Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, BSS
নির্বাচন কমিশনে একাধিক মনোনয়ন জমা হওয়ায় দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীর নিশ্চিত পরাজয় জেনেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যগণের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি। অর্থাৎ সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীই যে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হবেন এটি নিশ্চিত।
অতীতে কেবল ১৯৯১ সালেই একাধিক প্রার্থী নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশে। সেবার এই পদে সরকারি দল বিএনপির বিপরীতে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ।
এরপর থেকে গত ৩৫ বছরে যে আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে, তার প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় কোনো ভোটের প্রয়োজন হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরকারি দল বিএনপির মোট সংসদ সদস্যের সংখ্যা ২৪৭। অর্থাৎ সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
এক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা যদি নিজ দলের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারতেন, তাহলেও হয়তো কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকতো। কিন্তু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেই পথও বন্ধ।
তার মানে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি যাকে প্রার্থী করবে, তিনিই যে বাংলাদেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, এটি মোটামুটি নিশ্চিত।
এমন প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট কেন প্রার্থী দিল, এর মধ্যে কি রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে নাকি নামেমাত্র অংশগ্রহণ- এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূলত রাজনৈতিক কৌশল দেখছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জামায়াত নিজেদের সরকারবিরোধী অবস্থান যেমন জানান দিচ্ছে, তেমনি প্রার্থী হিসেবে একজন স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে বেছে নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কৌশলে একটি রাজনৈতিক বার্তাও দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ছবির উৎস, Bangladesh Jamaat-e-Islami FB
জামায়াত জোট যা বলছে
মি. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাধ্যতামূলক।
অবশেষে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ শুরু হলো।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপি এর চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এবং বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এর মনোনয়নপত্র জমা দেন জোটের প্রতিনিধি দল।
এসময় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, “গণতন্ত্রকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতেই” নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।
“আমরা এখানে জিতব কি হারব- এটা বিষয় নয়। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া কোনো নির্বাচন হোক সেটা চাই না। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য,” বলেন তিনি।
ছবির উৎস, Bangladesh Nationalist Party-BNP FB
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে মি. আযাদ বলেন, গণতান্ত্রিক চর্চার পেছনে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
“আর্টিকেল ৭০ এ অনাস্থা এবং অর্থবিল ছাড়া সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মত দিতে পারবেন, ভোট দিতে পারবেন- ঐকমত্য কমিশনে এই বিষয়ে আমরা সবাই চেয়েছি। কিন্তু একগুঁয়েমি এবং দলীয় সংকীর্ণতার কারণে গণভোটের রায় উনারা বাস্তবায়ন করছেন না,” বলেন তিনি।
এসময় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিএনপির দলীয় ফোরামের বৈঠক নিয়েও সমালোচনা করেন মি. আজাদ।
তিনি বলেন, “সচিবালয় হলো একটা নির্বাহী জায়গা, এখানে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ফোরামের বৈঠক হবে এরকম অতীতের রেকর্ড আমাদের জানা নেই।”
এদিন দুপুরের পর- রাষ্ট্রপতি পদে নিজেদের প্রার্থী, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেয় বিএনপির প্রতিনিধি দলও।
এসময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত জোটের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
তিনি বলেন, “এটি কোনোমতেই নিয়ম রক্ষার নির্বাচন নয়। সংবিধান এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী যেটা হওয়ার সেটাই হচ্ছে।”
এর আগে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থীর নাম জানান বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
নির্বাচন কমিশনের তফশিল অনুযায়ী, ১৩ই অগাস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর, ১৬ই অগাস্ট বাছাই ও ১৮ই অগাস্ট মনোনয়ন প্রত্যাহারের তারিখ নির্ধারণ করা রয়েছে। আর ২০শে অগাস্ট জাতীয় সংসদে ভোট শেষে ঘোষণা করা হবে বেসরকারি ফলাফল।
ছবির উৎস, BSS
পরাজয় জেনেও কেন নির্বাচন?
বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল। সেবার বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসের বিপরীতে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করেছিল আওয়ামী লীগ।
এরপর ৩৫ বছরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলেও একক প্রার্থী থাকায় কোনোবারই ভোট হয়নি। এবার সেই ধারা ভাঙছে। ফলে ১৯৯১ সালের পর এটাই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক নিয়মকানুন অনুযায়ী এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীই যে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, এটি নিশ্চিত। কারণ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পেছনে কয়েকটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
যেখানে রাজনৈতিক অবস্থানের জানান দেওয়া, ভবিষ্যতের দরকষাকষি ও সংস্কার আলোচনা চালিয়ে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো থাকতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।
এছাড়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত জোট যাকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেটি ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাদের জন্য বড়ো হাতিয়ার হতে পারে বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।
তিনি বলছেন, “জামায়াত ভোটে জিতবে না এটা তারাও জানে, কিন্তু তাদের জন্য এটা একটা বড়ো পলিটিক্যাল গেইন বা অর্জন যে তারা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তাদের প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে।”
তবে, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণার আগে বিএনপি যদি বিরোধী জোটের সঙ্গে আলোচনা করে প্রার্থী দিত, তাহলে জামায়াত জোট এই নির্বাচনে প্রার্থী নাও দিতে পারতো বলেই মনে করেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
তার মতে, রাষ্ট্রের অভিভাবক সুলভ পদ হওয়ায় রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের বিষয়টি ঐকমত্যের ভিত্তিতে হলেই সবথেকে সুবিধাজনক হত।
“এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যে দুই পক্ষের মধ্যে স্বাভাবিক সৌজন্য এবং সংলাপের যে পরিবেশটা থাকা দরকার ছিল সেটা আর নাই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আহমদ।




