Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, TARIKUL HASAN
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট
বাংলাদেশের উত্তরাঞলীয় জেলা নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন।
নাটোর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরিফুল হক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, বরগুনা থেকে রাজশাহীগামী আরপি স্পেশাল বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ঘটনাস্থলেই ১২ জনের মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। আহতদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নাটোর সদর হাসপাতালসহ স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় নিহতদের সবার পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন।
নিহতদের মধ্যে একজন শিশুও রয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানান বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস।
মরদেহগুলো প্রাথমিকভাবে বনপাড়া হাইওয়ে থানায় রাখা হয়। পরে পরিচয় নিশ্চিতের পর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
দুর্ঘটনার কারণ জানতে নাটোরের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন।
এখন থেকে ঠিক এক যুগ আগে ২০১৪ সালের ২০শে অক্টোবর এই বড়াইগ্রামেই এমন একটি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৩ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছিল।
উপজেলা প্রশাসন বলছে, এই নাটোর পাবনা মহাসড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে এবং তাতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
ছবির উৎস, TARIKUL HASAN
কীভাবে ঘটলো দুর্ঘটনাটি?
বরগুনা থেকে আসা আরপি পরিবহনের বাসটি বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়।
দুর্ঘটনাটির পরই ঘটনাস্থলে পৌছায় ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ। বাসটিতে থাকা যাত্রী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ।
জেলা পুলিশ সুপার শরিফুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বালুবাহী যেই ট্রাকটির সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে সেই ট্রাকটি বাম লেনেই ছিল। কিন্ত বাসটি হঠাৎ রাইট সাইডে চলে যাওয়ার পরই মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়”।
এই দুর্ঘটনায় আরপি স্পেশাল বাস ও ট্রাক দুইটিরই চালক নিহত হয়।
বরগুনা থেকে রাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাসটি নাটোরে পৌছাতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লেগেছে এবং ভোরে বাসটির চালক ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে বলেও প্রাথমিক ধারণা পুলিশের।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বলেন, “ট্রাকটি কিন্তু তার লাইনেই ছিল। বাসের ড্রাইভারের তন্দ্রা বা ঘুম ভাব চলে এসেছিল। সে কারণেই ট্রাকটিকে ধাক্কা দিয়েছে”।
তিনি জানান, বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ায় বাস ও ট্রাক দুইটি পরিবহনেরই চালক নিহত হয়েছে। এছাড়া বাসের সামনের দিকে যারা ছিল তাদের অনেকেই এই দুর্ঘটনায় নিহত হন।
পুলিশ সুপার মি. হক বলেছেন, দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে যারা যাত্রী ছিলেন তাদের সবাই কমবেশি আহত হয়েছেন। আর ট্রাক ড্রাইভারের মরদেহ ট্রাকের দরজা কেটে বের করতে হয়েছে।
ঘটনার পরপরই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বাসটিকে সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে দুপুর পর্যন্ত বালুবাহী ট্রাকটিকে রাস্তা থেকে সরানো যায়নি।
ছবির উৎস, TARIKUL HASAN
নিহত ১২ জনের পরিচয় শনাক্ত
দুর্ঘটনার খবর পেয়েছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
বরগুনা বরিশাল থেকে বাসটি ছেড়ে এলে পথে মাদারীপুরসহ কয়েকটি জায়গা থেকে বাসটিতে উঠেছিল যাত্রীরা।
দুর্ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের সংখ্যা ১৪ জন জানানো হলেও পরবর্তীতে ১২ জনের কথা নিশ্চিত করে।
নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে ১৪ জনের কথা শুনেছিলাম। পরবর্তীতে ১২ জনের বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি”।
নিহত ১২ জনের মরদেহ দুপুর পর্যন্ত বনপাড়া হাইওয়ে থানায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে তারা হলেন- রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার শিশু তাছফিয়া (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), জুয়েল (৪০), সালাম মোল্লা (৪৬), কাশেম (৩৫),শাহীন (৩২),শহিদুল ইসলাম (৪৫), ট্রাক ড্রাইভার ঝিনাইদহ সদর উপজেলার আবুল কালাম (৫৬)। নওগাঁর সান্তাহারের ঘোনঠোলা এলাকার রাসেল আলী(৩৩), ফরিদপুর সদরের হিমেজ জামাদার। এছাড়া দুর্ঘটনা কবলিত বাসের ড্রাইভার মো. সোহেল রানা (৪০) তিনি রাজশাহীর গোদাগাড়ী এলাকার বাসিন্দা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে বলেন, “নিহত ১২ জনের বাইরেও হাসপাতালে যাদের ভর্তি করা হয়েছে তাদের বেশ কয়েকজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। গুরুতর আহত বেশিরভাগকেই রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে”।
এছাড়াও যারা অল্প আহত তাদের নাটোর সদর হাসপাতালসহ আশপাশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নিহতের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নাটোরের পুলিশ সুপার মি. হক।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই ঘটনায় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
ছবির উৎস, TARIKUL HASAN
বড়াইগ্রামে প্রায়ই ঘটেছে দুর্ঘটনা
নাটোরের বড়াইগ্রামের এই মহাসড়কে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়।
স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর খবরে বলা হচ্ছে ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর একই দিনে উপজেলার রেজুর মোড়ে একটি বড় ধরনের বাস দুর্ঘটনা ঘটে এবং ওই ঘটনায় ৩৩ থেকে ৩৮ জন নিহত হন।
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা প্রশাসন বলছে, এই সড়কটিতে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে সেই তুলনায় এই সড়কটি ছোট। যে কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলছিলেন, “এই সড়কটি অনেকটাই ওভারলোডেড। অনেক বেশি যান চলাচল করে। আবার অনেক যানবাহন উচ্চ গতিতে চলাচলের কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটছে। যদি রাস্তাটি চার লেনের করা যায় তাহলে এই এলাকায় দুর্ঘটনা কিছুটা কমানো যাবে”।




