Home LATEST NEWS BANGLA দুই দিনে সাতজনকে হত্যা, মণিপুরে কুকি ও নাগা গোষ্ঠীর মধ্যে সহিংসতা বাড়ছে...

দুই দিনে সাতজনকে হত্যা, মণিপুরে কুকি ও নাগা গোষ্ঠীর মধ্যে সহিংসতা বাড়ছে কেন?

2
0

Source : BBC NEWS

একাদশ শ্রেণিতে পড়া উইফেনবো এবং নার্সিং নিয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করা কিমবোই সিংসনকে হত্যা করা হয়েছে

মণিপুরে ২১শে সেপ্টেম্বর ১৭ বছর বয়সী এনকে উইফেনবো খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে তামেই শহরের দিকে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু পথে কিছু সশস্ত্র হামলাকারী তাকে গুলি করে হত্যা করে। একাদশ শ্রেণির ছাত্র উইফেনবো মণিপুরের তামেংলং জেলার আপার এনকৌ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

এ ঘটনায় তার বাবা মাহিনলাকবোউ ভেঙে পড়েছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, “আমার নির্দোষ ছেলেকে এত নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো, তার অপরাধটা কী ছিল?”

লিয়াংমাই নাগা সম্প্রদায়ভুক্ত উইফেনবোর ওপর এই হামলা সকাল আনুমানিক সাড়ে দশটার সময়ে হয়েছিল।

ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ১৫ই সেপ্টেম্বর তামেংলং জেলার লেইসাংফাই গ্রামে সন্দেহভাজন কট্টরপন্থীরা মাঠে কর্মরত দুই নারীকে হত্যা করেছিল।

হামলায় নিহত ৬০ বছর বয়সী চোঙ্গা সিটলহৌ এবং ৩০ বছর বয়সী কিমবোই সিংসন কুকি সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন।

মিজ. কিমবোই সম্প্রতি নার্সিংয়ের পড়াশোনা শেষ করেন। তার ওপর হামলার সময়ে তিনি মাঠে তার মাকে কাজে সাহায্য করে ফিরছিলেন।

এই তিন ঘটনার বাইরে গত দুদিন মানে শনি ও রোববার ঘটা একাধিক হামলায় সাত জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এর মধ্যে তিন জন একইসঙ্গে ছিলেন।

মণিপুরে ২০২৩ সালের মে মাস থেকে জাতিগত সংঘর্ষ চলছেই; শান্তির আবেদন জানিয়ে দিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত এক বিক্ষোভের ছবি (ফাইল ছবি)

দুই দিনে সাত জনকে হত্যা

শনিবার সেনাপতি জেলায় হওয়া এক হামলায় এ পর্যন্ত তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। কালেনজাং গ্রামের প্রধানের বাড়িতে ওই হামলার সময়ে তিনজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

নিহত সবাই নাগা সম্প্রদায়ের সদস্য। গত প্রায় সাত মাসে মণিপুরে অন্তত ৫০ জনকে খুন করা হয়েছে।

মণিপুরে ২০২৩ সালের মে মাস থেকে মেইতেই সম্প্রদায় ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত সংঘর্ষ চলছেই।

তবে সাম্প্রতিক এই সহিংসতা কুকি-জো ও তাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। দুই সম্প্রদায়েরই বসবাস রাজ্যের ১১টি পার্বত্য জেলায়।

সেনাপতি, উখরুল, তামেংলং, কামজং ও নোনি জেলায় নাগাদের প্রাধান্য রয়েছে। অন্যদিকে চুরাচাঁদপুর, কাঙপোকপি, তেংনৌপাল ও চান্দেল জেলায় কুকিদের প্রভাব বেশি।

আর বাকি জেলাগুলোতে নাগা ও কুকি, দুই জনজাতিরই মিশ্র জনসংখ্যা রয়েছে।

দুই জনজাতির মধ্যে সহিংসতার ইতিহাস

এ বছর সাতই ফেব্রুয়ারি উখরুল জেলার লিটন গ্রামে কুকি ও নাগা জনজাতির কয়েক জন যুবকের মধ্যে কথিতভাবে মদ্যপ অবস্থায় বচসা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনার পরের দিন কিছু সশস্ত্র দুষ্কৃতী গ্রামের কয়েক ডজন বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এরপরই দুই জনজাতির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয়।

