Home LATEST NEWS BANGLA নেপালে নিখোঁজ ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিক সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে

নেপালে নিখোঁজ ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিক সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে

3
0

Source : BBC NEWS

নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশুলি বাজারে আকস্মিক বন্যার পরে ড্রোন দিয়ে তোলা ছবি

ছবির উৎস, Prabin RANABHAT / AFP via Getty Images

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তঘেঁষা তিমুরে এলাকায় ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা যায়নি বলে বৃহস্পতিবার দুপুরে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে এর আগে নিখোঁজ থাকা ২১ জন ভারতীয় পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কলকাতা থেকে যাওয়া দুই জন পর্যটকও আছেন বলে জানা গেছে।

নেপালের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পর্যটক ও বিভিন্ন সংস্থার নিরাপত্তাকর্মীসহ মোট ৮২৬ জন এখনো নিখোঁজ। তাদের মধ্যে ৫৭৯ জনই বিভিন্ন দেশের পর্যটক।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দুপুর আড়াইটা নাগাদ সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছেন, নেপালে এখনো ২৮৮ জন ভারতীয়র সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন যে ভারত ছাড়া ৫৪ জন মার্কিন নাগরিক, ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার এক দিন পরও উদ্ধার তৎপরতা জোরেসোরে চলছে। মৃতের সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়ছে।

কান্নায় ভেঙে পড়েছেন নিখোঁজ মানুষদের স্বজনরা

ছবির উৎস, Ritesh Shukla/Getty Images

পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া বহু পর্যটক নিখোঁজ

নিখোঁজদের তালিকায় কলকাতা থেকে যাওয়া ৩২ সদস্যের কৈলাস- মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা দেওয়া একটি তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের দলও আছে। এই দলে ৩০ জন তীর্থযাত্রী এবং দু’জন ট্যুর ম্যানেজার রয়েছেন বলে সংবাদসংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন একজন কর্মকর্তা।

তিনি বলেছেন, “আকস্মিক বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে দলের ৩২ জন সদস্যের কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করা যায়নি। উদ্ধার ও ত্রাণ সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে।”

কলকাতা মেট্রো রেলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ৬৩ বছর বয়সি রণজিৎ কুমার হাওলাদার ছিলেন এই পর্যটকদের মধ্যে একজন। তিনি বেহালার পর্ণশ্রী অঞ্চলের বাসিন্দা।

তার স্ত্রী গায়ত্রী হাওলাদার বিবিসিকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাত প্রায় ১০টার দিকে তিনি শেষবারের মতো স্বামীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, “রাতটা বিশ্রাম নিয়ে পরদিন সকালে ইমিগ্রেশন চেকপয়েন্টের উদ্দেশে রওনা দেবেন। তিনি খুব স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন। ভ্রমণের প্রতিটি খুঁটিনাটি আমাদের সঙ্গে সবসময়ে শেয়ার করতেন না। তিনি ঘুরে বেড়াতে ভীষণ ভালোবাসতেন, আর এটি ছিল তার স্বপ্নের গন্তব্যগুলোর একটি,” বলেন তিনি।

মিসেস হাওলাদার জানান, রেলওয়ে থেকে ২০২৩ সালে অবসরের পরই এই তীর্থযাত্রায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তার স্বামী। দীর্ঘদিন ধরে সেই অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ সংস্থা।

এদিকে, মুম্বাইয়ে কর্মরত তার মেয়ে সুনন্দা বুধবার আকস্মিক বন্যার খবর পাওয়ার পরই কলকাতায় ফিরে আসেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নিখোঁজ বাবার সন্ধানে তিনি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন। থানায় গিয়েছেন, ভ্রমণ সংস্থার অফিসেও খোঁজ নিয়েছেন, কিন্তু কোনো নিশ্চিত তথ্য পাননি।

মিজ. সুনন্দা বিবিসিকে বলেন, “ভ্রমণ সংস্থার প্রতিনিধিরা আমাদের জানিয়েছেন, তাদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত দুই নারী পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু বাকি পর্যটকদের বিষয়ে তারা কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। বুধবার রাতে দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন বাবার সফর-সংক্রান্ত তথ্য জানতে। কিন্তু তারাও বাবার ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।”

তিনি আরও বলেন, এই সফরে বাবার সঙ্গে তারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কর্মস্থল থেকে ছুটি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত যাত্রায় যোগ দিতে পারেননি।

