Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, ANI & Ajay Aggarwal/Hindustan Times via Getty Images
দিল্লির উপকণ্ঠে গাজিয়াবাদে যে হিন্ডন বিমানঘাঁটি, সেখানে কমার্শিয়াল ফ্লাইট খুব কমই ওঠানামা করে – সামরিক বিমানই বেশি। সদাব্যস্ত দিল্লি এয়ারপোর্টের তুলনায় একেবারে সুনসান, নিরিবিলি – যেন প্রায় ‘খেলনাবাটির বিমানবন্দর’ এটি।
ঠিক দু’বছর আগে এক অগাস্টের বিকেলে বাংলাদেশের একটি মিলিটারি এয়ারক্র্যাফটে চেপে রাজধানীর প্রান্তসীমায় এখানে এসেই নেমেছিলেন শেখ হাসিনা – টারম্যাকে গিয়ে তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল।
যদিও সেদিন সকালেও ভারতে শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি দিনের শেষে শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতেই পদার্পণ করবেন, বিপদগ্রস্ত বিদেশি বন্ধুকে কিন্তু সেদিন সাদরে ও নির্দ্বিধায় আশ্রয় দিয়েছিল ভারত।
পরদিন দিল্লির পার্লামেন্ট ভবন অ্যানেক্সে ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর ব্যাখ্যা করেছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে ও কেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যূত প্রধানমন্ত্রীকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে ভারত সরকারের ঘোষিত অবস্থান হলো – শেখ হাসিনার ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই’ তাকে ‘তখনকার মতো’ ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। যদিও সেই ‘সাময়িক’ অবস্থান যে দুবছর বা তারও বেশি সময়ে গড়াবে তখন তা কেউ ধারণাও করতে পারেননি।
তবে এরপর গত দু’বছরে ভারত একাধিকবার প্রকাশ্যে দাবি করেছে, ভারতের মাটিতে অবস্থানকালীন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা আওয়ামী লীগ নিয়ে যে সব মন্তব্য করছেন বা যে সব কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন তা তিনি করছেন ‘ইন্ডিভিজুয়াল ক্যাপাসিটি’তে – তার সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু এরপর ৫ই অগাস্টের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বুধবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (এফসিসি) যেভাবে শেখ হাসিনা অনলাইনে ‘লাইভ’ সাংবাদিক সম্মেলনে যুক্ত হন, তা অবশ্যই এই বিতর্ককে একটি আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

ভারত কীভাবে শেখ হাসিনাকে এই কাজ করতে দিতে পারল, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সেদিন রাতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কড়া বিবৃতি জারি করে। গোটা ঘটনায় বাংলাদেশ যে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, তা বোঝা যায় বিবৃতির ভাষা থেকেও।
আসলে ভারত যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে শেখ হাসিনার এই সাংবাদিক সম্মেলনের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং সেখানে তিনি যাই বলুন, তাতে ভারত সরকারের কোনো অনুমোদন নেই – ঘটনাপ্রবাহ থেকে বাংলাদেশ কিন্তু ধরেই নিচ্ছে ভারত সরকারই তাকে এভাবে ইন্টার্যাক্ট করার অনুমতি দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, এফসিসি-র ইভেন্টে শেখ হাসিনা যা-ই বলেছেন, তা ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়া বলেননি বলেও বাংলাদেশ মনে করছে।
এখন সেটা আসলে বাস্তবতা হোক বা না হোক, শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের পর্যায়ক্রমিক ধৈর্যচ্যুতি বা অস্বস্তি বেড়ে চলাটা কিন্তু তাতে মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে না!
কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের দফায় দফায় দাবি বা অনুরোধ সত্ত্বেও শেখ হাসিনার মুখে কেন রাশ টেনে ধরা হচ্ছে না?
এই প্রশ্নের জবাবে দিল্লিতে শীর্ষ কর্মকর্তারা একান্ত আলোচনায় সব সময়ই বলেছেন, শেখ হাসিনা একজন রাষ্ট্রীয় অতিথি, কোনো রাজনৈতিক বন্দি নন, কাজেই তার ক্ষেত্রে এরকম বিধিনিষেধ প্রয়োগ করা চলে না।
শেখ হাসিনা ভারতে আসার পর থেকে যে জটিল কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটা থেকেও পরিত্রাণ পাওয়ার একটা চেষ্টা যেন গত কয়েক মাসে আরো বেশি করে চোখে পড়ছে।
কেন বা কোন কোন কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো – এই প্রতিবেদনে সেটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছে।
ছবির উৎস, ANI
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তির কাঁটা
শেখ হাসিনা যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কে এই মুহূর্তে অস্বস্তির মূল উপাদান, তাতে কোনো সংশয় নেই।
বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক ‘নোট ভার্বাল’ পাঠিয়েছিল সেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসেই। এরপর আরো বহুবার একই দাবিতে তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সেই অনুরোধে সাড়া না দিয়ে ভারত কার্যত চুপচাপ বসে আছে, আর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে, সে গঙ্গা চুক্তিই হোক বা বাণিজ্য বিধিনিষেধ, এটা ছায়া ফেলছে।
আসলে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বহু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা গত দু’বছরে থমকে আছে; আর সেই কথাবার্তা না এগোনোর কারণ হিসেবে দু’পক্ষই শেখ হাসিনার প্রসঙ্গকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছে।
