Source : BBC NEWS

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ নিজের উত্তরাধিকার বা স্মৃতি ধরে রাখার প্রতি আচ্ছন্ন।
মিশরের পিরামিড ও গ্রেট স্ফিংক্স  অফ গিজা (মানুষের মাথা ও সিংহের দেহবিশিষ্ট এক পৌরাণিক মূর্তি)- তারই এক উদাহরণ।

ছবির উৎস, Getty Images

যখন বেথ হান্টারের বাবার আলঝেইমার রোগ ধরা পড়ে, তখন তিনি তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তারা কি একসঙ্গে কথোপকথন রেকর্ড করে রাখতে পারেন -যাতে ভবিষ্যতে তিনি সেই কণ্ঠস্বর শুনতে পারেন। কিন্তু তার বাবা রাজি হননি।

হান্টার বলেন, তিনি সম্পর্ক নিয়ে গভীর আবেগপূর্ণ টাইপের লোক ছিলেন না। তিনি নিজের অসুস্থতা বা মৃত্যু নিয়েও মুখোমুখি হতে চাইতেন না। বরং তিনি নিজের যুদ্ধের স্মৃতিগুলো হাতে লিখে রাখতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, পরে সেগুলো টাইপ করার জন্য অন্য কাউকে নিয়োগ করেছিলেন।

উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার ইচ্ছা বয়স্কদের মধ্যে বেশি তীব্র হতে পারে, কারণ তারা সময়ের সীমাবদ্ধতা বেশি অনুভব করেন। কিছু গবেষক মনে করেন, এই ইচ্ছা জীবনের আরও আগের সময় থেকেই শুরু হতে পারে এবং হয়তো হওয়াও উচিত।

এছাড়া গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, মৃত্যুর পর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার যে সহজাত আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে আছে, সেটিকে ভালোভাবে বোঝা গেলে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করার নতুন উপায়ও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

ওহাইওর বোলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক এবং ক্যান্সার-পরবর্তী জীবনে উত্তরাধিকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বেথ হান্টার বলছিলেন যে, “অধিকাংশ মানুষ এ বিষয়টি নিয়ে ভাবেই না”।

তবে উত্তরাধিকার বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে এবং অনেক সময় তা অচেতনভাবেও ঘটে। হান্টার বলেন, “প্রত্যেক মানুষই একটি উত্তরাধিকার রেখে যায়, সে জানুক বা না জানুক।”

উত্তরাধিকার মানেই শুধু সম্পদ, জমিজমা বা সংগীত-সাহিত্যের মতো স্থায়ী শিল্পকর্ম নয়। কিছু গবেষক উত্তরাধিকারকে তিনটি প্রধান ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ভাগে ভাগ করেছেন:

প্রথমত, জৈবিক উত্তরাধিকার, যা আমাদের শরীর ও জিনের মাধ্যমে যা আমরা রেখে যাই। দ্বিতীয়ত, বস্তুগত উত্তরাধিকার, যা সম্পদ ও ভৌত সম্পত্তির মাধ্যমে প্রকাশিত উত্তরাধিকার এবং তৃতীয়ত মূল্যবোধের উত্তরাধিকার, যেমন বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, যা আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিই।

গবেষণাগারে কাজ করছেন একজন বিজ্ঞানী

ছবির উৎস, Getty Images

জৈবিক উত্তরাধিকার

অনেকের কাছে জৈবিক উত্তরাধিকারের মানে হলো নিজের জিন বা বংশধারা সন্তানদের মাধ্যমে প্রবাহিত করা। তবে জিনগত বংশ পরম্পরা, যা জিনের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্দেশ করে এবং উত্তরাধিকার বা মৃত্যুর পর মানুষের রেখে যাওয়া প্রভাব- এই দুটি বিষয় সবসময় এক নয়।

জৈবিক উত্তরাধিকার বলতে আমাদের শরীরকেও বোঝাতে পারে, যার মাধ্যমে আমরা জীবন কাটাই ।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ অঙ্গদাতা হিসেবে নিবন্ধিত, যদিও প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র তিনজন এমন পরিস্থিতিতে মারা যান যেখানে সফলভাবে অঙ্গদান সম্ভব হয়।