দীর্ঘদিন ধরে মণিপুরের সংঘাতপ্রবণ এলাকায় কাজ করা মানবাধিকার কর্মী কে ওনিল বলেন, “কুকি-নাগা সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দুই গোষ্ঠীই খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাস করলেও সংঘাতের মূল কারণ জমি।”

পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী দুই জনজাতির মধ্যে গত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকেই বিরোধ চলে আসছে

তিনি বলেন, “আসলে নাগা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কুকিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আর সে কারণেই এই সহিংসতা। কুকিরা গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করে, কিন্তু নাগারা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কেন্দ্রীভূত।

নাগা-অধ্যুষিত উখরুল, কামজংয়ের মতো জেলায় কুকিরা বসবাস করে, কিন্তু কুকি-অধ্যুষিত এলাকায় নাগাদের বসবাস নেই। এটিই একটি বড় সমস্যা।”

“এ বছর ফেব্রুয়ারিতে দুই জনজাতির মধ্যে সংঘাত হয়তো একটি সাধারণ ঝগড়া থেকে শুরু হয়েছিল, কিন্তু আধিপত্যের এই লড়াই বহু পুরনো।”

পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী এই দুই জনজাতির মধ্যে গত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকেই ভূমি ও আঞ্চলিক বিরোধ চলে আসছে।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে দুই জনজাতির মধ্যে ব্যাপক সহিংস সংঘর্ষ হয়েছিল, যাতে শত শত মানুষের প্রাণ হারিয়েছিলেন।

ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন মোরের কাছে কুকি ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে যুক্ত ১৮ বছর বয়সি ওংখোলেত হাওকিপকে ১৯৯২ সালে হত্যা করা হয়েছিল।

এর পর কুকি ও নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে সহিংসতা চলতে থাকে। ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ওই সংঘাতে প্রায় এক হাজার কুকি এবং প্রায় ৪০০ নাগার মৃত্যু হয়েছিল।

সেই সময়ে শত শত বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় অন্তত ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছিলেন বলে জানা যায়।

নিজেদের এলাকার নিরাপত্তায় মোতায়েন সশস্ত্র কুকি যুবকেরা

সাধারণ মানুষ হত্যায় জড়িত ‘কট্টরপন্থী’ গোষ্ঠী

গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত যত জনের মৃত্যু হয়েছে, তার জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা ‘কট্টরপন্থী’ গোষ্ঠীগুলোকেই দায়ী করেছেন।

এক অর্থে বলতে গেলে, এই সংঘাতে সাধারণ মানুষ সরাসরি একে অপরকে হত্যা করছে না। প্রায় সব হামলার ক্ষেত্রেই ‘কট্টরপন্থী’ গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে নাগা সম্প্রদায়ের সদস্যদের হত্যার পর নাগাদের বিভিন্ন শীর্ষ সংগঠন যে বিবৃতিগুলো প্রকাশ করেছে, তার বেশিরভাগেই ‘সাসপেনশন অব অপারেশনস’-এর আওতায় থাকা কুকি সশস্ত্র কট্টরপন্থীদের দায়ী করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কুকি-জো জনজাতির প্রধান নাগরিক সংগঠনগুলো এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য এনএসসিএন-আইএম এবং জেলিয়াংরং ইউনাইটেড ফ্রন্ট-কামসন নামে পরিচিত কট্টরপন্থী গোষ্ঠীকে দায়ী করে আসছে।

কুকি জনজাতির অন্যতম প্রধান সংগঠন কুকি ইম্পি মণিপুরের মুখপাত্র লুন কিপগেন বিবিসিকে বলেন, “নাগা সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ পরিকল্পিতভাবে এ সংঘাতের সূচনা করেছে। তা না হলে ফেব্রুয়ারিতে কয়েক জন যুবকের মধ্যে হওয়া একটি সাধারণ ঝগড়া এত বড় সহিংসতার রূপ নিত না।”

