Home LATEST NEWS BANGLA স্বজনের খোঁজ নেই, মালয়েশিয়ার মর্গে পড়ে আছে এক বাংলাদেশির মৃতদেহ

স্বজনের খোঁজ নেই, মালয়েশিয়ার মর্গে পড়ে আছে এক বাংলাদেশির মৃতদেহ

3
0

Source : BBC NEWS

দীন মোহাম্মদের এই ছবিটি বিবিসি বাংলাকে দিয়েছেন তার প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার মোস্তফা আহমদ।

ছবির উৎস, Mostofa Ahmed

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের একটি হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে দীন মোহাম্মদের মৃতদেহ, তার কাছে থাকা পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী তিনি একজন বাংলাদেশি।

কিন্তু বাংলাদেশে অনেক খোঁজ করেও তার কোনো স্বজন বা পরিবারের সদস্যের খোঁজ না মেলায় মৃত্যুর ১৫ দিনও পরেও হাসপাতালের হিমঘর থেকে মুক্তি হচ্ছে না তার।

ওদিকে কুয়ালালামপুরে তিনি যে বাংলাদেশি মালিকের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তারা হন্যে হয়ে চেষ্টা করছেন কুয়ালালামপুর কিংবা বাংলাদেশের কোথাও কোনো স্বজনকে খুঁজে বের করা যায় কি না, যিনি অন্তত মরদেহটি গ্রহণ করবেন।

পাসপোর্টে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে কুমিল্লার যে এলাকার নাম দেওয়া আছে, সেই এলাকার চেয়ারম্যান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, অনেক সন্ধান করেও তারা এই নামে কোনো ব্যক্তির হদিস ওই এলাকায় তারা বের করতে পারেননি।

কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীন মোহাম্মদের মৃত্যুর তথ্য তারা পেয়েছেন এবং তার স্বজন বা অভিভাবক খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করেছেন।

ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নুর বিবিসি বাংলাকে বলছেন, স্বজন খুঁজে পাওয়া গেলে মৃতদেহ ঢাকার আনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন তারা।

দীন মোহাম্মদের পাসপোর্টে ফোন নাম্বার নেই। যে ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে তাকে চিনে এমন কাউকে পায়নি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান।

ছবির উৎস, Mostofa Ahmed

কে এই দীন মোহাম্মদ

পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দীন মোহাম্মদের বাবার নাম আব্দুল হক ও মায়ের নাম সুক্কুরের নেসা। স্থায়ী ঠিকানার জায়গায় লেখা আছে- রাজা বাড়ি, কুমিল্লা সদর, ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা।

তার জন্ম তারিখ ১৯৭৫ সালের ২রা মার্চ। আর জরুরি যোগাযোগের জন্য পিতা আব্দুল হকের নামের সাথেও একই স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু ওই এলাকার চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “প্রশাসনের কাছ থেকে খবর পেয়ে ব্যাপক খোঁজ করেছি। আমি আমার এলাকার কমবেশি সবাইকে চিনি। আমার গ্রামের একটা পাড়ার নাম রাজাবাড়ি। কিন্তু দীন মোহাম্মদ, পিতা- আব্দুল হক এই নামে কাউকে পাইনি। এমনকি আব্দুল হক নামে কোনো পিতার সন্তান দীন মোহাম্মদ এমন কাউকেও পাইনি”।

দীন মোহাম্মদের পাসপোর্টে টেলিফোন নাম্বারের জায়গায় শুধু লেখা আছে: ০০৮৮। পাসপোর্টটি সর্বশেষ নবায়ন হয়েছে কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে, ২০২৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর। এর আগেও তার কাছে যে পাসপোর্ট ছিল, তার নম্বরও উল্লেখ আছে বর্তমান পাসপোর্টে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের কয়েকজন জানিয়েছেন, ২০১১ সালের দিকে মালয়েশিয়ায় থাকা অবৈধ বাংলাদেশিদের কাগজপত্র বৈধ করার একটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তখন বহু বাংলাদেশি শ্রমিক হাই কমিশনে আবেদন করে পাসপোর্ট নিয়ে বৈধ হয়েছিলেন।

ওই সময়েই প্রথম পাসপোর্ট নিয়েছিলেন দীন মোহাম্মদ, এমন তথ্যও দিয়েছেন কেউ কেউ। তবে এটি অন্য কোনো সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়ায় যায়নি।

তবে তিনি যেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তারা বলছেন, দীন মোহাম্মদ গত প্রায় ২০ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিলেন।

মালয়েশিয়ায় বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করে

ছবির উৎস, TENGKU BAHAR

মৃত্যু ও পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ

মালয়েশিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সেই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি সুপারভাইজার মোঃ মোস্তফা আহমদ বলছেন, মৃত্যুর ১৯ দিন আগে থেকে দীন মোহাম্মদ তার প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করতে শুরু করেছিলেন।

“তিনি নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। যে প্রজেক্টে তিনি কাজ করছিলেন তার সুপারভাইজার আমার বন্ধু। ২৫শে জুলাই রাতে তিনি তার থাকার জায়গায় এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পরে রাতে কোনো এক সময় গোসল খানায় গিয়েছিলেন। সেখানেই ভোরে তাকে পড়ে থাকতে দেখেন অন্যরা। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায় স্ট্রোকে মারা গিয়েছেন তিনি,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. আহমদ।

