Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Tapas Mallick/BBC
রাস্তার একদিকে কয়েকজন তরুণ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলতে শুরু করেছিলেন, রাস্তার অপর দিক থেকে আরেকটি দল, যাদের গলায় গেরুয়া গামছা, কপালে তিলক। এই দ্বিতীয় দলটি ‘দিল্লি পুলিশ জিন্দাবাদ’ বলে পাল্টা স্লোগান তুলতে শুরু করেন।
ঘটনাটি যখন ঘটছিল, তখন প্রায় দুপুর সাড়ে ১২টা। দিল্লি পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, যন্তর মন্তরে ১৬৩ নম্বর ধারা বলবৎ ছিল, যার জেরে যে কোনও রকম জমায়েত নিষিদ্ধ। তবে এই দুই জটলা যখন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল, তখন একটি পার্থক্য চোখে পড়ল।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে যারা স্লোগান তুলছিল, তাদের চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে গিয়ে ওই স্থান থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া হলো। অন্যদিকে যারা ‘দিল্লি পুলিশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিচ্ছিল, তাদের পুলিশ অনুরোধ করে সেখান থেকে সরিয়ে দিল।
১০ই অক্টোবর দিল্লি প্রায় চারটি স্তরবিশিষ্ট দুর্গে পরিণত হয়েছিল। যন্তর মন্তর অবধি পৌঁছতে পারলেও সেখানে অবস্থান করতে পারেননি আজ কেউই।
ছবির উৎস, Tapas Mallick/BBC
চারটি স্তরে দিল্লিতে মোতায়েন পুলিশ
যন্তর মন্তরের উদ্দেশ্যে যখন রওনা দিই, তখন সকাল সাতটা। নয়ডা ও দিল্লির সংযোগকারী ফ্লাইওভার ‘ডিএনডি’ অতিক্রম করার সময়ে দেখলাম টোল বুথ অর্থাৎ দিল্লির প্রবেশদ্বারের সামনেই বিভিন্ন গাড়ি আটকে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।
মূলত যে গাড়িগুলি আটকানো হচ্ছিল, সেখানে চালক বা সামনের আসনে তরুণ কেউ বসে আছেন।
দ্বিতীয় স্তরটি একমাত্রিক নয়, দিল্লির বিভিন্ন রাস্তায় পুলিশের সজাগ নজর পরীক্ষা করছে পথের সব গাড়িতে। প্রথম যেখানে গিয়ে আমাদের গাড়ি বাধাপ্রাপ্ত হলো, সেটি হলো মান্ডি হাউজ সার্কেল। এই রাস্তা থেকেই সোজা কনট প্লেসের দিকে চলে যায় বারাখাম্বা রোড।
ব্যারিকেড করে সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ আটকানো হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের এই ব্যারিকেড টপকাতে বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। কনট প্লেস অবধি বাধার মুখে পড়তে হয়নি। এই কনট প্লেস থেকে যন্তর মন্তরের দূরত্ব মাত্র ৪০০ মিটার।
ফলে এই এলাকাতেই সবথেকে বেশি পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন ছিল।
শুধু তাই নয়, এখানে দাঁড় করানো ছিল দাঙ্গারোধী যান, জলকামান, প্রিজন ভ্যান ও ৩০টিরও বেশি বাস। দিল্লি ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের মেয়াদোত্তীর্ণ এই বাসগুলিকে দিল্লি পুলিশ আজ বিক্ষোভকারীদের আটক করতে ব্যবহার করেছে।
নিরাপত্তার আরেকটি স্তর যা অদৃশ্য থাকলেও পদে পদে সমস্যার সৃষ্টি করেছে, তা হলো যন্তর মন্তরের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া। যার ফলে সহকর্মী ও সংবাদমধ্যমের পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সমস্যজনক হয়ে পড়েছিল। ওই স্থান থেকে এটাও জানা যাচ্ছিল না যে এই অঞ্চলের বাইরে কী ঘটছে।
ছবির উৎস, Tapas Mallick/BBC
‘কতদিন দিল্লি এরকম স্তব্ধ রাখা সম্ভব?’