তিনি আরও বলেন, “এ লড়াই জমির অধিকার বা জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে নয়, কারণ দুই জনজাতিই তফসিলি জনজাতির মর্যাদা পায়। আসলে তাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই সংঘাতের পরিকল্পনা করছিল। সেই কারণেই সংঘাতের শুরু নাগা-অধ্যুষিত উখরুল থেকে হয়েছে।”

বর্তমান সহিংসতায় ‘কট্টরপন্থীদের’ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মি. কিপগেন বলেন, “তাংখুল নাগারা চায় মণিপুরের পার্বত্য জেলাগুলোতে জমি ও প্রশাসনিক স্তরে শুধু তাদেরই আধিপত্য থাকুক। এনএসসিএন-আইএম দীর্ঘদিন ধরে বৃহত্তর নাগালিমের দাবি জানিয়ে আসছে। এই লড়াই সেই পরিকল্পনারই অংশ।”

তিনি আরও বলেন, “তাংখুলরা এই সংঘাতে গোটা নাগা সম্প্রদায়কে জড়িয়ে ফেলছে, অথচ এই সংঘাত মূলত লিয়াংমাই, তাংখুল ও কুকিদের মধ্যে। অন্য জেলাগুলোতে কুকি ও অন্যান্য নাগা জনজাতির মধ্যে তেমন কোনও সমস্যা নেই।”

ভারত সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়া এনএসসিএন-আইএম, অর্থাৎ ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড-আইএম, উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে পুরোনো এবং নাগা কট্টরপন্থীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন।

বর্তমানে এনএসসিএন-আইএমের নেতৃত্বে রয়েছেন থুইঙ্গলেং মুইভা, যিনি মণিপুরের তাংখুল জনজাতির সদস্য।

মণিপুরে সশস্ত্র বাহিনীর পাহারায় এক চাষি

কেন থামছে না সহিংসতা?

মণিপুরের পার্বত্য জেলাগুলোতে চলা জাতিগত সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, আসাম রাইফেলস এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

তবে এখনও পর্যন্ত সহিংস ঘটনায় উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি।

সম্প্রতি কাঙপোকপিতে তিন গ্রামবাসী হত্যার ঘটনায় জেলার পুলিশ সুপার রাহুল গুপ্তা বিবিসিকে বলেছিলেন, “পুলিশ মামলা দায়ের করেছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মণিপুর সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের এক কর্মকর্তা জানান, “অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। পাশাপাশি দুই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আলোচনা চলছে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সব ধরনের পদক্ষেপ করা হচ্ছে।”

এদিকে, শনিবার গুয়াহাটিতে ভারত সরকার ও মণিপুর সরকারের সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে ঐকমত্য হওয়ার পর ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি) অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছে।

গত প্রায় ছয় মাস ধরে নাগা সংগঠনটি রাজ্যের উপর দিয়ে যাওয়া একাধিক জাতীয় সড়কে অর্থনৈতিক অবরোধ চালিয়ে আসছিল।

রাজ্য সরকারের এক কর্মকর্তা বলেন, “জাতিগত উত্তেজনা কমানো এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরাতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের উপস্থিতিতে ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিলের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে।”

“নিরীহ নাগরিকদের হত্যার প্রতিটি ঘটনার পৃথক তদন্ত করা হচ্ছে। কয়েকটি গুরুতর মামলার তদন্তের দায়িত্ব ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি এনআইএ-কেও দেওয়া হয়েছে।”

এনআইএ ভারতের সন্ত্রাস দমন এজেন্সি।

মণিপুরে বসবাসকারী নাগা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন ইউএনসি-র সভাপতি এনজি লোরহো বলেন, “কুকি কট্টরপন্থীরা প্রায়ই নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করছে।”

সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি বলেন, “আমরা ভারত সরকারের কাছে আমাদের সব দাবি জানিয়েছি। নাগা নাগরিকদের নিহত হওয়ার ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং কুকি কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”

“কয়েকটি কুকি-জোমি সশস্ত্র গোষ্ঠী, যাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ আছে, তাদের সঙ্গে ‘সাসপেনশন অব অপারেশনস’ চুক্তি বাতিল করার দাবিও আমরা জানিয়েছি।”