Home LATEST NEWS BANGLA সাজেক ভ্রমণ কতদিন বন্ধ থাকবে?

সাজেক ভ্রমণ কতদিন বন্ধ থাকবে?

2
0

Source : BBC NEWS

সাজেক উপত্যকা বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি আর মেঘের জন্য পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় এই স্থান।

স্থানীয় দু’টি সংগঠনের ডাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে ভ্রমণ বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই আদেশ বহাল থাকবে।

সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন নামক দু’টো স্থানীয় পাহাড়ি সংগঠনের ডাকে রোববার সকাল থেকে সেখানে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়।

এতে করে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে অনেক পর্যটক আটকা পড়েন। যদিও পরে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা পর রোববার বিকেলেই অবরোধকারীরা তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।

কিন্তু অবরোধ সরিয়ে নেওয়া সত্ত্বেও অনির্দিষ্টকালের জন্য সাজেক ভ্রমণ বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন।

প্রশাসনের ভাষ্য, ‘অনিবার্য কারণবশত’ তারা সাজেক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। যদিও ঠিক কী ধরনের অনিবার্য কারণে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে, প্রশাসনের কাছ থেকে সেই ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

তবে খাগড়াছড়ির বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ ওই এলাকায় কিছুদিন ধরে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।

পাখির চোখে সাজেক উপত্যকা, বাংলাদেশের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য

সাজেকে অভিযান পরিচালনা হওয়ার সম্ভাবনা কতটা

অবরোধ আহ্বানকারী ওই সংগঠন দু’টির অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতি বা জেএসএসের সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশ সাজেক এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজি শুরু করেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে।

জেএসএসের ‘সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজির’ প্রতিবাদেই তারা অবরোধের ডাক দিয়েছিলো এবং প্রশাসনের কাছ থেকে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস পেয়ে তারা ৪৮ ঘণ্টার জন্য আন্দোলন শিথিল করেছে।

কী ধরনের আশ্বাস, সে বিষয়েও কিছু জানা যায়নি প্রশাসন বা অবরোধ আহ্বানকারীদের কাছ থেকে।

অভিযোগের ব্যাপারে জনসংহতি সমিতির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জনসংহতি সমিতির একজন নেতা একটি জাতীয় দৈনিকে জানিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।

এদিকে, খাগড়াছড়ির এমপি আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, প্রশাসন তাদেরকে বুঝিয়েছে যে তারা যদি অবরোধ চলমান রাখে, তাহলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে জনদুর্ভোগ তৈরি হবে। অবরোধকারীরা খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছিলো। পরে বিকেলে নিরাপত্তা বাহিনী তাদেরকে খাবার খাওয়ানোরও উদ্যোগ নিয়েছিলো। যদিও আন্দোলনকারীরা খাবার ফিরিয়ে দিয়েছে বলে তথ্য রয়েছে।

সংসদ সদস্য আরও জানিয়েছেন, যে দুই সংগঠন অবরোধ ডেকেছিলো, তাদের প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সমর্থন রয়েছে।

এদিকে, স্থানীয় অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবরোধ প্রত্যাহারের পরও সাজেক ভ্যালিতে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ রাখা এবং সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার পেছনে সম্ভাব্য কোনো অভিযানের প্রস্তুতি থাকতে পারে।

রাঙামাটির পর্যটন স্পট সাজেক

যদিও ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলছেন, “যারা জেএসএস-এর বিরুদ্ধে অভিযানের দাবি করছে, তারা নিজেরাও তো সশস্ত্র। একটি সশস্ত্র দলের কথায় আরেকটি সশস্ত্র দলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা যায় না।”

আর এখন অভিযান পরিচালনা করলেও সমস্যা আছে, এটা নিয়ে আবার বিভিন্ন নেতিবাচক খবর হবে, যা দেশের ভাবমূর্তির ক্ষেত্রে ভালো হবে না বলে মত আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার।

অর্থাৎ, কোনো একক দল বা উভয় দলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে কিনা, সে বিষয়ে একেবারে নির্দিষ্ট করে কিছু না বললেও তিনি এ-ও বলেছেন, বাকি সিদ্ধান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

তবে আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তিনি পরিস্থিতি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যতটুকু জেনেছেন, তাতে এখনই কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব নিরাপত্তা্ বাহিনীর।

সাজেক উপত্যকা রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত

সাজেক খুলে দেওয়া হবে কবে?

রোববার সকাল থেকে চলা অবরোধের কারণে সাজেকের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

ওইদিন সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন অবরোধকারীরা।

এতে অনেক পর্যটক আটকা পড়েন। পরে সন্ধ্যার দিকে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয় সংগঠন দু’টি। আর এর পরপরই সাজেক ভ্যালি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন।

রোববার সন্ধ্যায় জারি করা এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকবে।

রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমীন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের আগামী ১৩ই অক্টোবর বিকেল ৫টার মধ্যে পর্যটন এলাকা ত্যাগ করে নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

একই নির্দেশনা জেলা প্রশাসনের জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতেও উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির সাজেকের প্রাকৃতিক দৃশ্য। ৬ই জুন, ২০০৯। এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল।

আজ সোমবার সাজেক রিসোর্ট অ্যান্ড কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জনের সাথে বিবিসি বাংলার কথা হয়।

তিনি বলেন, সকালেও প্রায় হাজারখানেক পর্যটক ছিল। বিকেলের মাঝে সাজেক পর্যটকশূন্য হয়ে যাবে।

কবে সাজেক খুলে দেওয়া হবে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটা প্রশাসনই বুঝবে আসলে। এটার ঠিক-ঠিকানা নাই। প্রায়ই এভাবে বন্ধ হয়…কখনো ১০ দিন বন্ধ থাকে, কখনো ১৫ দিন, কখনো দুই-তিন দিন।”

“ইউপিডিএফ-জেএসএস’র দ্বন্দ্বের কারণেই এটা বারবার হয়…এটার সুস্থ সমাধান কবে যে হবে…আমরাও হতাশ। আমাদের যখনই ব্যবসার মৌসুমটা আসে, তখন এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। আমরা এর সমাধান চাই। কারা কী চাচ্ছে, সবার কথা বিবেচনা করে সরকারও এগিয়ে আসুক,” যোগ করেন তিনি।

এদিকে, সাজেকের পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে জানতে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সাথে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে একই বিষয়ে জানতে রাঙামাটি জেলার জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংক্ষেপে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “আমরা লিখেছি অনিবার্যকারণবশত, কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা লিখিনি। যেটা চিঠিতে লিখেছি, সেটাই আমার বক্তব্য।”

“আমি পর্যটনের বিষয়টা দেখি। লোকজন যাতায়াত করছে। লোকজন ভিন্ন জেলা থেকে আসে। আমি আমাদের অংশটুকু নিয়ে বলছি। বাকি বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারছি না।”

রাঙামাটির পর্যটন স্পট সাজেক

সাজেক ঘিরে এই অস্থিরতা কেন?

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাজেক দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, এই এলাকায় জেএসএসের সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশের তেমন কার্যক্রম বা প্রভাব ছিল না।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাজেকের পর্যটন ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট ও কটেজ। এর ফলে এলাকাটি অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সাজেকের পর্যটন ব্যবসা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় নিয়ে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। প্রতিটি রিসোর্ট থেকে মাসে অন্তত ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা আসে।

তারা এমন অভিযোগও তুলছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএসের অর্থ সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র রাঙামাটি, আর ইউপিডিএফের ক্ষেত্রে খাগড়াছড়ি। সাজেক প্রশাসনিকভাবে রাঙামাটির অংশ হলেও খাগড়াছড়ি হয়ে সেখানে যাতায়াত করতে হয় এবং এলাকাটিতে ইউপিডিএফের দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে।

স্থানীয় ওই ব্যক্তিদের ধারণা, সাজেকের পর্যটন ব্যবসা থেকে আসা অর্থ এবং এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে কেন্দ্র করেই সম্প্রতি দুই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

যদিও অভিযোগ নিয়ে ওই দলগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।