মি. আহমদ বলেন, হাসপাতাল থেকে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তারা মৃতদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর কাজ শুরু করেছিলেন।

“পাসপোর্ট ভিসা থাকায় ভাবলাম সহজেই মরদেহ দেশে পাঠানো যাবে। কিন্তু তার সহকর্মীদের মধ্যে তেমন কাউকে পেলাম না যিনি দীন মোহাম্মদকে ভালোভাবে চেনেন। পাসপোর্ট থেকে ফোন নম্বর নিতে গিয়ে দেখা গেলো ফোন নাম্বার নেই। একজনের কাছ থেকে খবর পেলাম ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে কোনাপাড়া স্কুলের কাছে তাদের আত্মীয় স্বজন আছে। সেখানে লোক পাঠিয়েও কারও হদিস পেলাম না,” ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন তিনি।

এরপর মি. আহমদ যোগাযোগ করেন কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ মিশন, পাসপোর্টের স্থায়ী ঠিকানায় থাকা কুমিল্লার উপজেলা প্রশাসন ও ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে।

“এখন পর্যন্ত কেউ দীন মোহাম্মদের পরিবার বা স্বজনের কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। ওদিকে হাসপাতাল ও পুলিশ তাগাদা দিচ্ছে দ্রুত মরদেহ নেওয়ার জন্য,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মোস্তফা আহমদ।

আবার পাসপোর্টে তার ব্যক্তিগত নম্বর হিসেবে যে নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে সেটি পাওয়া গেছে কুমিল্লার আরেক ব্যক্তির নামে এবং তিনি জীবিতই আছেন।

মি. আহমদ জানান যে, ২০১১ সালে মালয়েশিয়া সরকার যখন অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার সুযোগ দিয়েছিল তখন দালালদের হাতে একই জন্মনিবন্ধন নাম্বার দিয়ে অনেক পাসপোর্ট বের করার অভিযোগ উঠেছিল।

মালয়েশিয়ার বহু অবকাঠমো প্রকল্পেই কাজ করেছেন লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি

ছবির উৎস, TENGKU BAHAR

এখন তাহলে কী হবে

ওদিকে মালয়েশিয়ার নিয়ম অনুযায়ী দীন মোহাম্মদকে বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন করা যাবে না। “আমরা সেটি করতেও পারি না। কারণ দুই দিন পর তার পরিবারের কেউ এলে কী জবাব দিবো। কিন্তু মরদেহ মর্গে রাখায় প্রতিদিন আমাকে ৭৫ রিঙ্গিত ফি দিতে হচ্ছে, আবার পুলিশও ডিস্টার্ব করছে,” বলছিলেন তিনি।

মোস্তফা আহমদ জানান, তিনি বিষয়টি কুয়ালালামপুর হাইকমিশনে জানিয়েছেন এবং একই সঙ্গে ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে নাম্বার নিয়ে কল দিয়ে সেখানেও অবহিত করেছেন।

“প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রথম দুই দিন কেউ ফোন ধরেনি। সবশেষে বৃহস্পতিবার এক ব্যক্তি ফোন ধরে ঘটনা শুনে শুধু বলেছেন-দেখতেছি। বাংলাদেশে কোনো অভিভাবক পেলেই হাসপাতাল ও পুলিশের সার্টিফিকেট নিয়ে মরদেহ পাঠিয়ে দেওয়া যাবে,” বলছিলেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার (লেবার) সিদ্দিকুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, তারা দীন মোহাম্মদের ঠিকানা বের করার চেষ্টা করবেন।

“তিনি বিভিন্ন সময়ে যাদের সাথে কাজ করেছেন তাদের কাছে যাবো। আশা করি স্থায়ী ঠিকানার সন্ধান বের করতে পারবো,” বলছিলেন তিনি।

মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের ডেডবডি ইস্যু নিয়ে কাজ করেন বাংলাদেশ হাইকমিশনের লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সাইফুল ইসলাম।

“সংশ্লিষ্ট জেলা উপজেলার প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণত পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। সেভাবে পাওয়া না গেলে তার ছবি পাসপোর্ট সামাজিক মাধ্যমে দিয়ে অনুসন্ধানের চেষ্টা করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সফল হই। এক্ষেত্রেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো যাতে দীন মোহাম্মদের মরদেহ পরিবারের কাছে পাঠানো যায়,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

এদিকে ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও কুয়ালালামপুরে হাই কমিশনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত কোনোভাবে দীন মোহাম্মদের কোনো অভিভাবক বা স্বজনের খোঁজ না পাওয়া গেলে হয়তো বেওয়ারিশ হিসেবেই তার ঠিকানা হতে পারে মালয়েশিয়ার মাটি।

“আসলে একেবারেই কাউকে না পাওয়া গেলে আর কি-ই বা করার থাকে। কাউকে না কাউকে তো মরদেহ গ্রহণ করার জন্য পেতে হবে,” বলছিলেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা।