ধটা তৈরি হয়।”

ব্যাকটেরিয়া যেভাবে বাড়ে

যে-সব ব্যাকটেরিয়ার কারণে চাষ করা মাছে গন্ধ তৈরি হয়, সেগুলো বৃদ্ধির তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।

তারা বলছেন, যে-সব পুকুর বা বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য চাষিরা বাড়তি খাবার দিচ্ছেন, পুকুরের আকারের তুলনায় মাছের ঘনত্ব বা পরিমাণও বেশি এবং পানি পরিবর্তন করা হচ্ছে না মূলত সেখানেই এ ধরনের সমস্যা বেশি হচ্ছে।

অধ্যাপক হক বলছেন, “বাংলাদেশের গ্রামে অসংখ্য পুকুর আছে, অনেক জায়গায় পানি বের করে পুরোনো পানি পরিবর্তন করার সুযোগ আছে, অনেক জায়গায় নেই। অনেকে খরচের কারণেও পানি পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেন না।”

বাংলাদেশের নদনদীতে মাছ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে বলেই দাবি করা হচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

গবেষকরা বলছেন, খরচ বাঁচাতে অনেক চাষি পানি বদলান না।

ফলে বছরের পর বছর পুকুরের তলায় কাদা, বর্জ্য জমে ‘গন্ধের কারখানা’ তৈরি হয়। এ কারণেই বহমান নদীর মাছে এই গন্ধ থাকে না।

এছাড়া অনেক মৎস্য চাষি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু মাছ সব খেতে পারে না। অর্থাৎ বাকি খাবার পুকুরের তলায় পচে।

যার সাথে যোগ হয় মাছের মলমূত্রও। এই পচনশীল জৈব পদার্থই ব্যাকটেরিয়ার আদর্শ খাবার।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “যত খাবার দেওয়া হচ্ছে সেটি মাছ পুরোপুরি গ্রহণ করে না ফলে অতিরিক্ত খাবার পানিতেই পঁচে যাচ্ছে। মাটি এবং পানির গুণাগুণের ওপরই মূলত মাছের স্বাদ ও গন্ধ নির্ভর করে।”

কেবল গন্ধ নাকি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও

গন্ধের পাশাপাশি চাষের মাছ খেয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে কিনা, এ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

২০২৩ সালে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর দুই গবেষক নাটোরের একটি বাণিজ্যিক খামারের রুই, মৃগেল, সিলভার কার্পসহ কয়েক প্রজাতির মাছের ওপর এ নিয়ে একটি পরীক্ষা করেছিলেন।

ওই গবেষণায় মৃগেল মাছে ক্রোমিয়ামের মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি পাওয়া গিয়েছিল।

ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন বলছে, খাবারে ক্রোমিয়াম দশমিক ১৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সহনীয়। এর বেশি হলে তা কিডনি ও যকৃতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, নিয়মিত পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার না করলে সেখানে ক্রমেই ভারী ধাতু ও আবর্জনা জমে। অন্তত তিন বছর পর পর পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার করা উচিত বলেও মনে করেন তারা।

পানির প্রবাহ ঠিক থাকলে মাছের উৎপাদন, স্বাদ ও গন্ধ ঠিক থাকে বলে মত গবেষকদের

ছবির উৎস, Getty Images

এ পরিস্থিতিকে “অ্যাকুয়াকালচার ভায়োলেন্স” বলে উল্লেখ করছেন মৎস্যবিজ্ঞানী অধ্যাপক হক।

তার মতে, “মাছ চাষের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগুলো মানা হচ্ছে কী-না মাঠ পর্যায়ে এটি পর্যবেক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বেশি লাভের আশায় মৎস্য চাষীরা স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল মানছেন না।”

তবে স্বস্তির বিষয় হলো, “বাংলাদেশে আমরা কাঁচা বা আধা-সিদ্ধ মাছ খাই না। ভালোভাবে রান্না করলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকটাই কম। কিন্তু মাছ খাওয়ার সময় যে তৃপ্তি, সেটা অনেকাংশেই কমে যায় অতিরিক্ত গন্ধের কারণে,” বলেন তিনি।

বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার

চাষ করা মাছে গন্ধ দূর করার জন্য এখন ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম’ নামে একটি নতুন মাছ চাষ পদ্ধতির কথা বলছেন মৎস্য বিজ্ঞানীরা।

এজন্য পানিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ক্লোরেলার মতো মাইক্রোঅ্যালগি ব্যবহার করে অ্যামোনিয়া ও বিষাক্ত গ্যাস কমানোর কথা বলছেন গবেষকরা। এছাড়া অতিরিক্ত সার ও নিম্নমানের ফিড প্রয়োগ কমানোর কথাও বলছেন তারা।

‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম’ পদ্ধতিতে পুকুরের পরিবর্তে পৃথক পানির ট্যাংকে স্বয়ংক্রিয় বর্জ্য অপসারণ, পানি শোধন ও পুনঃব্যবহার এবং ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলছেন, এ পদ্ধতিতে মাছের মল, না খাওয়া খাবার কিংবা পচা জৈব পদার্থ – সবকিছুই পানির স্রোতে গড়িয়ে মাঝের পাইপ দিয়ে বের হয়ে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়া তৈরির সুযোগ থাকে না।

সাথে এয়ার ব্লোয়ারের মাধ্যমে ট্যাংকে সবসময় অক্সিজেন দেওয়া হয়। এতে মাছ স্ট্রেস বা চাপমুক্ত থাকে এবং দ্রুত বাড়ে।

মাছ চাষে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা

ছবির উৎস, SCREEN GRAB

ইতোমধ্যে এ পদ্ধতিতে টেংরা, গুলশা, পাবদা ও শিং মাছ চাষ করে সফলতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের প্রধান গবেষক মো. মনিরুজ্জামান।

তিনি বলছেন, এ পদ্ধতিতে ওষুধ ব্যবহার ছাড়াই মাছ দ্রুত বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছের গন্ধ, স্বাদ এবং মানও ভালো রাখা সম্ভব। এছাড়া খরচ কমের পাশাপাশি পরিচালন পদ্ধতিও বেশ সহজ।

তিনি বলছেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্টকিং ডেনসিটি অপ্টিমাইজ করা। এখানে শিং মাছের ক্ষেত্রে ৮০ কেজি থেকে ১৩০ কেজি পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রোডাকশন পেয়েছি। ক্যাটফিশের স্বাভাবিক কালচার সাত মাস, কিন্তু আমরা ১২০ দিনেই কোনো ধরনের মেডিসিন ইউজ না করে হারভেস্টে নিয়ে আসছি।”

“এ পদ্ধতিতে মাছের মধ্যে কোনো গন্ধ থাকে না, কাদার গন্ধ থাকে না এবং এটার কালারটা খুবই সুন্দর। খুব কম জায়গায় অধিক মাছ উৎপাদন করা যায়,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

এ পদ্ধতি ব্যবহার করে শহরে ঘরোয়া পর্যায়ে মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনাও দেখছেন গবেষকরা।

অর্থাৎ, এখন ঢাকা বা অন্যান্য শহরের বাসার ছাদে, একটি শেডের ভেতরেও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গন্ধহীন মাছ উৎপাদন করা সম্ভব বলেই দাবি মি. মনিরুজ্জামানের।

খুব দ্রুতই মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ের মৎস্য চাষি ও উদ্যোক্তাদের দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।