Home LATEST NEWS BANGLA ভিনিসিয়াস জুনিয়রের নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কায় স্কটল্যান্ড

ভিনিসিয়াস জুনিয়রের নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কায় স্কটল্যান্ড

2
0

Source : BBC NEWS

ভিনিসিয়াস জুনিয়র

ছবির উৎস, Getty Images

মায়ামি স্টেডিয়ামে গতরাতে শেষ হাসি ব্রাজিলই হেসেছে। তবে, নিজেদের জয়ের পাশাপাশি পুরো ম্যাচ জুড়ে স্কটিশ সমর্থকদের উল্লাস আর হর্ষধ্বনির বিষয়টি ছিল চোখে পড়ার মত।

আর তা উঠে এসেছে ব্রাজিলের সর্বাধিক বিক্রিত সংবাদপত্র ‘ও গ্লোবো’র আজ সকালের সংস্করণেও – যেখানে টার্টান আর্মি নামে পরিচিত স্কটিশদের ধন্যবাদ আর শুভকামনা জানানো হয়েছে।

স্কটল্যান্ডের সমর্থকেরা মায়ামিতে তাদের দলকে চাঙ্গা করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনো ফর্কলিফ্ট, মানে যান্ত্রিক সিড়িওয়ালা ট্রাকও স্কটল্যান্ডকে আসলে টেনে তুলতে পারত না – বিশেষ করে ম্যাচের শুরুতে তারা যেভাবে রক্ষণভাগ সামলেছিল।

যতক্ষণে তারা গাঁ ঝাড়া দিয়ে উঠে ব্রাজিলের গোলরক্ষক আলিসনের জালে পাঁচটি বল পাঠিয়েছে, ততক্ষণে স্কটল্যান্ড ৩-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে।

‘ও গ্লোবো’র শিরোনাম ছিল, “মাঠে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের অভাব থাকলেও, স্কটল্যান্ড তাদের সমর্থকদের নিয়ে এক দারুণ প্রদর্শনী দেখিয়েছে।”

তবে, মায়ামির গ্যালারিতে স্কটিশদের বর্ণিল উপস্থিতি আর দলকে চাঙ্গা করার সেই প্রদর্শনী থেমে যায়, যখন ভিনিসিয়াস জুনিয়র মাঠে আবির্ভূত হন।

যেনবা পার্টিতে ঢুকে পড়ে তিনি উঁচু শব্দে বেজে চলা গান থামিয়ে সবাইকে যার যার বাড়ি চলে যেতে বললেন।

বস্তুত: ব্রাজিল এমন কিছু করে দেখাল যা অনেকে অসম্ভব ভেবেছিল।

ম্যাচের সপ্তম মিনিটে ভিনি জুনিয়র যখন তার প্রথম গোলটি করেন, তখনই আসলে খেলাটি শেষ হয়ে গিয়েছিল।

আর বিরতির ঠিক আগে যখন ভিনি নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলেন, তখন যেন স্কটল্যান্ডের সব আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়।

বিগত সপ্তাহগুলোতে এই সমর্থকদের যতটা দুর্দান্ত দেখাচ্ছিল, মায়ামির তীব্র আর্দ্রতার মধ্যে বুধবার ব্রাজিল যেন তাদের এক জায়গায় জড়ো করে একটি হলুদ দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।

হতাশ স্কটল্যান্ডের দর্শক

ছবির উৎস, Getty Images

নকআউট পর্বে যেতে স্কটল্যান্ডের কী দরকার?

বুধবার ম্যাচ শুরুর আগে স্কটল্যান্ড তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে ছিল – টুর্নামেন্টের সেরা তৃতীয় স্থানের দলগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়।

কিন্তু বসনিয়া-হার্জেগোভিনার কাতারের বিপক্ষে জয় স্কটল্যান্ডকে তৃতীয় স্থানে নামিয়ে দেয়। ব্রাজিলের আধিপত্য তাদের আরও নিচে ঠেলে দেয়।

তারা ক্রমেই নিচে নামতে থাকে, নিরাপত্তার ব্যবধান প্রায় মুছে যায়, আর অন্যান্য ম্যাচের ফলাফলের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে তাদের।

বৃহস্পতিবার তারা লড়াকু কিন্তু হতভম্ব অবস্থায় নর্থ ক্যারোলাইনার শার্লটে ফিরে যাবে। এখন এই টুর্নামেন্টে তাদের ভবিষ্যৎ কী, বা আদৌ কোনো ভবিষ্যৎ আছে কী না তা নিয়ে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত স্কটরা।

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী মঙ্গলবার তাদের মেক্সিকোর মুখোমুখি হওয়ার কথা – কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি তাদের অবস্থান ফেরানোর সুযোগ, নাকি আরেকটি কঠিন পরীক্ষা?

