Source : BBC NEWS

Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি এবং সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ মঙ্গলবার এ রায় দেয়।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিচার হয়। এর মধ্যে অন্যতম অভিযোগ হলো জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা করার নির্দেশসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় উসকানি দেওয়া।
ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার পুরো বিষয়টি সরাসরি বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান, বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল জানায়, তিনটি অপরাধে আলাদাভাবে ১০ বছর করে সাজা দেওয়া হয়েছে মি. ইনুকে। তবে, আলাদা তিনটি মামলায় ১০ বছর করে কারাদণ্ড হলেও সব মিলিয়ে সাজার মেয়াদই হবে ১০ বছর।
একই সাথে সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি দুটি অভিযোগে তাকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
গত ২২শে জুন শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৩০ জুন দিন ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকালেই হাসানুল হক ইনুকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই ২০২৪ সালের ২৬শে অগাস্ট ঢাকার উত্তরা থেকে মি. ইনুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম গত বছরের সেপ্টেম্বরে তার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।
এরপর শুনানি নিয়ে গত বছরের দোসরা নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ২২শে জুন রায়ের তারিখ ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল। সে অনুযায়ী আজ রায় ঘোষণা করা হয়।
ছবির উৎস, BTV
ইনুর বিরুদ্ধে যে আটটি অভিযোগ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনায় মোট আটটি অভিযোগ আনা হয় সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ই জুলাই ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দেন ইনু। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা দেন এবং হত্যারও নির্দেশ দেন তিনি।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, পরদিন ১৯শে জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪–দলীয় জোটের সভা হয়। ওই বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’–এর সিদ্ধান্ত হয়। হাসানুল হক সেই সভায় উপস্থিত থেকে ‘শুট অ্যাট সাইটের’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা করেন।
তৃতীয় অভিযোগটি ছিল- ছবি দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র–জনতার তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের আটক ও নির্যাতন করার জন্য কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ।
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্রের ব্যবহার করা এবং ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোম্বিংয়ের পরিকল্পনা করার অভিযোগ।
পঞ্চম অভিযোগে, গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া। সরকারের গ্রহণ করা হত্যাকাণ্ড সংঘটনসহ নির্যাতন–নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করা।
ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৯শে জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
সপ্তম অভিযোগটি ছিল- একই বছর চৌঠা অগাস্ট শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে কারফিউ ও গুলি চালানোর সিদ্ধান্তে সম্মতি এবং দলীয় নেতাদের তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া।
অষ্টম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন নামের ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যায় নির্দেশনা প্রদান। পাশাপাশি সারা দেশে এক হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র–জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ।
ছবির উৎস, BBC/MUKIMUL AHSAN
কোন অভিযোগে সাজা, কোনগুলোয় খালাস
সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে গত বছরের ৩০শে নভেম্বর এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণ হয় পহেলা ডিসেম্বর।
প্রসিকিউশন এ মামলায় ১০ জন সাক্ষী হাজির করে। আসামিপক্ষও দুজন সাফাই সাক্ষী হাজির করে।
মি. ইনুর বিরুদ্ধে যে আটটি অভিযোগ আনা হয় তার মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সেগুলোয় ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তৃতীয় অভিযোগটি ছিল, ছবি দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র–জনতার তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের আটক ও নির্যাতন করার জন্য কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনে নির্দেশ দেন মি. ইনু।
এই অভিযোগটি প্রমাণিত হওয়ায়, এই মামলায় হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রায়ে বলা হয়, “তাহার বিরুদ্ধে গঠিত তিন নং চার্জে সাক্ষী রাইসুল হকসহ অন্যান্য ভিকটিমদের গুরুত্বর আহত তথা নির্যাতন এবং রাজনৈতিক কারণে নিপীড়ন করার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনানুযায়ী ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলো”।
আটটি অভিযোগের মধ্যে ষষ্ঠ অভিযোগ ছিল, ২৯শে জুলাই ১৪-দলীয় জোটের বৈঠকে অংশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া।
এই অভিযোগটিও প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে জানায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে আদালত জানায়, “ছয় নং চার্জে ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা এবং দুষ্কর্মে সংযোগের দায়ে আইনানুযায়ী এক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে”।
আর সাত নম্বর অভিযোগ ছিল, চব্বিশের চৌঠা অগাস্ট শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে কারফিউ ও গুলি চালানোর সিদ্ধান্তে সম্মতি এবং দলীয় নেতাদের তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া।
আদালতে রায়ে বলা হয়, এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে এক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে ট্রাইব্যুনাল।
একই সাথে, আসামির বিরুদ্ধে আরোপিত সব সাজা যুগপৎ চলতে থাকবে বলেও রায়ে জানিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
আটটি অভিযোগের মধ্যে প্রথমটিতে বলা হয়েছিল, একটি সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে বল প্রয়োগের উসকানি ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন তিনি। এই অভিযোগটি প্রমাণিত না হওয়ায় এতে তাকে খালাস করে দিয়েছে ট্রাইব্যুনালে।
দ্বিতীয় অভিযোগে গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের সভায় কারফিউ জারি ও দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্তে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে নির্দেশ দেন বলে যে অভিযোগ এসেছিল সেটিও প্রমাণিত হয়নি বলে বলেও রায়ে জানানো হয়।
এছাড়া চতুর্থ, পঞ্চম ও অষ্টম যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছিল সেগুলোও প্রমাণিত হয়নি বলেও ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে।
ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
মন্ত্রী থেকে সশ্রম দণ্ডিত আসামি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাসানুল হক ইনু বিভিন্ন সময়ে আলোচিত ছিলেন। ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করা হাসানুল হক ইনু ১৯৭০ সালে বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭২ সালে জাসদ গঠনের সময় তিনি প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৬ সালে দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০২ সাল থেকে দলটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের হয়ে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
ওই সরকারের মেয়াদকালেই ২০১২ সালে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট গঠন হলে সেখানকারও গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন তিনি।
২০১৪ সালের পাঁচই জানুয়ারির বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থী হয়ে কুষ্টিয়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
ওই বছরই টানা দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে হাসানুল হক ইনুকে আবারো দেওয়া হয় তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এই মেয়াদে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
তবে ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও পরবর্তীতে তাকে আর মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ, ২০২৪ সালের সাতই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪-দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান।




