Home LATEST NEWS BANGLA মাল্টার দাম নিয়ে মন্ত্রীকে কথা বলতে হলো কেন?

মাল্টার দাম নিয়ে মন্ত্রীকে কথা বলতে হলো কেন?

5
0

Source : BBC NEWS

দোকানে মাল্টা ও আপেলসহ বিভিন্ন ফল দেখা যাচ্ছে

“মাল্টা এক দাম ৪৫০ টাকা কেজি, বেদানা ৫২০ টাকা, আপেল ৩৮০ টাকা, আঙুর দুই ধরনের- সবুজ ৪৪০ টাকা আর লাল ৬০০ টাকা, নাশপাতি ৩৫০ টাকা”।

বিবিসি বাংলাকে শনিবার এই দাম বলছিলেন ঢাকার রামপুরা বাজার এলাকার ফল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আকাশ।

তিনি জানান, আঙুর ও আপেলের দাম আগে থেকেই বেশি, কিন্তু গত চার থেকে পাঁচ মাসে আমদানি করা ফলের মধ্যে মাল্টা আর বেদানার দাম অনেক বেড়েছে।

দেশের খুচরা বাজারে ফলের অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রথম আলো পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশিত হয় যখানে দাবি করা হয় যে, ৮৭ টাকায় আনা মাল্টা বাজারে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

খবরটিতে বলা হয়, বাজারে হলুদ যে মাল্টা পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর বড় অংশ আসছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিসর থেকে এবং এগুলো প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ৭০ সেন্টের কাছাকাছি দরে আমদানি হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮৭ টাকার মতো।

শনিবার ফল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে মাল্টার দাম নিয়ে প্রশ্ন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় মাল্টার বর্তমান বাজারদাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনার পরও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কীভাবে ৫২০ টাকায় পৌঁছায়, ব্যবসায়ীদের কাছে তার ব্যাখ্যা চান তিনি।

তবে ব্যবসায়ীরা এসময় মাল্টার দাম বাড়ার পেছনে সরবরাহের ঘাটতির কারণ উল্লেখ করেন বলেও ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।

ওই বৈঠকেই ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী, আলোচনা হয়েছে ফল আমদানি বাড়ানোর বিষয়েও।

তবে মন্ত্রীর নির্দেশনা বাংলাদেশের খুচরা বাজারে ফলের দামে আসলেই পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, এ প্রশ্নও উঠেছে।

দোকানে বিভিন্ন ধরনের ফল সাজিয়ে রেখেছেন একজন ব্যবসায়ী

দাম বাড়ছে কেন?

বিদেশ থেকে বিভিন্ন ফল বাংলাদেশে আমদানি করা হয়; যার মধ্যে আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টা, বেদানা, নাশপাতি এবং খেজুর এই সাত ধরনের ফলই বেশি মাত্রায় আমদানি হয়।

বাংলাদেশের জন্য এসব ফলের বড় সোর্স কান্ট্রি বা উৎস দেশগুলো হলো – চীন, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

এসব দেশ থেকে প্রধানত সমুদ্রপথে, জাহাজে বড়বড় কনটেইনারে করে বাংলাদেশে ফলের চালান আসে। মৌসুম অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে ফল আমদানির এলসি খোলেন আমদানিকারকরা।

বাংলাদেশে অন্যান্য বিভিন্ন আমদানি পণ্যের মতো ফলের ক্ষেত্রেও ধরনভেদে বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপ করা রয়েছে।

সব সময়ই ফলের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের অভিযোগ করে এসেছেন ফল আমদানিকারকরা। তাদের দাবি, বাংলাদেশে বাড়তি শুল্কের কারণেই এসব ফলের দাম বাড়ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশে আঙুর, কমলা ও মাল্টার মতো অধিকাংশ তাজা ফল আমদানির ওপর সর্বমোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

যেখানে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কের মতো পাঁচটি স্তরে শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হয়।

অর্থাৎ, বিদেশ থেকে একশ টাকার ফল আমদানি করতে প্রায় ১২২ টাকা শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হয়।

তিনজন ব্যক্তি লেবু, কলা, পেঁপে, সফেদা, বেল, খিরা, মরিচ বিক্রির জন্য সাজিয়ে বসে আছেন রাস্তার ওপর

সম্প্রতি আমদানি করা ফলের বাড়তি দাম নিয়ে বাংলাদেশে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বাড়তে থাকা ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা হঠাৎ করেই এই আলোচনায় বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।

কারণ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে মাল্টা কিংবা বেদানার মতো ফলগুলো পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ বলে চিকিৎসকরা মত দেন বলে অনেকে জানান।

“ডাক্তার বলছে ডাব, মাল্টা, কমলা এগুলো খাওয়াইতে। কিন্তু যে দাম! এক কেজি মাল্টা সাড়ে চারশো-পাঁচশ টাকা। ছোট একটা ডাব দেড়শ থেকে দুইশো টাকা। এটা কোনো কথা?” বিবিসি বাংলাকে বলেন মোহাম্মদ নাহিদ, যার ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বজন রয়েছে।