তবে পরিস্থিতি বদলাতেও পারে।

আগামী কয়েকদিনে অন্য দলগুলোর ফলাফল এ বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

স্কটল্যান্ড এখন শেষ ৩২-এ জায়গা পাবে কী না, তা নিয়ে উদ্বেগে আছে। সেনেগাল, ইকুয়েডর, কুরাসাও, কেপ ভার্দে, সৌদি আরবসহ অন্যান্য দলের ফলাফল তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এর মধ্যে এক ধরনের অনিবার্যতা ছিল। এ মাসের শুরুতে বলিভিয়ার বিপক্ষে জয় ছাড়া, স্কটল্যান্ড কখনো দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলকে হারাতে পারেনি।

গত ৫০ বছরে ১০ বারের চেষ্টায় ব্রাজিলকেও নয়।

যদিও গতরাতে তারা কিছু মুহূর্ত তৈরি করেছিল, কিন্তু তা ছিল খুব সামান্য এবং অনেক দেরিতে।

ভিনি জাদু

সপ্তম মিনিটে ভিনি জুনিয়র যখন গোল করেন, তখন যেসব পূর্বাভাস অনেকের মনে আগে ভয় ধরিয়েছিল, সেগুলোই যেন স্বস্তির আশায় পরিণত হয় পরে।

গত সপ্তাহে মরক্কোর বিপক্ষে ৭০ সেকেন্ডে, আর এখানে মায়ামিতে সাত মিনিটে – আকাশের বজ্রপাত আর ঝড় কোথায়? কোথায় সেই বিরতি?

সেসময় স্কটল্যান্ড শুধু গোলই খায় না, তারা এক ধরনের বিপর্যয়ও সৃষ্টি করে – এ ধরনের রক্ষণেই ভিনি জুনিয়রের মতো খেলোয়াড় সুযোগ নেয়।

স্কট ম্যাকেনা এ ঘটনার স্মৃতি সারাজীবন বহন করবেন। বলের ওপর দেরি করার সেই আতঙ্ক, আর রায়ানের চাপ – সবই তার মনে থাকবে।

বল ক্লিয়ার করবেন- না, দেরি করলেন এবং তার মাশুল দিলেন।

বল ভিনি জুনিয়রের কাছে এলে গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গানের সর্বোচ্চ চেষ্টাও তাকে আটকাতে পারেনি। ভিনি তাকে পাশ কাটিয়ে সহজেই গোল করেন।

মরক্কোর বিপক্ষে দ্রুত গোল খাওয়ার পর ভালো শুরু করার জন্য স্কটরা নিশ্চয়ই প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু ব্রাজিল এগিয়ে যাওয়ার পর সব পরিকল্পনা ভেসে যায়।

ভিনি

ছবির উৎস, Getty Images

ভিনি জুনিয়রকে সুযোগ দেওয়া স্কটল্যান্ডের জন্য শুরু, মাঝখান ও শেষ – সবই হতে পারত, আর সেটাই তারা এড়াতে চেয়েছিল।

এটি ছিল ভিনির বিশ্বকাপে চতুর্থ গোল। এই গোলের মাধ্যমে তিনি এক বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই গোল করা পঞ্চম ব্রাজিলিয়ান হন – জেয়ারজিনিয়ো, রোমারিও, রোনালদো ও রিভালদোর পর।

এরা সবাই কিংবদন্তি, এবং ভিনি সেই তালিকায় যোগ দেওয়ার পথে এগোচ্ছেন।

স্কটল্যান্ড কি ঘরে ফেরারই যোগ্য?

