Home LATEST NEWS BANGLA ৫০ মিটার দীর্ঘ সুইমিং পুলসহ কিম জং আনের বিলাসবহুল প্রমোদতরী, যা জানা...

৫০ মিটার দীর্ঘ সুইমিং পুলসহ কিম জং আনের বিলাসবহুল প্রমোদতরী, যা জানা যাচ্ছে

2
0

Source : BBC NEWS

কিম জং আনের চারটি বিলাসবহুল জাহাজের স্যাটেলাইট চিত্র

এ বছর জুলাই থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার ওনসান উপকূলের কাছে স্যাটেলাইট চিত্রে একটি ৮০ মিটার (২৬৩ ফুট) প্রমোদতরীকে বারবার দেখা গেছে।

বিলাসবহুল জাহাজটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো এর ডেক বরাবর অবস্থিত ৫০ মিটারের সুইমিং পুলটি, যার এক প্রান্তে কয়েকটি ওয়াটার স্লাইড রয়েছে।

একটি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে কয়েকমাস নিষ্ক্রিয় থাকার পর, জুলাই মাসের শুরুতে এটিকে কালমা উপদ্বীপ নামে পরিচিত উপকূলীয় অঞ্চলের জলভাগে স্থানান্তর করা হয়।

এটি ওনসানের কাছাকাছি, যা সমুদ্রতীরবর্তী একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র এবং যেখানে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং আন ও তার পরিবারের ব্যবহৃত একটি বিশাল ভিলা রয়েছে।

ওই বিলাসবহুল জাহাজটি সেখানে চলাচলকারী একমাত্র বড় জাহাজ ছিল না। বিবিসির বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে কিমের ভিলার কাছে আরও কয়েকটি জাহাজকে বারবার দেখা গেছে।

ধারণা করা হয় যে, ওই জাহাজগুলো কিম ও তার পরিবার ব্যবহার করে।

স্যাটেলাইট থেকে তোলা কিম জন আনের প্রমোদতরীর ছবি

উত্তর কোরিয়ার সাবেক কর্মকর্তা, দলত্যাগী নেতাকর্মী এবং বিশেষজ্ঞরা বলেন, শাসকগোষ্ঠীর নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন কারও পক্ষে দেশটিতে ওই আকারের জাহাজের মালিক হওয়া বা অবাধে তা ব্যবহার করা কঠিন।

“শীতকালে সেগুলোকে শিপইয়ার্ডে রাখা হতো। গ্রীষ্মকাল এলে সেগুলোকে বের করে কিম জং আনের ভিলাতে বা কালমার দিকে নিয়ে যাওয়া হতো এবং সাঁতার ও বিনোদনের জন্য ব্যবহার করা হতো,” বলেন রি জং হো।

রি জং হো একসময় দেশটির ওয়ার্কার্স পার্টির ৩৯ নম্বর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা ছিলেন, যে কার্যালয়কে নেতৃত্বের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা হয়।

উত্তর কোরিয়ার রক্ষণশীল একনায়কতন্ত্রের শীর্ষপদে যারা বসে আছেন, তাদের সম্পদের পরিমাণ নির্ণয় করা দেশটির অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মতোই কঠিন।

ওনসান মেইনটেনেন্স ডকে নোঙর করা জাহাজগুলোর স্যাটেলাইট চিত্র

জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থা অনুমানের ওপর নির্ভর করে উত্তর কোরিয়াকে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে।

কিন্তু দেশটির বিশেষভাবে বিশাল একটি সামরিক বাজেট রয়েছে, যা বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞাধীন এক পারমাণবিক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকাংশ উত্তর কোরীয় নাগরিক ‘পরিকল্পিত, ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ শিকার হয়ে জীবনযাপন করছেন।

দেশটিতে রয়েছে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, ব্যাপক জবরদস্তিমূলক শ্রম ব্যবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য সংকট, যার ফলে জনসংখ্যার আনুমানিক ৪০ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছে।

কিন্তু এই শাসকগোষ্ঠী নিজেদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য দীর্ঘকাল ধরেই পরিচিত।

ওনসান এলাকার একটি কাছ থেকে তোলা স্যাটেলাইট চিত্র

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা জাহাজগুলোর দাম আমাদের জানা নেই, তবে তার সমতুল্য বিলাসবহুল ইয়টগুলোর দাম কয়েক কোটি থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের (৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড) বেশি হয়ে থাকে।

কিমের অনেক ছোট, ২৯ মিটার দৈর্ঘ্যের প্রিন্সেস ইয়টটির মূল্য আগে প্রায় সাত মিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়েছিল।

যদিও শুধু নৌযানের অবস্থান থেকে পরিবারটির আসল ঠিকানা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, তবে তাদের গতিবিধি, যা কিমের জনসমক্ষে উপস্থিতির বিরতির সময়ের সাথে মিলে যায়, এমন কিছু কার্যকলাপের দিকে ইঙ্গিত করে যা অন্যথায় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যেত।

জীবনীকার ও গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিম জং আন তার শৈশবের একটি অংশ তার মায়ের সঙ্গে ওনসানে কাটিয়েছেন এবং একজন বিশেষজ্ঞ বিবিসিকে বলেছেন যে, তার বাবা কিম জং ইলের শাসনকাল থেকেই শহরটি এই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বি গ্রা৪

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও দাবি করে যে, ওনসানে বহুতল হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, খেলাধুলার সুবিধা ও ওয়াটার পার্ক রয়েছে, এবং সেটি প্রায় কুড়ি হাজার দর্শনার্থীকে ধারণ করতে পারে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও রুশ সংবাদমাধ্যমগুলো ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চালু হতে যাওয়া ওনসান কালমা রিসোর্ট পরিদর্শনে আসা ছোট ছোট রুশ পর্যটকদের দলের ছবি প্রকাশ করেছে।

বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য তৈরি করা হলেও, রিসোর্টটি স্থানীয় পর্যটকদের জন্যও উন্মুক্ত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের বরাত দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু স্থানীয় বাসিন্দাকে প্রায় ১০০ ডলারে চার রাতের ট্যুর প্যাকেজের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা বেশিরভাগ উত্তর কোরীয়দের জন্য একটি মোটা অঙ্কের টাকা।

২৫শে আগস্ট ২০২৬ তারিখের একটি স্যাটেলাইট চিত্রে ওনসানের নিকটবর্তী তায় এবং সিন দ্বীপপুঞ্জের অদূরে ৫০ মিটার ও ৫৫ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি জাহাজ দেখা যাচ্ছে

১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত দেশটির তৎকালীন নেতা কিম জং ইলের ব্যবহৃত বাসভবনগুলোতে ১৩ বছর পাহারার দায়িত্বে থাকা একজন দলত্যাগী বিবিসিকে বলেছেন, ওনসানের আশেপাশের ভিলাগুলো অভিজাতদের অবকাশ যাপনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

তিনি স্মরণ করেন, গ্রীষ্মকালে তিনি কয়েক ডজন শিশু ও কিশোর-কিশোরীকে ওয়াটারস্কিইং করতে দেখেছিলেন।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কিমের ছুটি কাটানোর বিষয়ে খুব কমই প্রতিবেদন প্রকাশ করে, বরং এ ধরনের সফরগুলোকে সরকারি পরিদর্শন বা নির্দেশনা হিসেবে তুলে ধরে।

কিন্তু বিবিসির সাথে কথা বলা দেশত্যাগীরা অবগত ছিলেন বলে মনে হয়েছে যে পরিবারটি ওনসানে ছুটি কাটিয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় যে অন্তত কিছু উত্তর কোরীয় বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন।

২০২৬ সালের ৪ জুলাই টে দ্বীপের নিকটবর্তী জলরাশিতে ৫০ মিটার দীর্ঘ জাহাজটিকে দেখা গিয়েছিল।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির মাথাপিছু জিডিপি ছিল প্রায় ৬৬৭ ডলার, যা দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৬ হাজার ২২৭ ডলারের তুলনায় খুবই নগণ্য।

অধিকাংশ উত্তর কোরীয়দের জন্য ছুটি কাটানোর ব্যাপারটিই নাগালের বাইরে।

আর যদিও দেশটিতে একটি ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি রয়েছে, তাদের অবসরের জন্য খুব বেশি সময় হাতে নাও থাকতে পারে।

দলত্যাগীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন যে শ্রমিক, অফিস কর্মচারী এবং সমবায় কৃষকরা আইনত ১৪ দিনের বার্ষিক ছুটির অধিকারী, কিন্তু তা খুব কমই মানা হয়।

ভ্রমণের জন্য টানা বেশ কয়েকদিন ছুটি নেওয়াটা দেশটির নাগরিকদের জন্য অস্বাভাবিক।

৯ই জুলাই ২০২৬ তারিখে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে ওনসান ভিলার অদূরে নোঙর করা একটি ৬০ মিটার লম্বা জাহাজ দেখা যাচ্ছে

দেশটিতে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, মানুষ সাধারণত নির্ধারিত ‘গ্রীষ্মকালীন ছুটি’র পরিবর্তে সপ্তাহান্তের ভ্রমণ বা জাতীয় ছুটির দিনে ভ্রমণ করে থাকে।

আর ছুটি মঞ্জুর করা হলেও ভ্রমণ সীমিত থাকে, এবং শহর বা জেলার বাইরে ভ্রমণের জন্য সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়।

অবাধে চলাফেরা করাটা কখনও কখনও ছুটির মতোই এক বিলাসিতা।

বিবিসি ওনসানের আশেপাশে প্রায় ৫০মি, ৫৫মি, ৬০মি এবং ৮০মি দৈর্ঘ্যের চারটি বড় জাহাজের ওপর নজর রেখেছিল।

এ বছর চারটি জাহাজকেই কিমের ওনসান ভিলার আশেপাশে বারবার দেখা গেছে।

২০০২ সালের নভেম্বরে তোলা একটি স্যাটেলাইট চিত্রে ওনসানের উপকূলে নোঙর করা ৮০ মিটার দীর্ঘ একটি জাহাজ দেখা যাচ্ছে

সবচেয়ে বড় জাহাজটিতেই সবচেয়ে স্পষ্ট তৎপরতা দেখা গেছে, যেটি ডক থেকে কালমা উপদ্বীপের উপকূলীয় জলে চলে গেছে, আর সেখানেই এটি জুলাই মাস থেকে রয়েছে।

অন্য দুটি জাহাজ, যাদের দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার ও ৫৫ মিটার, আগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত ওনসানের নিকটবর্তী তায় ও সিন দ্বীপের আশেপাশে বারবার দেখা গিয়েছিল।

স্যাটেলাইট চিত্রে ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজটির পাশে আরও চারটি ছোট নৌকা দেখা গেছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশেষজ্ঞ জিয়ং সিওং-হাক বলেছেন, ছোট নৌকাগুলো বড় জাহাজটিতে মানুষ, জ্বালানি ও রসদ পরিবহন করত।

৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে উত্তর কোরিয়ার হামহুং-এর হামহুং স্কোয়ার জুড়ে উত্তর কোরীয় মহিলারা সাইকেল চালাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, তায় এবং সিনের মতো ছোট দ্বীপগুলো ‘নির্জন সামুদ্রিক আশ্রয়স্থল, যেখানে লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে গোপনীয়তা’ বজায় রাখা যায়।

গত সপ্তাহ পর্যন্তও ৬০ মিটার দীর্ঘ জাহাজটিকে কিমের ওনসান ভিলার কাছে বারবার দেখা যাচ্ছিল।

যদিও উত্তর কোরিয়া জাহাজগুলোর আনুষ্ঠানিক মালিকানা কখনো প্রকাশ্যে জানায়নি, বিবিসির স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে ২০০২ সালে ওনসানে একই রকম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি বড় জাহাজের সন্ধান পাওয়া গেছে, যখন কিম জং ইল উত্তর কোরিয়া শাসন করতেন।

প্রাক্তন এনবিএ তারকা ডেনিস রোডম্যান, যিনি ২০১৩ সালে উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন, ‘দ্য সান’ পত্রিকাকে জানান যে, কিম জং আনের সঙ্গে তার সাত দিনের সফরের বেশিরভাগ সময় তিনি ওনসানে কাটিয়েছেন, যেখানে তারা জেট-স্কিইং করেছেন এবং ঘোড়ায় চড়েছিলেন।

২রা জুলাই ২০২৫ তারিখে উত্তর কোরিয়ার কাংওন প্রদেশের ওনসান শহরের ওনসান কালমা উপকূলীয় পর্যটন এলাকার সৈকতে উত্তর কোরীয় পর্যটকরা বেড়াতে এসেছেন। সাঁতারের পোশাকে চারজন ব্যক্তি একে অপরের দিকে জল ছিটাচ্ছেন।

তিনি তাদের ব্যবহৃত ৬০ মিটার দীর্ঘ একটি নৌযানের বর্ণনাও দিয়েছেন, যেটি ছিল ফেরি ও ডিজনির নৌকার সংমিশ্রণ।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা ৬০ মিটার দীর্ঘ নৌকাটিই ডেনিসের বর্ণনা করা যান কি-না, তা স্পষ্ট নয়।

বেশিরভাগ উত্তর কোরীয়দের কাছে, কিম পরিবার এবং শাসনব্যবস্থাকে সমর্থনকারী অন্যদের জীবনযাত্রা শুধু বিলাসবহুলই নয়, অকল্পনীয়ও মনে হবে।

বিশেষ করে, কারণ রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় ‘সর্বোচ্চ নেতা’কে এমন একজন নিঃস্বার্থ মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয়, যিনি সর্বদা দেশকে অগ্রাধিকার দেন।

রি জং হো বলেন, “কিম জং আনকে ‘জনগণের নেতা’ বলা হয়, অথচ তার এ ধরনের চারটি বিলাসবহুল জাহাজ রয়েছে, আর সাধারণ মানুষ দিনে একবেলা খাবারের জন্য সংগ্রাম করছে”।

গ্রাফিক্স: আরভিন সুপ্রিয়াদি