কিছু মানুষ তাদের পুরো দেহই বিজ্ঞানের জন্য দান করতে চান। এর ফলে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা মানবদেহ সম্পর্কে শিখতে পারে বা নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করা যায়। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ হাজারেরও বেশি দেহদানের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল।

সম্প্রতি বেলজিয়ামে ১০০-র বেশি নিবন্ধিত দেহদাতার ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায় যে ৫৭ শতাংশ মানুষের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে অবদান রাখা। অন্য কারণগুলোর মধ্যে ছিল মানবসেবা ও চিকিৎসাসেবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। তবে মজার বিষয় হলো, ১৬ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা মৃত্যুকে অর্থবহ করে তুলতে চেয়েছিলেন।

জিনগত রোগ বা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে, সমাজকর্মী সুসান পটার, যিনি ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসসহ নানা রোগে ভুগেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর ‘ভিজিবল হিউম্যান প্রজেক্ট’ এ নিজের দেহ দান করেন, যাতে ভবিষ্যৎ চিকিৎসকেরা আরও দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন।

তার ঘটনাটি ছিল চমকপ্রদ। তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন যেন মৃত্যুর পর তার দেহকে -৯.৪° সেলসিয়াস (১৫° ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় জমিয়ে রাখা হয়, এরপর সেটিকে ২৭ হাজার টুকরোতে কাটা হয়। প্রতিটি অংশের ছবি তুলে স্তরে স্তরে সাজিয়ে একটি ‘ভার্চুয়াল ক্যাডাভার’ বা ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল দেহ তৈরি করা হয়, যা মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ভার্চুয়ালি মানবদেহ বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে।

হান্টারের নিজের এক গবেষণায়, যেখানে নারী ক্যান্সার-জয়ীদের নিয়ে কাজ করা হয়েছিল সেখানে অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেছিলেন যে তাদের উত্তরাধিকার পরিবারের সদস্যদের ইতিবাচক স্বাস্থ্যচর্চা ও ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ে উৎসাহিত করবে।

হান্টার বলেন, ‘কোনো না কোনোভাবে নিজের ছাপ রেখে যাওয়া’ ক্যান্সার নির্ণয়ের পর মৃত্যুভয়ের মুখোমুখি হওয়া নারীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তার মতে, উত্তরাধিকারের গুরুত্ব চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণাতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এটি রোগীদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নিতে উৎসাহিত করতে পারে।

উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবনা আসন্ন মৃত্যুর মুখোমুখি মানুষের জন্যও মানসিক শান্তি এনে দিতে পারে। জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা রোগীদের জন্য কিছু হাসপাতালে ‘লিগ্যাসি অ্যাক্টিভিটি’ বা উত্তরাধিকারমূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে তারা নিজেদের জীবন এমনভাবে সমাপ্ত করতে পারেন যা তাদের ও তাদের পরিবারের কাছে সবচেয়ে অর্থবহ মনে হয়।

এগুলোর মধ্যে থাকতে পারে ডায়েরি বা স্ক্র্যাপবুক তৈরি, প্রিয়জনকে লেখা একটি চিঠি বা কার্ড, শিল্পকর্ম, কিংবা একটি ‘নৈতিক উইল’, যা আইনগত নয়, কিন্তু যেখানে মানুষ নিজের চিন্তা, মূল্যবোধ ও উপদেশ লিখে রেখে যেতে পারেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।

মরণাপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের উত্তরাধিকারমূলক কার্যক্রম হতাশা ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। জীবনের শেষ কয়েক মাসে এটি শোক মোকাবিলার প্রক্রিয়াকেও সহজ করে তোলে।

নাতিকে গল্প পড়ে শোনাচ্ছেন এক দাদী

ছবির উৎস, Getty Images

মূল্যবোধের উত্তরাধিকার

দান-খয়রাত, সম্পত্তি উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাওয়া বা মূল্যবান জিনিসপত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া – এগুলো সবই বস্তুগত উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার উপায়। পুরোনো ছবি, ডায়েরি বা পারিবারিক স্মৃতিচিহ্নও পরিবারের ইতিহাস সংরক্ষণের মূল্যবান মাধ্যম হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আদৃত হতে পারে। কারও নিজের নামে একটি ভবন দান করাও সমাজে স্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়ার একটি উপায়।