নিখোঁজ এবং নেপালে দুর্যোগের কারণে আটকে পড়া এই ব্যক্তিদের মধ্যে পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের এক দম্পতি এবং অন্য একটি পরিবারও আছে। এছাড়া হুগলি জেলার তারকেশ্বরের বাসিন্দারাও আছেন। তারা গত ২১শে অগাস্ট নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। রাসুয়া থেকে ইমিগ্রেশন করে তিব্বতে প্রবেশ করার কথা ছিল তাদের।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অরিন্দম গাঙ্গুলি, তার স্ত্রী মৌসুমী গাঙ্গুলি দু’জনেই দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন বা ডিভিসির অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। সঙ্গে ছিল তাদের কন্যা অঙ্কিতা গাঙ্গুলি।

এছাড়াও দুর্গাপুরের আরেক দম্পতি দেবাশিস ব্যানার্জী ও সংঘমিত্রা ব্যানার্জীও এই পর্যটক দলের অংশ। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

হুগলীর তারকেশ্বরের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সি স্নেহাশিস দত্ত ও জয়ন্ত সান্যালও নিখোঁজ। জয়ন্ত সান্যাল হলেন কলকাতার পর্যটন সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা।

এছাড়াও শিলিগুড়ি ও পশ্চিমবঙ্গের অন্য কয়েকটি অঞ্চল থেকেও কয়েকজন নিখোঁজ বলে জানা যাচ্ছে।

অকাশপথে উদ্ধারের আশায় বহু মানুষ

ছবির উৎস, Arun SANKAR / AFP via Getty Images

নিখোঁজ তামিলনাডুর ৮৬ জন পর্যটক

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তামিলনাডুর ২১ জনকে উদ্ধার করার পরেও তামিলনাড়ু থেকে যাওয়া ৮৬ জন পর্যটক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

পররাষ্ট্র মুখপাত্র রনধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, তামিলনাডুর দুটি দলের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। দুটি দলে ৩৭ ও ৪৯ জন আছেন ও তারাও তিব্বতের মানস সরোবরের দিকে যাচ্ছিলেন।

এছাড়াও তামিলনাডুর কোয়েম্বাটোর-ভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন ইশা ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, তাদের ৮০ জন সদস্য নেপালের এক ইমিগ্রেশন অফিসে ছিলেন, কিন্তু আকস্মিক বন্যার কবলে পড়ার পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও বিদেশি নাগরিক।

ইশা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদগুরু বলেছেন যে, ইমিগ্রেশন অফিসে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি আরও জানান যে, ফাউন্ডেশনের অন্য ৪৯৫ জন সদস্য নিরাপদে ফিরে এসেছেন।

বন্যায় তার দলের ৮০ জন নিখোঁজ হওয়ার পর, সদগুরু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের কাছে তাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন।

রাতভর চলছে উদ্ধারকাজ

ছবির উৎস, Ambir Tolang/NurPhoto via Getty Images

চলছে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ

ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে ইতোমধ্যে পাঁচটি ট্রাকে করে জরুরি পণ্য পাঠানো হয়েছে। আরও সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। নেপালকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত।

দুর্গত এলাকা থেকে পাওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রবল স্রোতে জল ও কাদামাটি মুহূর্তের মধ্যে একের পর এক জনবসতির ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে সড়ক, সেতু এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র।

অনেক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও পুরো গ্রামই বন্যার স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে।

তবে এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি কর্মকর্তারা। কী কারণে এত বড় বিপর্যয় ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নেপালে বিবিসি সংবাদদাতা বিনীতা দাহাল জানিয়েছেন, বহু আহত মানুষ স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

গুরুতর আহতদের কয়েকটি হাসপাতালে, বিশেষ করে কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিখোঁজদের স্বজনরা উৎকণ্ঠার মধ্যে প্রিয়জনদের কোনো খোঁজের অপেক্ষায় রয়েছেন।

নিখোঁজ মানুষদের খুঁজতে এবং দুর্গত এলাকায় সহায়তা পৌঁছে দিতে রাতের অন্ধকারে নাইট-ভিশন সক্ষম হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দুই জেলা ধুঞ্চে ও নুয়াকোটকে কেন্দ্র করে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে বিবিসির এক সংবাদদাতা জানিয়েছেন, সেখানে বিদ্যুৎ, সড়ক যোগাযোগ এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর ফলে নেপালে বেড়াতে যাওয়া বহু মানুষের সঙ্গে কোনও রকম যোগাযোগ করতে পারছেন না পরিবারের মানুষ।