কেবল অসুস্থতা নয়, মানবদেহে পুষ্টি চাহিদা পূরণেও ফল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাড়তে থাকা দাম ফলকে, বিশেষ করে বিদেশি ফলকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থেকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ফল ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় কথা বলেন

‘মাল্টা আমদানি কমেছে’

এদিকে মাল্টার দাম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফল আমদানিকারক জাহিদুল ইসলাম বলছেন, অতিরিক্ত আমদানি শুল্কের কারণে ক্ষতির শিকার হয়ে গত চার-পাঁচ মাসে মাল্টা আমদানি কমিয়েছেন তারা। এর ফলেও বাজারে এই ফলের দাম বেড়েছে।

“আমাদের প্রতি সপ্তাহে যদি ৭০ থেকে ৮০ কনটেইনার মাল্টা থাকে, তাহলে মার্কেটটা স্থিতিশীল থাকতে পারে, কিন্তু আমদানিকারকরা যেহেতু অনেকে আনা বন্ধ করে দিছে, লোড হইছে মাত্র ১২ কনটেইনার,” বিবিসি বাংলাকে জানান মি. ইসলাম।

এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাবও ফলের বাজারে পড়েছে বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, “নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ ফল কম কিনছে। কয়েক মাস ধরে চাহিদা কম থাকায় আমদানি করেও লোকসান দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এখন আবার চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু টানা কয়েক মাসের লোকসানে আমদানি বন্ধ করেছেন অনেক ব্যবসায়ী।”

এছাড়া অতিরিক্ত শুল্কের কারণেও অনেক ব্যবসায়ী ফল আমদানি কমিয়েছেন বলেও দাবি এই আমদানিকারকের।

একটি ভ্যান থেকে আপেল ও কমলা কিনছেন কয়েকজন

দাম কী কমবে?

বাংলাদেশে আমদানি করা ফলে শুল্ক কমানোর আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু, দেশি ফলের বাজার রক্ষা এবং বিলাসী পণ্য হিসেবে গণ্য করে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির চিন্তা থেকেই, এই খাতে শুল্ক সবসময়ই কিছুটা বেশি।

ফল আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আগের তুলনায় শুল্ক-কর কিছুটা কমানো হলেও, তা এখনো উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।

যদিও ফলের বাড়তি দামের কারণ হিসেবে কেবল বাড়তি শুল্কই দায়ী নয় বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকদের অনেকে।

তারা বলছেন, বাজার তদারকির অভাব থাকায় অতি মুনাফা অর্জনের চেষ্টা থাকে অনেক ব্যবসায়ীর মধ্যেই।

“ইমপোর্টের ডিউটি (রপ্তানি শুল্ক) কমলেও ব্যবসায়ীরা দাম কমায় না। খুচরা ব্যবসায়ী দোষ চাপায় পাইকারের ওপর, পাইকার বলে আমদানি কম হচ্ছে, আমদানিকারক বলে শুল্ক বেশি, এভাবে চলতে থাকে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাব-এর সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন।

অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যেই, ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে শনিবার সচিবালয়ে মতবিনিময় করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বাজারে মাল্টা, খেজুরসহ আমদানিনির্ভর ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

অস্বাভাবিক দামে মাল্টা বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন মন্ত্রী।

খেজুর আমদানিতে আবারো শুল্ক কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা

মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ফল আমদানিকারকরাও নিজেদের নানা দাবি তুলে ধরেছেন।

উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মতো বিষয়গুলোও জানিয়েছেন তারা।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে শুল্ক-সংক্রান্ত বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

এছাড়া খেজুর আমদানিতে শুল্ক-কর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। চাহিদা বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের এখন থেকেই খেজুর আমদানির প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।

তবে ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, সাধারণ মানুষের সমস্যা দেখার দায়িত্ব সরকারের, কিন্তু বাজার মনিটরিং এবং কার্যকর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধ করা যাবে না।

“মন্ত্রীর এই মিষ্টি কথায় চিড়ে ভিজবে বলে মনে হয় না, এ নিয়ে কঠোর তদারকি দরকার,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ক্যাব-এর সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন।

কেবল ফল নয়, বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে বর্তমানে ডিম, মাংস, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ানো হচ্ছে বলেও মনে করেন এই বিশ্লেষক।

তিনি বলছেন, “কিছু লোক দেখানো অভিযান করে, কিন্তু খুচরা বাজারে তদারকি নাই। চালের বাজার নিয়ে দীর্ঘদিন আমরা চিৎকার করলাম, কিন্তু কাউকে নিতে পারলাম না। ইলিশের বাজার, ডিমের বাজার- সবই অস্থির।”