Home LATEST NEWS BANGLA প্যাশন ফ্রুট বা আনারকলি ফল নিয়ে বাংলাদেশে কেন আগ্রহ বাড়ছে

প্যাশন ফ্রুট বা আনারকলি ফল নিয়ে বাংলাদেশে কেন আগ্রহ বাড়ছে

2
0

Source : BBC NEWS

বাংলাদেশের চূয়াডাঙ্গায় একটি বাগানে প্যাশন ফল দেখা যাচ্ছে

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় চাষ হচ্ছে প্যাশন ফল নামের একটি ফল, যার প্রতি কৃষকদের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে বলে জানা যাচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় এটি আনারকলি, ট্যাং ফল বা শরবতি ফল হিসেবেও পরিচিত।

তুলনামূলক কম পরিচিত এই ফলটির প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়লেও দেশে এর বাজার কতটা কিংবা অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি কতটা সম্ভাবনাময় তা নিয়ে নানা ধরনের মতামত আছে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

কেউ কেউ বলছেন ‘এটি পর্যটন এলাকার ফল’, আবার কেউ বলছেন, ‘এই ফল জুস বা শরবতের জন্য’। আবার কেউ বলছেন ‘ফলের চেয়ে এর ফুলই বেশি আকর্ষণীয় ও সুগন্ধযুক্ত’।

আর সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, “এটি বাংলাদেশের কৃষিতে এক নতুন সংযোজন”।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আব্দুর রহিম দুই দশক আগে বাংলাদেশে প্যাশন ফল প্রচলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন যে, এই ফলটি বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় কারণ এক বছর ফলন করে যত্ন নিলে বছরের পর বছর ধরে ফুল ও ফল পাওয়া যায়।

যদিও এই ফলটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাংলাদেশে কতটা তা নিয়ে সংশয়ও আছে অনেকের মধ্যে।

তাদের মতে, জুস বা শরবতের জন্য ফলটি ভালো হলেও এর সংরক্ষণ কঠিন। আবার কামড় দিয়ে খাওয়া যায়না বলে ফল হিসেবে সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা জনপ্রিয় হবে সেই আশংকাও আছে বলে মনে করেন কৃষিবিদ তালহা জুবাইর মাসরুর।

তবে প্যাশন ফল চাষ করে নিজ এলাকায় আলোচনায় এসেছেন চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের চাষি মো: সজল। তার মতে, এক বিঘা জমিতে এই ফল চাষ করে বিনিয়োগের তিনগুণ লাভ পাচ্ছেন তিনি।

মো: সজল বলছেন একই প্যাশন ফলের বাগান থেকে প্রতি বছর আয় সম্ভব

ফলটি সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে

সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, এর রস, বীজ ও খোসা তিনটি অংশই শিল্পোৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য, একে তাই বলা হয় ‘সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য ফল’। পুষ্টিতে ভরপুর এ ফল শুধু শরীরের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও আশাব্যঞ্জক এক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্যাশন ফলের উৎস হলো দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনার পার্বত্য অঞ্চল। পরে এটি আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে পরিচিতি পায় এবং ধীরে ধীরে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ভারতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়।

বাংলাদেশে মূলত পর্যটন ও পাহাড়ি অঞ্চলের মাধ্যমে ফলটি প্রথম পরিচিত হয়। বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, সিলেট ও পঞ্চগড় অঞ্চলের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্যাশন ফল চাষ হচ্ছে।

“প্যাশন ফল এক অনন্য বিস্ময়। ছোট্ট, শক্ত খোসার ভেতরে লুকিয়ে থাকে অম্ল-মিষ্ট স্বাদের এক ভিন্ন জগত-যার প্রতিটি বীজে আছে পুষ্টি প্রতিরোধ আর সম্ভাবনা। একসময় দক্ষিণ আমেরিকার পাহাড়ি উপত্যকা থেকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই ফল এখন ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি মানচিত্রেও,” কৃষি তথ্য সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, সাধারণত ফুল ফোটার ৬০-৭৫ দিন পর ফল সংগ্রহযোগ্য হয়। খোসা সবুজ থেকে বেগুনি বা হলুদে পরিণত হওয়া, সামান্য কুঁচকে যাওয়া ও গন্ধ তীব্র হয়ে ওঠা ফলের পরিপক্বতার প্রধান লক্ষণ।

অধ্যাপক আব্দুর রহিম বলছেন, প্রায় দুই দশক আগে তারা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি জায়গা থেকে তারা প্যাশন ফ্রুটের জাত সংগ্রহ করেছিলেন।