কোনো আলোচনায় অগ্রগতি না হলে বাংলাদেশ এটা বলার সুযোগ পাচ্ছে যে, শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়া হলে আসলে আস্থার পরিবেশটাই ফিরবে না বা কোনো অর্থপূর্ণ আলোচনা সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে ভারত পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ আলোচনার বাইরে রেখেই অন্য কথাবার্তা এগিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু বাংলাদেশ সেই সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না।
ফলে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সস্পর্ক যে কিছুতেই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারছে না, ফলে তার একটা বড় কারণ শেখ হাসিনা।
ছবির উৎস, VYACHESLAV PROKOFYEV/POOL/AFP via Getty Images
ডিব্রিফিং থেকে ডোভালের সরে যাওয়া
ভারতে এই ধরনের বিশেষ পরিস্থিতিতে আসা এরকম বিদেশি অতিথিদের নিয়মিত ‘ডিব্রিফিং সেসন’ করার রীতি আছে – ১৯৫৯ সালে তিব্বতি ধর্মগুরু দালাই লামাও যার ব্যতিক্রম ছিলেন না।
ভারতে থাকাকালীন এই বিদেশি বন্ধুদের সার্বিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত করা, ভারত কোন দৃষ্টিতে বিভিন্ন বিষয় দেখছে সেটা ব্যাখ্যা করা এবং অতিথিদের কাছ থেকে ঠিক কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে সেটা বুঝিয়ে বলাই এই ডিব্রিফিং-গুলোর প্রধান উদ্দেশ্য।
ভারতে এসে নামার পর শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে প্রথমে বেশ কয়েকমাস এই ভূমিকা পালন করেছেন অজিত ডোভাল নিজে।
ঢাকায় বহু ঘোষিত ও অঘোষিত সফরের সুবাদে শেখ হাসিনার সঙ্গে মি. ডোভালের একটা ভালো ব্যক্তিগত সমীকরণও তৈরি হয়েছিল, ফলে এই প্রক্রিয়াটা চলছিলও বেশ মসৃণভাবে।
কিন্তু বিবিসি জানতে পেরেছে পরে নানা ব্যস্ততার জন্য বা অন্য নানা কারণে মি. ডোভাল এখানে আর ততটা সময় দিতে পারছেন না।
মি. ডোভাল অনেকটাই সরে যাওয়ার পর ভারতের ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর প্রধান তপন ডেকা বা গত মাসে মি ডেকার অবসরের পর বর্তমান প্রধান মহেশ দীক্ষিতের কাঁধে এই দায়িত্ব এসে পড়েছে বলেও এই প্রতিবেদক নিশ্চিত হতে পেরেছেন।
দিল্লির চোখে শেখ হাসিনার গুরুত্ব যে আর আগের মতো অতটা নেই, অনেক পর্যবেক্ষকই বলছেন এটা তার একটা প্রমাণ।
ছবির উৎস, Suhaimi Abdullah/Getty Images
শেখ হাসিনার ‘একগুঁয়েমি’?
ওয়াকিবহাল মহল আরও বলছেন, দিল্লিতে নামার পর প্রথম দিন থেকেই শেখ হাসিনার প্রত্যাশা ছিল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে ভারত তাকে সাহায্য করবে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্তরে ভারতের সম্পর্কও ঐতিহাসিক, ফলে তাতে ভারতও যে খুব একটা নিমরাজি ছিল সেটাও নয়।
কিন্তু ভারতের স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে আভাস মিলছে, সেই লক্ষ্যে দিল্লি গত দু’বছরে যা-ই প্রস্তাব দিয়েছে, তিনি সেটা মানতে চাননি।
উদাহরণস্বরূপ, ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের স্ট্র্যাটেজি কী হওয়া উচিত – তা নিয়ে ভারতের পরামর্শ শেখ হাসিনার মনঃপূত হয়নি বলেই দিল্লিতে কর্মকর্তারা আভাস দিচ্ছেন।
এমনকি দলের নেতৃত্বে সামান্যতম বা সাময়িক কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাবও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের ‘নেতৃত্বে’র ভার তার বা তার পরিবারের বাইরে কারও হাতে অল্প সময়ের জন্যও যাক, এটা নাকি তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি।
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর এই অনড় মনোভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা ভারতের কর্মকর্তাদেরও বিরক্ত করেছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
ছবির উৎস, ANI
পরীক্ষিত বন্ধু থেকে অস্বস্তির বোঝা?
আস্থাভাজন বিদেশি বন্ধুরা বিপদে পড়লে বা তাদের জীবনসংকটের মতো পরিস্থিতি হলে আশ্রয় দেওয়াটা ভারতের দীর্ঘদিনের নীতি, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেটাই অনুসৃত হয়েছিল।
দালাই লামা বা সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ নাজিবুল্লাহর পরিবার ‘হোস্ট কান্ট্রি’ ভারতের সব ‘চাওয়া-পাওয়া’র সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টা ঠিক সেভাবে কাজ করেছে- তা বলা যাবে না।
মানে দালাই লামা যেভাবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি সফল ‘হাতিয়ার’ হয়ে উঠতে পেরেছেন, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি।
অর্থাৎ’অ্যাসেট’ বা সম্পদ হিসেবে নয়, তার ক্ষেত্রে বরং ‘লায়াবিলিটি ফ্যাক্টর’ বা বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর বিষয়টাই বেশি বড় হয়ে উঠেছে বলে দিল্লিতে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
আঞ্চলিক জিওপলিটিক্সের বাস্তবতাও শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ভারতে ঠিক কোথায় রাখা হয়েছে তা আজও নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়, হয়তো দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে ল্যুটিয়েন্স জোনে বা শহরের অন্য কোথাও। তবে যেখানেই থাকুন, তিনি আছেন সসম্মানেই – এটা নিয়ে অবশ্য কোনো সন্দেহ নেই।