এই অঞ্চলে আজকে বিক্ষোভকারীদের সংখ্যার থেকে বেশি চোখে পড়ল সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ভিড়।
যখনই কেউ কোনো প্ল্যাকার্ড হাতে আসছেন, তখনই তাকে দিল্লি পুলিশ সেখান থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। কারো সঙ্গে বাদানুবাদ শুরু হচ্ছে। আবার কাউকে বাহিনী কোলে তুলে বা টেনে হিঁচড়ে বাসে তুলছে।
বিক্ষোভকারীদের প্রতি সকাল থেকে দিল্লি পুলিশের যে আচরণ দেখা গেল, তা জুলাই মাসে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। কিছু জায়গায় পুলিশ সংবাদমাধ্যম ও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েছে বলেও জানা গেছে।
বিক্ষোভকারীরা যারা আসছিলেন, তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন কৌতুকপূর্ণ মিমের প্ল্যাকার্ড। তবে তাদেরও পুলিশ দেখামাত্রই আটক করে। শুরু থেকেই পুলিশের মনোভাব ছিল, যে কোনো প্রকারে জমায়েত সৃষ্টি হওয়া আটকানো, যে প্রচেষ্টায় তারা আজ সফল।
যন্তর মন্তরে আজ কোনো জমায়েত হয়নি, বা বলা ভাল, হতে দেওয়া হয়নি।
এরই মধ্যে একজন বিক্ষোভকারীর সঙ্গে দেখা হলো।
তিনি পেশায় আইনজীবী। তিনি বললেন, তার বাড়ির সবার নাম এসআইআর প্রক্রিয়ার পর ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তিনি এবং তার পরিবার যে কীভাবে নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তুলবেন, তা নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
হঠাৎ একটা ডাকে পেছনে ঘুরে তাকালাম, একজন বৃদ্ধ, তার চুল দাড়ি সাদা, পরনে সাদা পাঞ্জাবি ও উত্তর ভারতীয় কায়দায় সাদা ধুতি। সাদা পাগড়িতে ভারতের জাতীয় পতাকা লাগানো। উনি জিজ্ঞেস করছিলেন আমি খেয়েছি কিনা। সৌজন্যমূলক হ্যা বলে দিল্লির এই ছবি নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার বয়স ৮২, এমন অবস্থা আমি আগে দেখিনি।”
“মাত্র দুটোই তো পক্ষ, সরকার ও বিক্ষোভকারী। তাদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করলেই হয়।”
ওই বিক্ষোভে উপস্থিত এক তরুণ বললেন, “দিল্লি একটা প্রাণবন্ত শহর। একদিন তাকে স্তব্ধ করে রাখা যায়, কিন্তু তরুণদের কণ্ঠ কতদিন এভাবে দমিয়ে রাখা সম্ভব?”
ছবির উৎস, Tapas Mallick/BBC
দিল্লির অন্যদিকে তখন যা ঘটছিল
শুরুতেই, সিজেপির শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাসকে নাটকীয়ভাবে বিমান থেকেই আটক করেছে পুলিশ। পরিচিত ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে তার বাড়ি থেকেই আটক করে পুলিশ।
চার রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জী, দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার মানিক সরকার — শনিবারের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে এরা সকাল থেকেই পুলিশের হাতে আটক হন।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি ও বামপন্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকে অন্তত হাজার খানেক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লিতে পৌঁছনো মাত্রই আটক করা হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বকে। আটক হয়েছেন বামপন্থী ছাত্র নেত্রী নেহা বোরাও। পরে ছাড়া পেয়ে দিল্লির অপর প্রান্ত, যন্তর মন্তর থেকে আনুমানিক ১০ কিলোমিটার দূরে দিল্লি হাট অঞ্চলে অবস্থান করতে শুরু করেন তিনি।
বিকেল চারটে নাগাদ জানা যায়, মমতা ব্যানার্জী সহ তার দলীয় সতীর্থদের হরিয়ানার কাছে উত্তর দ্বারকা থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ। এর কিছুক্ষণ আগে, বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ পুলিশের হাতে আটক হন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
ছবির উৎস, Tapas Mallick/BBC
খাঁ খাঁ করছে দিল্লির ‘পার্টি ক্যাপিটাল’ কনট প্লেস
এদিকে গত রাত থেকে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শিখ গুরুদোয়ারা বাংলা সাহিবে আশ্রয় নিয়েছিলেন যে কয়েক শো বিক্ষোভকারী, তারা যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে গেলে সেখানে লাঠিচার্জ করা হয় বলে জানা যাচ্ছে।
ফলে আন্দোলনের যারা মুখ হতে পারতেন, তাদের সবাইকে যন্তর মন্তর থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল পুলিশ।
মাইকে যন্তর মন্তর সংলগ্ন অঞ্চলে ক্রমাগত দুটি নির্দেশিকা বারংবার হিন্দি ও ইংরেজিতে বাজছিল। একবার বলা হচ্ছিল ১৬৩ ধারা বলবৎ থাকার কারণে যে কোনও রকম জমায়েত, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ নিষিদ্ধ। এবং পরক্ষণে বলা হচ্ছিল, সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা যেন কোনো ভাবেই পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মাঝে না আসেন।
এই দুই নির্দেশিকা নতুন নয়, গত দুই দিন ধরেই দিল্লি পুলিশ এই নির্দেশিকা বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়ে আসছে।
এক কথায়, দিল্লি যেভাবে আজ দুর্গের আকারে পরিণত হয়েছিল, তা নজিরবিহীন। দিল্লির কনট প্লেস উইকেন্ড পার্টি ডেস্টিনেশন বলেও পরিচিত। সেখানে আজ খোলা নেই কোনও রেস্তোরাঁ ও পানশালা। দিল্লির কনট প্লেসকে শনিবার এত ফাঁকা দেখাটাই ছিল অন্যতম আশ্চর্যের বিষয়।