“বাংলাদেশে এখন বেশ কয়েকটা জাত আছে। তবে সবই কাছাকাছি ধরনের। এটি জুস বা শরবতের জন্য খুবই ভালো। যদিও মানুষ এ নিয়ে কমই জানে। প্যাশন ফুল ও ফল দুটোই দুর্দান্ত। লতানো জাতের এই ফলগাছ একবার সঠিকভাবে রোপণ হলে ২৫-৩০ বছর ধরে ফল দিতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

জুসের জন্য প্যাশন ফলের জনপ্রিয়তা আছে অনেক দেশে। ছবিতে প্যাশন ফলের জুস দেখা যাচ্ছে।

রংপুর হর্টিকালচার সেন্টারে উদ্যানতত্ত্ববিদ মোছা: মোকররমা শিল্পীর মতে, যত্ন পেলে সব জায়গাতেই প্যাশন ফলের চাষ হতে পারে।

“ঠিক সময়ে ঠিক তাপমাত্রা রাখতে হবে। এবার আমাদের এখানে (রংপুরে) সুন্দর ফল হয়েছে। আমরা চারা উৎপাদন করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করি। রৌদ্রোজ্জ্বল ও উঁচু জায়গায় এটি ভালো হয়। এবার দেখছি প্রচুর ফুল ও ফল আসছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তিনি জানান, ফলের গাছ রোপণের প্রায় আট থেকে দশ মাস পর গাছে প্রথম ফুল ফোটে এবং ফুল ফোটার ৬০-৭৫ দিন পর ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়।

প্রথম বছর প্রতি গাছে গড়ে ২০-২৫টি ফল পাওয়া যায়, কিন্তু দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছর থেকে তা বেড়ে ২০০-২৫০টি পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কাঁচা প্যাশন ফ্রুট লবণ দিয়ে বিক্রি হতে দেখা যায়, কিন্তু এসব এলাকার বাইরে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে ফলটির চাহিদা খুব বেশি দেখা যায় না।

কৃষিবিদ তালহা মাসরুর জোবায়ের বলছেন, প্যাশন ফ্রুট বা আনারকলি ফলের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এর বাজার এখনো সীমিত। একই সাথে স্বাদ ও খাওয়ার ধরনের কারণে এটি অন্যান্য প্রচলিত ফলের মতো ব্যাপক জনপ্রিয় নয় বলে মনে করেন তিনি।

“তাছাড়া ফলটির সংরক্ষণকাল তুলনামূলক কম হওয়ায় বাজারজাতকরণেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে প্যাশন ফ্রুটের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে জুস ও বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিতে। এর স্বতন্ত্র স্বাদ, সুগন্ধ ও অম্লতা প্রক্রিয়াজাত পানীয় তৈরির জন্য বিশেষ উপযোগী,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তার মতে, শুধু তাজা ফলের বাজারের ওপর নির্ভর না করে জুস, পাল্প ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশে ফলটির বাণিজ্যিক চাষ লাভজনক হয়ে উঠতে পারে

কীভাবে চাষ হয়, কৃষক যা বলছে

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের কৃষক মো: সজল প্যাশন ফল চাষ করে এলাকায় আলোচনায় এসেছেন এবং সংবাদমাধ্যমেও শিরোনাম হয়েছেন।

“কয়েক বছর আগে কক্সবাজার গিয়ে ফলটি দেখেছিলাম। একটা ফল ৫০/৬০ টাকায় বিক্রি হয়। গত বছর নিজেই চাষ শুরু করলাম ৩৩ শতক জমিতে। এখন প্রতি দুই তিন দিন পর গড়ে ১ হাজার পিস ফল তুলি,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তিনি জানান, ওই পরিমাণ জমি প্যাশন ফল চাষের জন্য প্রস্তুত করতে তার প্রায় ১ লাখ ২০ টাকার মতো খরচ হয়েছিল।

“প্রথম বছরেই ৩/৪ লাখ টাকার বিক্রি হয়েছে। এটি শুধু ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ফল দেয় না। বাকী সময় ফল আসতে থাকে। আমাদের এখানে এখন অনেকেই চাষ করছে। অনলাইনে দেখেও অনেকে চারা নিচ্ছে আমার কাছ থেকে। প্রতি পিস ২৫-৩০ টাকা ধরে পাইকাররা ফলটি নিচ্ছেন,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, ফলটি দ্রুত পচনশীল হলেও কম জমিতেও বেশি ফলন পাওয়া যায় বলে এটি ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্যও লাভজনক বিকল্প হতে পারে।