তবে গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ তাদের উত্তরাধিকার হিসেবে সবচেয়ে বেশি যা রেখে যেতে চায় তা হলো তাদের মূল্যবোধ ও বিশ্বাস। যেমন দয়া, সহানুভূতি এবং অন্যকে সাহায্য করার গুরুত্ব।

বিভিন্ন বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ৩৮ জন নারীর জীবনকাহিনী নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন।

সাধারণত তারা এটি করার চেষ্টা করতেন নিজেদের আচরণ, ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে নৈতিক উদাহরণ স্থাপন করে। পাশাপাশি অনেকে লিখে রাখা বা টেপে রেকর্ড করার মতো স্পষ্ট উপায়ও বেছে নিতেন, যেমন নিজের গল্প, পারিবারিক ইতিহাস বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো সংরক্ষণ করা, কখনও আত্মজীবনীর আকারে।

মূল্যবোধের উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার অনেক ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী এমন কিছু মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন যারা নিজেদের মূল্যবোধভিত্তিক উত্তরাধিকার দলিল তৈরি করেছিলেন।

গবেষণায় দেখা যায়, এতে অংশগ্রহণকারীরা মানসিক শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন, অতীতকে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন, জীবনে তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং এটি তাদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণাও যুগিয়েছিল।

অনেক অংশগ্রহণকারী মূল্যবোধের উত্তরাধিকারকে ‘একটি বাস্তব উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একজন বলেন, এই প্রক্রিয়া “আপনাকে মনে করিয়ে দেয় আপনি কী কী প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছেন, কীভাবে সেগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন, এবং কোন জীবনদর্শন আপনাকে তা মোকাবিলা করতে সাহায্য করেছে।”

মৃত্যুভয় মোকাবিলা করা

মানুষ সম্ভবত হাজার হাজার বছর ধরে উত্তরাধিকার বা স্মরণীয় হয়ে থাকার বিষয়টি নিয়ে ভেবেছে। তবে গবেষকেরা এই ধারণা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন প্রায় ৭৫ বছর আগে। ১৯৫০ সালে জার্মান মনোবিশ্লেষক এরিক এরিকসন ‘জেনারেটিভিটি’ শব্দটি চালু করেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝান, একজন মানুষ অন্যদের কল্যাণে কতটা আগ্রহী, বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপকারের ব্যাপারে।

তিনি জেনারেটিভিটিকে মানুষের মনোসামাজিক বিকাশের আটটি ধাপের সপ্তম ধাপ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং মনে করেছিলেন, মধ্যবয়সে এটি মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক কাজ।

এরিকসনের মতে, যদি কেউ জেনারেটিভিটি অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে তা তার পরবর্তী জীবনের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে, এমনকি স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটাতে পারে। পরবর্তীতে অন্য গবেষকেরা এই তত্ত্বকে আরও বিস্তৃত করেন এবং এর পক্ষে প্রমাণও উপস্থাপন করেন। তবে কেউ কেউ মনে করেন, জেনারেটিভিটি শুধু মধ্যবয়সের চ্যালেঞ্জ নয়; বরং এটি সারাজীবনের একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিত।

অবশ্য মানুষের উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার পেছনে আরেকটি শক্তিশালী প্রেরণাও রয়েছে- মৃত্যুভয়। ডিউক ইউনিভার্সিটির ফুকুয়া স্কুল অব বিজনেসের ব্যবস্থাপনা ও সংগঠন বিভাগের অধ্যাপক কিম্বারলি ওয়েড বেনজনি বলেছেন, “এটি মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে যে, যদি শেষ পর্যন্ত আমাদের সবাইকেই মরতে হয়, তাহলে জীবনের অর্থ কী?”