ম্যাচের আগে যে শব্দ ও রঙের উচ্ছ্বাস ছিল, তা দ্রুত সাম্বা ও হলুদে রূপ নেয়।

ব্রাজিলের দ্বিতীয় গোল এসেছিল—এবং তা ভিনি জুনিয়রের—কিন্তু VAR স্কটল্যান্ডকে বাঁচায়।

হাইড্রেশন বিরতিতে স্কটদের প্রয়োজন ছিল শুধু পানি নয়—অক্সিজেন, চেতনাদায়ক, বড় শক্ত পানীয়, এমনকি বজ্রঝড়ও।

খেলা শুরু হলে কিছু সময়ের জন্য তারা সামান্য হলেও স্থির হয়। কয়েকটি কর্নার পায়, দূর থেকে শট নেয়। তাতে ব্রাজিল বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়নি, তবে কিছুটা স্বস্তি দেয়।

কিন্তু আবারও নিজেদের রক্ষণে ভুলে ভিনি সুযোগ নিলে সেই ক্ষীণ আশাও শেষ হয়ে যায়।

অ্যান্ডি রবার্টসন বল হারান, স্কটল্যান্ড সংঘর্ষে হেরে যায়, ব্রুনো গিমারায়েস বল পেছনের পোস্টে পাঠান, গানের হাত ফসকে যায় এবং নাথান প্যাটারসন ভিনিকে হারিয়ে ফেলেন।

কীভাবে তিনি তাকে হারালেন?

বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রতিভা, আর প্যাটারসন তাকে ফাঁকা জায়গা করে নিতে দিলেন – তিনি হেড করে গোল করেন।

প্রথমার্ধে স্কটল্যান্ড ব্রাজিলের শেষ তৃতীয়াংশে মাত্র ৪৭ সেকেন্ড বল ধরে রাখতে পেরেছিল।

ম্যাচ শেষে ভিনিকে জড়িয়ে ধরেন নেইমার

ছবির উৎস, Getty Images

হাফটাইম শেষে, তারা তখনো কোনো শট অন টার্গেটে নিতে পারেনি – হাইতির বিপক্ষে জন ম্যাকগিনের ডবল ডিফ্লেকশন গোলের পর তিন ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে গেছে।

এমন আক্রমণশক্তি নিয়ে কোনো দল ঘরের বাইরে যাওয়ার যোগ্য নয়।

অবশেষে স্কট ম্যাকটোমিনে একটি শট নেন, কিন্তু অ্যালিসনকে নড়তেই হয়নি।

এরপর ভিনি জুনিয়র সামনে এলে গান সেটি ঠেকান। কিন্তু এরপর গিমারায়েস কেনি ম্যাকলিনকে পেছনে ফেলে মাতেউস কুনিয়ার জন্য তৃতীয় গোল তৈরি করেন।

শেষ ১৪ মিনিটে নেইমারকে মাঠে নামানো হলে স্টেডিয়াম যেন চতুর্থ গোল দেখবে – এমন উত্তেজনা তৈরি হয়।

দুই-আড়াই বছর পর নেইমারের প্রত্যাবর্তন – আর কী স্বচ্ছন্দেই না সেটা হলো! কোনো চাপ ছিল না নেইমারের ওপর, কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল।

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই ব্রাজিল পরের রাউন্ডে উঠছিল। শেষ দিকে স্কটল্যান্ড সুযোগ তৈরি করলেও গোল করতে পারেনি।

এটি বেশ বেদনাদায়ক ছিল – সব চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারছিল না দলটি, এমনকি একটি সান্ত্বনামূলক গোলও নয়।

শেষে চারজন স্কট খেলোয়াড় মাঠে লুটিয়ে পড়েন – হতাশা ও ক্লান্তিতে।

এই পরিস্থিতিতে খেলা সত্যিই কঠিন ছিল।

এখন র‍্যাঙ্কিংয়ে তারা নিচে নেমে গেছে, সত্যি – কিন্তু স্কটল্যান্ড কি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে?

একটি ডিফ্লেক্টেড গোল এবং দুটি পরাজয়ের পরও পরের রাউন্ডে যাওয়া হলে তা হবে দলের ইতিহাসে এক অদ্ভুত সাফল্য।

তবে, সে হিসাব মেলাতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আরো কয়েকদিন।

আগামীদিনগুলোতেই বোঝা যাবে সবকিছু।

কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে, ব্রাজিল জয়ের আনন্দে ভাসছে, আর অনেক হিসাব-নিকাশকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে।