Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে আসার পর এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
বৈধ কিংবা অবৈধ অর্থ গচ্ছিত রাখতে বিশ্বের ধনী এবং বিখ্যাত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোকে (যা একসাথে সুইস ব্যাংক হিসেবে পরিচিত) পছন্দ করেন।
কারণ গ্রাহকদের গোপনীয়তা রক্ষায় এই ব্যাংকগুলোর সুনাম রয়েছে। যে নীতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন দেশের ধনী ব্যক্তিরা তাদের অর্থ সুইস ব্যাংকগুলোতে জমা রাখেন।
সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখেন বাংলাদেশের অনেক নাগরিক কিংবা প্রতিষ্ঠানও।
কিন্তু সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি নিয়ে কেন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে?
মূলত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ঋণ খেলাপি, টাকা পাচার, মানি লন্ডারিংসহ আর্থিক অনিয়ম নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন সুইস ব্যাংকে এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির এই তথ্য-ই আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক বা এসএনবি এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রার হিসেবে যার পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
অথচ মাত্র এক বছর আগেও অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ সুইস ফ্রাঁ।
এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণের এই বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন দেশের আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়ার কথাও বলছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে।
তারা বলছেন, কেবল সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোই নয়- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ কতটা বেড়েছে সেই তথ্যও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এদিকে, দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও অবৈধভাবে টাকা বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়াগুলো কখনই বন্ধ হয়নি বলেই মনে করেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলছেন “আমরা সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছি, কিন্তু যে হিসাবটা আসছে সেটা বাংলাদেশ থেকে যে অর্থ বিদেশে যায়, তার একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।”
ছবির উৎস, Getty Images
এক বছরে এই বৃদ্ধি কি স্বাভাবিক?
নিরাপত্তার কারণে কেবল সুইজারল্যান্ড নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামি ব্যাংকগুলোতে অন্য দেশের গ্রাহকদের অর্থ রাখার বিষয়টি নতুন নয়।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অনেক নাগরিক সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখছেন। এমনকি ব্যক্তি আমানতকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক কিংবা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অর্থও সুইস ব্যাংকে রাখার তথ্য রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের আইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য নয়। টাকার উৎসও তারা জানতে চায় না।
ফলে, বৈধ অর্থের পাশাপাশি- কর ফাঁকি দেওয়া, কিংবা দুর্নীতি বা অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ রাখার জন্যও অনেকে সুইস ব্যাংক বেছে নেয়।
বিশ্বের অনেক দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা নামকরা তারকা সুইস ব্যাংকে তাদের অর্থ পাচার করেছেন, এমন খবর বহু বার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
যদিও, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের চাপের মুখে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোকে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের গ্রাহকদের তথ্য প্রকাশ করতে হয়।
এছাড়া কোন দেশের গ্রাহকদের কী পরিমাণ অর্থ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে জমা আছে, তার একটি ধারণা প্রতিবছর এসএনবির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকেও পাওয়া যায়।
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের বাধ্যবাধকতা মেনে এসএনবি ওই তথ্য প্রকাশ করে। তবে সেখানে গ্রাহকের বিষয়ে কোনো ধারণা থাকে না।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অর্থের পরিমাণ প্রথমবারের মতো ১০ কোটি সুইস ফ্রাঁ ছাড়িয়ে যায়।
এরপর থেকেই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৭ সালে কিছুটা কমলেও ২০২১ সালে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ।
কিন্তু ২০২২ এবং ২০২৩ সালে এই পরিমাণ কমে একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঁ।
কিন্তু আওয়ামীলীগ সরকার পতনের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অ্যাকাউন্টে জমা অর্থ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। যা আগের বছরের এক কোটি থেকে এক লাফে ৫৮ কোটিতে পৌঁছায়।
২০২৫ সালের যে প্রতিবেদন সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রকাশ করেছে, সেখানে এই অর্থের পরিমাণ আরও বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের অ্যাকাউন্টে আমানত বৃদ্ধির এই উল্লম্ফন স্বাভাবিক কিনা, এমন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেকোনো ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধির একটি সহজাত প্রবণতা রয়েছে, যার সঙ্গে এই তথ্য বেশ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ছবির উৎস, Getty Images
আলোচনায় অর্থ পাচারের বিষয়টি
ঋণ খেলাপি এবং অর্থ পাচার বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এই মুহূর্তে সব থেকে বেশি আলোচিত বিষয়।
অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদেও পাচার হওয়া টাকা ফেরানোর বিষয়ে নানা আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে।
আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েও পাচার হওয়া অর্থ দেশের ফেরানোর কথা জানিয়েছিল।
ওই সময় দেশের অর্থনীতি নিয়ে তৈরি শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।
সে সময় অর্থ পাচার রোধে নানা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
যদিও সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রকাশিত ২০২৫ সালের যে প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে, সেই সময় অন্তর্বর্তী সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।
ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকারও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানো কথা বলছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে দেশ থেকে পাচার হওয়া ২৯ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা ফেরাতে সবার সহায়তা চেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে নতুন সরকার কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও।
দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো নিয়ে এসব আলোচনার মধ্যেই সামনে এলো সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদনটি।
দেশে দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা অনেক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ রয়েছে যে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের যে টাকা জমা আছে, তার ‘বড়ো অংশই অবৈধভাবে অর্জিত বা বিদেশে পাচার’ করা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও অবৈধভাবে টাকা বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়াগুলো কখনই বন্ধ হয়নি।
“চালান জালিয়াতি কিংবা হুন্ডির মতো অবৈধ মাধ্যমে সিংহভাগ অর্থ বিদেশে যায়, এই ধরনের বিষয়গুলো কিন্তু চলমান আছে। তাও এমন একটি সময়ে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে,” বলেন তিনি।
ছবির উৎস, Getty Images
মি. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, অনেকে বিনিয়োগ করতে না পেরে নিজের অর্থ নিরাপদ করেছেন, আবার কেউ কেউ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়েছেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, “যে সময়টার কথা বলা হয়েছে (২০২৫ সাল) সেটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক দুই মানদণ্ডেই বেশ অস্থিতিশিল, অনিশ্চয়তার মধ্যে। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মানুষ বা প্রতিষ্ঠান নিরাপদ অর্থ লগ্নির জায়গা খোঁজে, যার প্রতিফলন এখানে ঘটে থাকতে পারে।”
যদিও তিনি মনে করেন যে, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করা কিংবা অবৈধ পথে বিদেশে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে কেবল সুইজারল্যান্ডই নয়, আরও অনেক দেশ রয়েছে।
“সুইজারল্যান্ড ঐতিহ্যগতভাবেই আকর্ষণীয়, কিন্তু এখন কেবল সুইজারল্যান্ড নয়, এর পাশাপাশি পৃথিবীর আরও অনেক দেশে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডায় যায়, সাম্প্রতিককালে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেও বাংলাদেশ থেকে টাকা যায়,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এক্ষেত্রে কেবল সুইস ব্যাংক নয়, পৃথিবীর অন্য বড় ব্যাংকগুলো থেকেও তথ্য যাচাইয়ের কথা বলছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এর অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।
তিনি বলছেন, বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর যে অর্থ রয়েছে, সেগুলো বের করা গেলেও ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের বিষয়ে এখনও পিছিয়ে বাংলাদেশ।
“ফরেন কারেন্সি ইনফরমেশন নেওয়ার জন্য যে নেটওয়ার্কগুলো তৈরি করতে হয়, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে অ্যাগ্রিমেন্টগুলো সাইন করতে হয় এসব বিষয়ে আমরা সবসময়ই উদাসিন ছিলাম,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. ইফতেখারুজ্জামান।