তিনি আরও বলেন, “মৃত্যুই আসলে উত্তরাধিকার গড়ার মানসিক প্রেরণার কেন্দ্রে রয়েছে। যখন আমরা মৃত্যুর কথা মনে করি, তখন বুঝতে পারি আমরা মরতে চাই না; আমরা বাঁচতে চাই।”

তার মতে, উত্তরাধিকার নিয়ে চিন্তা মানুষকে ‘মৃত্যুভীতি’ থেকে ‘মৃত্যু-প্রতিফলন’ এর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

অন্য তাত্ত্বিকদের মতে, মৃত্যুভয়ের সঙ্গে আরও একটি আকাঙ্ক্ষা জড়িত থাকে। সেটি হলো- নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ একটি গল্প হিসেবে অনুভব করার ইচ্ছা।

নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ অটাগোর মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেসে বেরিং বলেন, “উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে আমাদের সুসংগত গল্প বলার প্রয়োজনের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।” তার মতে, “আমরা নিজেদেরকে যেন এক নায়কের যাত্রার প্রধান চরিত্র হিসেবে কল্পনা করি… আর সেই গল্পের শিক্ষা বা মূল বার্তাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।”

বেরিংয়ের মতে, উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার প্রতি মানুষের এই আকর্ষণ প্রমাণ করে যে মানুষ অন্যদের মতামতকে গভীরভাবে গুরুত্ব দেয়। তিনি বলেন, “মৃত্যুর পরও আমরা এই উদ্বেগ থেকে মুক্ত হতে পারি না।”

এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মানুষের সারাজীবন অন্যদের সঙ্গে সংযোগের প্রয়োজন হয়, যা আমাদের স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই উত্তরাধিকার হয়তো মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার চাহিদারই এক ধরনের ‘কৃত্রিম সম্প্রসারণ’।

মৃত্যুর পরেও মানুষ স্মরণীয় হয়ে থাকতে চায়

ছবির উৎস, Getty Images

নিজের লিগ্যাসি অ্যাম্বিশন লেখা

ক্রমবর্ধমান গবেষণা থাকা সত্ত্বেও, মানুষ কেন মৃত্যুর পরও ইতিবাচকভাবে স্মরণীয় হতে চায়- এই প্রশ্নটি এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি। মনোবিজ্ঞানী জেসে বেরিং বলেছেন, “যদি আমরা বিশ্বাস করি যে চেতনা চালু রাখতে মস্তিষ্ক প্রয়োজন, তাহলে মৃত্যুর পর নিজের সুনাম উপভোগ বা জানা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই মৃত্যুর পর কীভাবে আমাদের দেখা হবে তা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা জীবনের বাস্তব আনন্দ ও অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে”।

বেরিং আরও বলেন, “পুরো জীবনজুড়ে মৃত্যুর পর আমাদের কেমনভাবে স্মরণ করা হবে তা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ অনেক সময় আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। এমনকি আমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রেও দ্বিধায় পড়তে পারি, এই ভয়ে যে পরে মানুষ আমাদের কীভাবে মনে রাখবে”।

এটা সত্য যে, আপনি নিজের উত্তরাধিকারকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিম্বারলি ওয়েব বেনজনি বলেছেন, “উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণ বা ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা থাকে যারা সেটি গ্রহণ করে তাদের হাতে।” তবে এর মানে এই নয় যে উত্তরাধিকার নিয়ে চিন্তা করা জীবনে কোনো উপকার আনে না, বরং এটি জীবনের সময়কালেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, নিজের জন্য এবং আশেপাশের মানুষের জন্যও।

ওয়েড বেনজনি ও তাঁর সহকর্মীরা প্রস্তাব করেছেন যে, মানুষকে জীবনের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের “লিগ্যাসি অ্যাম্বিশন” বা তারা কী ধরনের উত্তরাধিকার রেখে যেতে চায় তা নিয়ে চিন্তা করা এবং এমনকি তা লিখে রাখা উচিত।

গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ যখন তাদের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবে, তখন তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উপকারী আচরণ করতে বেশি আগ্রহী হয়।

ওয়েড-বেনজনি বলেন, এটি মানুষকে আরও বেশি পরোপকারী আচরণের দিকে নিয়ে যায়, যেমন পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া, দাতব্য কাজে দান করা বা চিকিৎসা গবেষণায় সহায়তা করা।

উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। তারা কেবল লাভের কথা না ভেবে এমন ব্যবসা গড়তে পারেন যা সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

গবেষকদের মতে, এর সুবিধা দুটি। একটি হলো এটি জীবিত অবস্থায় মানুষকে উদ্দেশ্য ও অর্থ দেয়। আর মৃত্যুর পর প্রতীকী অমরত্বের অনুভূতি তৈরি করে, অর্থাৎ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও ভবিষ্যতে নিজের প্রভাবকে টিকিয়ে রাখা।